কবিতা

তোমার সাহসী শব্দরা

আশীষ সেন

তোমার সাহসী শব্দরা তোলে হাতে
বাতিঘর, আলো-প্রজাপতি হয়ে ঘোরে।
চাষভাঙা মাঠের পথে মেধার বীজধানে
আলো ফেলে, ডাকে আয় আয়।

পাড়ভাঙা পাগল নদীর মতো
থরথর বহমান
তোমার বর্ণমালা
আমাদের ভাঙা হাটে চাঁদ হয়ে ঝরে।

ঘুমহারা পাখির ডানায় পিছলায় আলো
নিসর্গ লুটেরা হলে রাতেরা কি হঠাৎ থমকালো?

তোমার সাহসী শব্দ মেধার সিন্দুকে
আলো ফেলে, ডাকে আয় আয়,
আহত রক্তাক্ত প্রাণ নিঃশঙ্কে জাগায়

 

 

দুই পঙ্ক্তির পাঁচটি অণুকাব্য

গোলাম রববানী

রটনা
কেউ সফল হয় না যখন
তখন দুর্নাম রটে, অমানুষে।

শ্বাসরুদ্ধ পৃথিবী
মুক্ত বাতাস ভাসে, বিমুক্ত স্থানে
মানুষের পৃথিবীটা ভরা তবু শ্বাসকষ্টে।

ভাষার ঋণ
ভাষার কাছে এত ঋণ
কুকথা চর্চা করে পরিশোধ হয় মলিন।

মরণের পাঁচমিশালি
লোভের মোহে মাথায় চলে যে চিন্তন
পাঁচমিশালি ভাষায় বাঙালিরা বলে তারে মরণ!

অবশেষের বোধ
কেউ পাতালে কেউ আকাশে নির্বিশেষে
ন্যুব্জ মাটিতে, কেউ বোঝে না কাউকে অবশেষে।

 

জৈবিক উপমা

বশির আহমেদ

সাঁতার কাটার সংজ্ঞা না জেনে
আমি সমুদ্রে হাবুডুবু খাই
জলের গভীরে মাংসাশীর ভয়
ডাঙায় বিষাক্ত সরীসৃপ
যেদিকে যাই মৃত্যু অনুচর!
তোমার যে চোখ এক সময়
আমাকে দেখতো
সেই চোখে লুকিয়ে ছিল
জৈবিক উপমার শিল্পতত্ত্ব,
তুমি আমাকে ওইভাবে
ভালোবাসতে পারোনি,
যে ভালোবাসা হৃদপিণ্ড থেকে
উৎপন্ন করে সুখের ডোপামিন!

 

অন্তঃত্বক

ইসতিয়াক আহমেদ হৃদয়

কতদিন হলো আমাদের ভাঙা হয় না।
না তুমি ভাঙো, না আমি ভাঙি।
চলো একদিন দুজনেই ভেঙে
টুকরো টুকরো হয়ে ফিরে যাই মহাকাশে।
সেখানে উড়ছে আমার কবিতার অক্ষর,
পাঞ্জাবির বোতাম, আমার হাড়ের ফেনা।
এমনকি খণ্ড খণ্ড স্মৃতির অংশ,
যা কিনা আমি পূর্বজীবনে কামনার থালায়
জড়ো করে রেখেছিলাম।
মহাকাশের এই পরিধি ভেঙেই
আমি আবিষ্কার করেছিলাম অবিকৃত প্রেম।
বিশ্ব নক্ষত্রের প্রতিকূলে আমার সোপর্দ আত্নহূতি।
এমনই এক ভাঙন বুকে রেখে
তোমাকে গড়ে তুলি রোজ।

 

ফুল, ধ্বনি ও স্মৃতি

আলী আকবর বাবুল

শহিদ মিনারের ছায়ায় আজ শব্দেরা হাঁটু মুড়ে বসে
ফুলের পাপড়িতে লেগে থাকে নিঃশ্বাসের ইতিহাস
বাতাস আজ উচ্চারণ করে রক্তের ব্যাকরণ
কংক্রিটের বুকেও জন্ম নেয় কোমল স্বর
শিশুর মুখে যখন প্রথম ভাষা ফুটে ওঠে
তখন দূরে কোথাও জেগে ওঠে শহীদের চোখ
সময় আজ ঘড়ি নয়, উচ্চারণে মাপা
স্মৃতি আজ পাঠ্যবই নয়, শিরার ভিতর লেখা
ভাষা আজ কেবল যোগাযোগ নয়, অস্তিত্বের আলো
অক্ষর মানেই দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যমান সাহস
প্রতিটি শব্দ আজ একটি প্রতিজ্ঞার মতো
যা ভাঙে না, পোড়ে না, মোছে না
একুশ মানে আজও জাগ্রত কণ্ঠ
নিরস্ত্র বুকে দাঁড়িয়ে থাকা সূর্যের মতো
আমরা কথা বলি বলেই আমরা আছি
ভাষার ভিতরেই আমাদের আগামী।

 

মানুষ মূলত একা..

রুদ্র সাহাদাৎ

সবাই ছাড়ে দুঃখ ছাড়ে না আর কোনোকালে
রবিবার যায় সোমবার যায়
আসে আরেকটা দিন নতুন ভোর
আসে নববর্ষ- হ্যাপী নিউ ইয়ার
একে একে সবাই চলে যায় -কারো কারো নিবর প্রস্থান
একে একে সবাই চলে যায় -আকস্মিক নতুন কথা নতুন গান
সবাই ছাড়ে দুঃখ ছাড়ে না আর কোনোকালে
মানুষ মূলত একা- একা শুধুই একা
নিঃস্ব রিক্ত ধূসর বটগাছের মতো
সবচেয়ে বেশি হয় কথা নিজের সাথে নিজের
একা একাকী জেগে জেগে বেঁচে থাকা