ওজোন স্তর সংরক্ষণের ৩৫ বৎসর

0
281
ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী :

ওজোন স্তর সংরক্ষণের ৩৫ বছর অতিক্রান্ত হতে চলল। বিশ্ব ওজোন দিবস এবারের প্রতিপাদ্য :  জীবনের জন্য ওজোন :  ওজোন স্তর সংরক্ষণের ৩৫ বছর।

১৯৮৫ সালে ভিয়েনা প্রটোকলের মাধ্যমে এ সংকটের স্বরূপ উন্মোচিত হয়। ১৯৮৮ সালে মন্ট্রিল প্রটোকলের মাধ্যমে পৃথিবীর অস্তিত্বের সংকটকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে, আইনি কাঠামোয় তুলে ধরা হয়। তারপর এই সংকটের সাথে দীর্ঘসময়ের পৃথিবীর মানুষের পথচলা।

প্রাণের এই পৃথিবীকে ঘিরে যে বিশাল বিস্ময়কর অ্যাটমোসফিয়ার , তা প্রধানত চারভাগে বিভক্ত। ট্রপোস্ফিয়ার, স্ট্রাটোস্ফিয়ার, মেসোস্ফিয়ার, থার্মোস্ফিয়ার। আমাদের বসবাস করা পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার ঊর্ধ্বাকাশের  চারদিকে বিস্তৃত, বেষ্টিত অঞ্চল হল ট্রপোস্ফিয়ার । পৃথিবীর প্রায় সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক, ঘটনা, রটনা, বিপর্যয়, বিভ্রান্তি, অস্থিরতা প্রভৃতি সংঘটিত হয় এই ট্রপোস্ফিয়ার অঞ্চলে। মেঘ থেকে বৃষ্টি, শিলা বৃষ্টির খেলা, মেলা, বিদ্যুৎ চমকানো, বাষ্পের ঘনীভূত হওয়া, ঝড়ঝঞ্ঝা, আইলা, নার্গিস, সকল প্রকার সাইক্লোন,  সবকিছুই এই অঞ্চলে সৃষ্টি হয়, প্রভাবিত, প্ররোচিত হয়। বিভিন্ন গ্যাস কণা, বালুকণা, কঠিন বস্তু কণা, জলকণা, মেঘ, শিলা, কুয়াশা- ধোঁয়াশা, অণু-পরমাণু, আয়ন, রেডিক্যাল, ফ্রিরেডিকেল প্রকৃতিতে সমৃদ্ধ থাকে এ অঞ্চল। রাসায়নিক, তাপীয়, জৈব রাসায়নিক, ধাতব রাসায়নিক বিক্রিয়া এ অঞ্চলে সংঘটিত হয়। পৃথিবীর বহুমাত্রিক কাজকর্মের নির্যাস এই অঞ্চল ধারণ করে।

ট্রপোস্ফিয়ারের উপর থেকে পৃথিবীর চারিদিকে বেষ্টন করা অঞ্চলের নাম স্ট্রাটোস্ফিয়ার। বায়ুম-লের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্তর। এর বিস্তৃতি ট্রপোস্ফিয়ারের উপরে পৃথিবীর চারিদিক বেষ্টিত ৪০ থেকে ৪৫ কিলোমিটার অঞ্চল। স্ট্রাটোস্ফিয়ারকে ঘিরে পৃথিবীর চারিদিকে যে  ঘননীল স্তর, পৃথিবীর জীবনের সুরক্ষা ঢাল-তাই হলো ওজোন স্তর। এটিই পৃথিবীর প্রাণ ও বস্তুকে সুরক্ষা দেয়। বলা হয় পৃথিবীর সুরক্ষা ঢাল। ঘন নীল ওজোন স্তর।

মানুষ বৃদ্ধির সাথে সাথে পৃথিবীতে বিড়ম্বনা, জীবন ও জীবিকার অনুষঙ্গ বাড়তে থাকে।  বাড়তে থাকে রাসায়নিক বহুমাত্রিক বস্তুসামগ্রী।

এরই সাথে বাড়তে থাকে ওজোনক্ষয়কারী বিভিন্ন বস্তু যেমন- সিএফসি, এইচসিএফসি গ্যাসসমূহ, হ্যালন, মিথাইল ব্রোমাইড প্রভৃতি। বাড়তে থাকে এদের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া এবং এসবের অনুষঙ্গ। বিভিন্ন ব্যবহারিক প্রক্রিয়ায় বৃদ্ধি পেতে থাকে সমগ্র দুনিয়াব্যাপী এসবের প্রতিক্রিয়ার প্রভাব। সিএফসি গ্যাসসমূহের বিভিন্ন যৌগ ইতিমধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত হতে থাকে। মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য, বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য, গবেষণার নির্যাসের  জন্য, দৈনন্দিন ব্যবহারিক বস্তুসামগ্রী জন্য।

এসবের কতিপয় হল- সিএফসি-১১, সিএফসি-১২, সিএফসি-১১৩, ১১৪, এইচসিএফসি -২২, এইচসিএফ, মিথাইল ব্রোমাইড প্রভৃতি।

স্বাচ্ছন্দ্যকে ধাওয়া করা মানুষের চেতনার মাঝেই, ক্রিয়াকর্মের মাঝেই পৃথিবীকে ধ্বংসকারী এই বস্তুগুলো উৎপাদিত হতে থাকে, ব্যবহার হতে থাকে, বিস্তৃত হতে থাকে। এভাবেই পৃথিবীর আয়ু কমতে থাকে। পৃথিবীর মানুষ এই সংকটকে উপলব্ধি করতে পারে ভিয়েনা কনভেনশনের  মাধ্যমে। প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এগিয়ে আসে মন্ট্রিল প্রটোকলের শর্তে ১৯৮৮ সালে । তারপর বিজ্ঞানীদের নিরন্তর প্রচেষ্টায় প্রায় ৩৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কিভাবে ওজোনস্তর ক্ষয়কারী পদার্থকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এর ব্যবহার সীমিত করে থামিয়ে দেয়া যায়। এর ব্যাপকতা নিয়ে জনগণকে সচেতন করা যায় -প্রভৃতি নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করেছেন। ওজোন স্তরের পুরুত্ব কমে যাওয়ার উদ্বিগ্নতাকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছে।

সিএফসিসমূহ পৃথিবীর জীবনকে মহাসঙ্কটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষও তা উপলব্ধি করেছেন। সময় অনেক অতিক্রান্ত হয়েছে। ওজোন বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য যে দিবস, বিশ্ব ওজোন দিবস, তারও ৩৩ তম বার্ষিকী চলছে। দেশে দেশে মানুষের সচেতনতা কাক্সিক্ষত মাত্রায় নয়। অস্তিত্বকে, পৃথিবীর জীবনকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রচার-প্রচারণা, সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াস নেয়া হয়েছে। আলোচনা-পর্যালোচনায় জীবন ও অস্তিত্বের, সংকট ও সংশয়ের, রোগ ও ব্যাধির বিভিন্ন বিপন্নতাকে তুলে ধরা হচ্ছে। ওজোন স্তরকে সংরক্ষণ করা না গেলে পৃথিবীতে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি- আল্ট্রা ভায়োলেট রে প্রবেশ করবে। জীবনকে ধ্বংস করবে। নানা জাতের রোগ সংক্রমিত করবে।

এই বিষয়গুলো এখন মোটামুটি মানুষের ধারণায় বসবাস করছে।

ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন জাতীয় যৌগের ক্লোরিন ওজোন অণুর সাথে বিক্রিয়া করে ওজোনকে অক্সিজেনসহ অন্যান্য উৎপাদে পরিবর্তিত করে। এভাবেই ওজোন ধ্বংস হতে থাকে। ওজোন স্তর পাতলা হতে থাকে। এক একটি ক্লোরিন অণু লক্ষাধিক ওজোন অণুকে ধ্বংস করতে পারে। সুতরাং ওজোন ধ্বংসকারী যৌগের উৎপাদন ও ব্যবহার বিস্তৃতি সীমিত করার নিয়ন্ত্রণ করার কোনো বিকল্প নেই। স্ট্রাটোস্ফিয়ারে  এসব যৌগের উপস্থিতি কমানো গেলে ওজোনের  সাথে এসবের বিক্রিয়া কমে আসবে, ওজোন স্তর সুরক্ষিত হবে।

কভিড-১৯ এর মহাবিপর্যয়কালে পৃথিবীতে ওজোন ক্ষয়কারী পদার্থসমূহের ব্যবহার সীমিত হওয়ায় দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে ওজোন স্তরের পুরুত্ব বেড়েছে। এই পরিবর্তনের গুরুত্বকে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে।

ওজোন স্তরকে সুরক্ষিত করার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া বন্ধ না করা গেলে পৃথিবীতে সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রে ঢুকে পড়বে। পৃথিবীর প্রাণের আচ্ছাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। মানুষের ত্বক, চোখ এবং অন্যান্য জৈবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে। ত্বকের ক্যান্সার সৃষ্টি করবে। চোখের ছানি পড়া থেকে শুরু করে চোখের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করবে। ভিটামিন ডি এর উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেবে। জীবের প্রজনন ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেবে।

সবুজের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে। ভূমির উর্বরা শক্তি, পুষ্টিকে ধ্বংস করবে। ভূমির অনুজীবকে মেরে ফেলবে। সর্বোপরি পৃথিবীতে জীবনের স্পন্দনকে ক্রমান্বয়ে থামিয়ে দেবে। পৃথিবী মৃত গ্রহে পরিণত হবে। পৃথিবী প্রাণের স্পন্দনের একমাত্র গ্রহ। এই কথাটি মুছে যাবে।

পৃথিবীর মানুষ কখনোই চায় না, পৃথিবী থেকে প্রাণের স্পন্দন ফুরিয়ে যাক, থেমে যাক। পৃথিবী একটি মৃত গ্রহে পরিণত হোক।

এটি একটি মহাসংকট। মহাসংকটের পরও এসবের ব্যবহার উৎপাদন থেমে থাকেনি । উন্নত ও অনুন্নত বিশ্বের বিভিন্ন মেয়াদে সিএফসি এর উৎপাদন ও ব্যবহার সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এই সিএফসি সমূহ ইলেকট্রনিক্স-সামগ্রী ধোয়া মোছার কাজে, চিকিৎসা সামগ্রী ধোয়া মোছার কাজে, এরোসল সামগ্রী তৈরিতে ব্যবহার করা হয় । ফল ও সবজির কীটনাশক রোধে, ধোঁয়া সৃষ্টিতে ব্যবহার করা হয়। বাসা কিংবা অফিস ঘরের তাপমাত্রা নিরোধক ইনসুলেটর, ফোম প্রস্তুতে সিএফসি ব্যবহার করা হয়। ক্যান্সার থ্যারাফিতে, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে, হিমায়িত করতে, সামগ্রী উৎপাদনে, কৃষি রসায়নে সিএফসির ব্যবহার প্রচুর। এয়ার কুলার , রেফ্রিজারেটর, ফটোকপিয়ার প্রভৃতিতে ওজোন ক্ষয়কারী গ্যাসের ব্যবহার অত্যন্ত বেশি।

ব্যক্তি সুরক্ষায় আমাদের অতিরিক্ত সূর্যালোক এড়িয়ে চলতে হবে। ত্বক এবং চোখকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।  ছানি পড়ে চোখের কার্যকারিতা নষ্ট করার জন্য সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি দায়ী। এজন্য ঘরের বাইরে প্রচ- সূর্যালোক পরিহার করে চলতে হবে। সূর্যালোক সুরক্ষা সামগ্রী যেমন সানগ্লাস, সান ক্রিম, ত্বক সুরক্ষায় সামগ্রী ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি ওজোনস্তর ক্ষয়কারী বস্তুর ব্যবহার, উৎপাদন, বিস্তৃতি নিয়ন্ত্রণের আন্দোলনে নিজেদের যুক্ত রাখতে হবে।

আমাদের নির্লিপ্ত পদযাত্রা, পথযাত্রা পরিহার করতে হবে। সুনিয়ন্ত্রিত প্রাকৃতিক জীবন যাপন, ধারণ করার দিকে অগ্রসর হতে হবে। বিশ্বমানবতাকে সংকটমুক্ত করতে দায়িত্বশীল হতে হবে । জীবনযাত্রাকে বাহুল্যমুক্ত করতে হবে। আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎকে সিএফসি মুক্ত রাখতে হবে। ওজোন স্তরের পুরুত্ব বাড়াতে হবে। সিএফসি মুক্ত পৃথিবী গড়তে হবে। আসুন, সর্ব প্রকার নির্লিপ্ততা পরিহার করি।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, অধ্যাপক, কর্ণফুলি গবেষক