দেশের জ্বালানি বাজারে আবার বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম একলাফে ৩৮৭ টাকা বাড়ানো হয়েছে। মূল্যস্ফীতির কষাঘাতে যখন সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত, তখন রান্নার গ্যাসের এই আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি কেবল রান্নাঘরের খরচই বাড়াবে না, বরং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর এক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসেই আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। এবারের এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফনের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি সিপি (কন্ট্রাক্ট প্রাইস) বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়নকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তবে প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেই কি তার পুরো দায়ভার সাধারণ ভোক্তার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া সমীচীন?
বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো, যারা ইতোমধ্যেই চাল, ডাল, তেলের অস্বাভাবিক দামে পিষ্ট, তাদের জন্য একবারে ৩৮৭ টাকা বাড়তি গোনা অত্যন্ত কঠিন কাজ। অনেক পরিবার এখন সিলিন্ডার গ্যাস ছেড়ে আবার লাকড়ির চুলার দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে, যা পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যের জন্য আরেকটি বড় হুমকি।
বিইআরসি দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র বরাবরই ভিন্ন থাকে। সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে খুচরা বাজারে সবসময়ই ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি দুরে সিলিন্ডার বিক্রি হতে দেখা যায়। এখন নতুন করে ৩৮৭ টাকা বাড়ার ফলে ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতারা সিন্ডিকেট করে দাম আরও বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পাবে। প্রশাসনের দুর্বল তদারকির সুযোগ নিয়ে একদল অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ভোক্তাদের পকেট কাটছে। সরকার দাম নির্ধারণ করেই দায় সারছে, কিন্তু সেই দামে মানুষ পণ্যটি কিনতে পারছে কি না, তা নিশ্চিত করার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়।
এলপিজির দাম বাড়লে তার চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হয়। হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবারের দাম বেড়ে যায়, যা পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের খরচ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া শিল্পোৎপাদন ও ছোটখাটো কলকারখানায় যারা এলপিজি ব্যবহার করেন, তাদের উৎপাদন খরচও বাড়বে। সব মিলিয়ে এটি বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঢেউ তুলবে।
সমাধানের পথ কী?
এই পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারকে কেবল দাম নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। অন্তত সাধারণ ভোক্তাদের কথা চিন্তা করে এলপিজি খাতে বিশেষ ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে এলপিজি মজুদ করার ক্ষমতা বাড়ানো এবং দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে। বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যে যেন এলপিজি বিক্রি হয়, তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে।
আমদানিকৃত এলপিজির ওপর শুল্ক ও কর সাময়িকভাবে কমিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া যেতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস ওঠা এই সময়ে এলপিজির দাম ৩৮৭ টাকা বাড়ানো কোনোভাবেই জনবান্ধব সিদ্ধান্ত হতে পারে না। আমরা আশা করি, সরকার দ্রুত বিষয়টিকে পুনর্বিবেচনা করবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে জ্বালানির দাম ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। অন্যথায়, জনজীবনে ক্ষোভের যে আগুন জ্বলছে, তা প্রশমিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এ মুহূর্তের সংবাদ

















































