এম আব্দুল হালীম বাচ্চু »
ফেব্রুয়ারির ভোরে শহরের বাতাসে একধরনের নীরব কম্পন থাকে যেন অদৃশ্য কোনো শঙ্খধ্বনি ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। আমি যখন খালি পায়ে শহীদ মিনারের দিকে হাঁটি, তখন মনে হয় পায়ের নিচের মাটি কেবল ধুলো নয়, ইতিহাসের উষ্ণ ছাই। দূরে লাল-সাদা ফুলের বৃত্ত, আর আকাশে মৃদু আলো। এই দিনটিকে আমরা বলি একুশ; কিন্তু আমার কাছে একুশ মানে কেবল তারিখ নয়, এক গভীর ভালোবাসার নাম।
শৈশবে মা আমাকে গল্প শোনাতেন ভাষার জন্য জীবন দেওয়া তরুণদের কথা। সেই গল্পে ছিল রক্তের লাল, ছিল বুকের ভেতর বজ্রের মতো উচ্চারণ-“আমার ভাষা, আমার অধিকার।” বড়ো হতে হতে বুঝেছি, ভাষা কেবল শব্দের মালা নয়; ভাষা আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস। আমাদের নীরবতারও উচ্চারণ। একুশ আমাকে শিখিয়েছে, ভালোবাসা কখনো কখনো প্রতিবাদ হয়ে ওঠে, আর প্রতিবাদই হয়ে ওঠে কবিতা।
আমি প্রথমবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস- এর প্রভাতফেরিতে অংশ নিই কলেজে পড়ার সময়। সেদিন ভোরের আলোয় শহিদ মিনারের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম সকল মানুষের চোখে একইরকম আর্দ্রতা। কেউ কবিতা পড়ছিল, কেউ গান গাইছিল-“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো”- সেই সুরে যেন ভেসে উঠছিল বাংলাদেশের মানচিত্র। আমি অনুভব করলাম, ভাষা আমাদের কেবল আলাদা করে না, একসঙ্গেও বাঁধে। এইতো কিছুদিন আগেই আমি গিয়েছিলাম রাশিয়ান সিটিতে। সেখানে রাশিয়ান ভাষার কোলাহলে নিজের ভাষার শব্দগুলো মনের ভেতর আরও স্বচ্ছ আরও হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠছিল। বিদেশি নানান ভাষার খিচুনি থেকে বাঁচতে দ্রুতই ফিরে আসি আমার প্রিয় বাংলা ভাষা চত্বরে। এই যে বাংলায়— “ফিরে আসি” বলার যে কোমলতা, যে সৌন্দর্য তার সমার্থক শব্দ বাক্য আর কোথাও নেই। আমি বুঝেছি, বাংলা ভাষা মানে আমার অনুভূতির ঘর; ভাষা মানে সেই দরজা, যা খুললেই ভেতর থেকে ভেসে আসে শৈশবের গন্ধ, মায়ের মধুর হাসি! সেদিন রাশিয়ান সিটির জানালায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে উচ্চারণ করেছিলাম— বাংলা আমার ভালোবাসা, একুশ আমার প্রাণ।
প্রতিবছর একুশের সকালে শহিদ মিনারে ফুল দিতে গিয়ে আমি প্রায়ই ভাবি, আমরা কি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় ভাষাকে স্মরণ করি? না কি প্রতিদিনের ভাষা ব্যবহারেই তাকে সম্মান করি? ভুল বানানে লেখা সাইনবোর্ড, অযত্নে উচ্চারিত শব্দ, এসব দেখে মন কেমন যেন করে! ভাষা তো আমাদের আত্মপরিচয়ের আয়না; সেই আয়নাকে ঝাপসা হতে দেওয়া কি আমাদের উচিত?
আজও যখন ফেব্রুয়ারির হাওয়া গায়ে এসে লাগে, তখন মনে হয় কেউ যেন কানে কানে বলে যাচ্ছে- ভালোবাসো তোমার ভাষাকে, যত্ন করো তার উচ্চারণে, তার ব্যাকরণে, তার সৌন্দর্যে। একুশ আমাকে শিখিয়েছে, ভালোবাসা মানে কেবল আবেগ নয়; দায়িত্বও। আর সেই দায়িত্বের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভাষা শহিদদের নাম এবং স্বাধীনতার আসল স্বাদ।
তাই প্রতিবছর এই দিনে আমি নীরবে প্রতিজ্ঞা করি-ভাষাকে কেবল স্মরণ নয়, জীবনের প্রতিটি শব্দে, বাক্যে বাঁচিয়ে রাখব। কারণ একুশ আমার ভালোবাসা; আর এই ভালোবাসাই আমাকে এবং আমাদেরকে মানুষ করে তোলে।























































