স্বাবলম্বী শুকনাছড়িপাড়া
উন্নয়ন মানেই কেবল সরকারের বরাদ্দ বা বিদেশি দাতা সংস্থার প্রকল্পের দিকে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকা নয় তা বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার দুর্গম শুকনাছড়িপাড়ার বাসিন্দারা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। সরকারি কোনো সাহায্য ছাড়াই পাহাড়ি এই গ্রামের মানুষ নিজেদের শ্রমে ও অর্থায়নে সুপেয় পানির ব্যবস্থা, চলাচলের রাস্তা এবং একটি স্কুল গড়ে তুলেছেন। তাঁদের এই উদ্যোগ কেবল একটি গ্রামকে স্বাবলম্বী করেনি, বরং দেশের প্রচলিত উন্নয়ন ভাবনার সামনে এক শক্তিশালী উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে শুকনাছড়িপাড়ার মানুষ পানির তীব্র সংকটে ভুগছিলেন। ঝরনার পানি আনতে তাঁদের মাইলের পর মাইল দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হতো। কিন্তু আক্ষেপ করে সময় নষ্ট না করে গ্রামবাসী একতাবদ্ধ হয়েছেন। নিজেদের বাগানের কলা ও বাঁশ বিক্রি করে তাঁরা অর্থ জোগাড় করেছেন। সেই অর্থ দিয়ে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দূর থেকে পাইপের মাধ্যমে গ্রামে পানি আনার ব্যবস্থা করেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা নিজেদের যাতায়াতের জন্য শ্রম দিয়ে তৈরি করেছেন রাস্তা এবং সন্তানদের শিক্ষার জন্য গড়ে তুলেছেন একটি স্কুলঘর।
শুকনাছড়িপাড়ার এই সাফল্য আমাদের উন্নয়নের একটি বড় সংকটের কথা মনে করিয়ে দেয়। অনেক সময় সরকারি কোটি কোটি টাকার প্রকল্প আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। অথচ জনগণের অংশগ্রহণ যেখানে সরাসরি থাকে, সেখানে নামমাত্র খরচে বড় পরিবর্তন সম্ভব। গ্রামবাসীর নিজস্ব তহবিলের দেড় লাখ টাকা এবং হাড়ভাঙা খাটুনি যা অর্জন করেছে, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি কয়েক কোটি টাকার প্রকল্পও তা করতে পারে না।
তবে শুকনাছড়িপাড়ার এই আত্মনির্ভরশীলতাকে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং লজ্জিত হওয়া উচিত যে, স্বাধীনতার এত বছর পরও একটি জনপদকে প্রাথমিক নাগরিক সুবিধার জন্য নিজেদের চাষের ফসল বিক্রি করে অর্থ জোগাড় করতে হয়। সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচিত ছিল অনেক আগেই সেখানে সুপেয় পানি ও রাস্তার ব্যবস্থা করা। গ্রামবাসী যে কাঠামো তৈরি করেছেন, এখন সেটিকে টেকসই করতে এবং রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া জরুরি।
শুকনাছড়িপাড়া আজ সারা দেশের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। তাঁদের এই ‘জনউদ্যোগ’ প্রমাণ করে যে, ঐক্যবদ্ধ ইচ্ছাশক্তি থাকলে দুর্গম পাহাড়কেও জয় করা সম্ভব। দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন বা গ্রামের মানুষ যদি এভাবে স্থানীয় সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসে এবং প্রশাসন যদি তাঁদের যথাযথ সহযোগিতা দেয়, তবে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। শুকনাছড়িপাড়ার বাসিন্দাদের জানাই অভিবাদন; তাঁরা আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে হাত না পেতে নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই গড়তে পারে।


















































