ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক : অঙ্গীকার রক্ষিত হয়েছে কিন্তু অনেক দূর যেতে হবে

0
58

রায়হান আহমেদ তপাদার »

২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি নিয়ে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার যে বিতর্ক চলছে, তাতে সামান্য আশার আলো দেখা গিয়েছে বলে মনে করছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের নিউক্লিয়ার ওয়াচডগ সংগঠন জানিয়েছে চুক্তির বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে তেহরান। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা কোনো রকম আলোচনাতেই যেতে চাচ্ছিল না। সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল এটোমিক এনার্জি এজেন্সির (আইএইএ) ডিরেক্টর জেনারেল রাফায়েল গ্রসি ভিয়েনায় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ইরান তাদের সঙ্গে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। ইরানের একাধিক অঞ্চলে ইউরেনিয়ামের মজুত আছে বলে আইএইএ-র বহুদিনের অভিযোগ। গত কয়েকমাসে তা আরো বাড়ানো হয়েছে বলা হয়েছে। কিন্তু ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলে আইএইএ-র কোনো কর্মকর্তাকে ইরানে ঢুকতে দেওয়া হবে না এবং ওই অঞ্চলগুলিতে যেতে দেওয়া হবে না। গ্রসি জানিয়েছেন, ইরান এ বিষয়ে আলোচনার আশ্বাস দিয়েছে। শুধু তাই নয়, জাতিসংঘের এটোমিক ওয়াচডগের সঙ্গেও বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনার প্রস্তাবে রাজি হয়েছে ইরান। ইরানের সিদ্ধান্তের পিছনে জার্মানি, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের হাত আছে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, জাতিসংঘে ইরানের বিরুদ্ধে একটি নিন্দা প্রস্তাব জমা দেওয়ার কথা ছিল এই তিনটি দেশের। কিন্তু আপাতত তা স্থগিত করা হয়েছে। তারপরেই সুর সামান্য হলেও নরম করলো ইরান। ছয় বছর আগে যখন ইরান পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল, সেটা ছিল এক স্মরণীয় কূটনৈতিক বিজয়; অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এটা অর্জন করতে হয়েছিল।
সম্প্রতি অনেক বেশি উদার মানসিকতার এবং একই সঙ্গে জরুরি একটা বিষয়ে বিজয় পরিলক্ষিত হয়েছে। ওই চুক্তির কমপ্লায়েন্স সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট স্থাপনাদিতে আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রবেশাধিকার ইরান যদিও সীমিত করেছে, তার পরও একটা তিন মাসের পরিপূরক চুক্তি সম্প্রতি সম্পাদিত হয়েছে। এর ফলে লাগাতার পরিবীক্ষণের ব্যবস্থা হলো। আইএইএর ডিরেক্টর জেনারেল রাফায়েল গ্রোসির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এই স্বল্পমেয়াদি চুক্তি পরিস্থিতিকে আপাতত রক্ষা করল বা পরিস্থিতি সামলানোর একটা ব্যবস্থা করল। এ ব্যাপারে একটা ভয় ছিল, যদিও ইরান নন-কমপ্লায়েন্স কর্মকা-কে সতর্কভাবে আজকের দিন পর্যন্ত একটা স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেন করে বজায় রেখেছে। তবে এ ক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো হয়তো আর ওল্টানো সম্ভব হবে না। ট্রাম্প প্রশাসন এ নিয়ে ব্যাপক হুজ্জতি বাধিয়েছিল। ট্রাম্পের প্রশাসন জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশনকে (জেসিপিওএ) পরিত্যাগ করেছে, চুক্তিটাকে হত্যা করার জন্য যা কিছু করা দরকার তার সর্বোচ্চ যুক্তরাষ্ট্র করেছে। ওই ঘটনার চার বছর পর এই যে একটা সমঝোতা হলো, সেটা একটা ভালো খবর। অবশ্যই ভালো খবর। এর মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নমনীয় আচরণের বহিপ্রকাশ ঘটল ইরানের পক্ষ থেকে, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও। এখন অনানুষ্ঠানিক আলোচনার প্রকৃত সম্ভাবনা তৈরি হলো। এ ব্যাপারে দূতিয়ালি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
এদিকে তেহরান আশ্বস্ত হয়েছে, যে বাইডেন প্রশাসন ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত নিষেধাজ্ঞাকে পুঁজি করে আরো কনসেশন আদায়ের উদ্দেশ্যে কোনো লেভারেজ আরোপ করবে না, যদিও এমনটাই একসময় ভেবে নেওয়া হয়েছিল। কাজেই হাতে এখনো যথেষ্ট সময় আছে-তবে প্রচুর সময় নেই। ইরানের সুপ্রিম লিডার এ ব্যাপারে ভাষণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরান প্রয়োজনে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারে। এ সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এ কথা এক দিক দিয়ে দেখলে ইরানের কট্টরপন্থীদের আশ্বস্ত করার জন্য, একই সঙ্গে তা যুক্তরাষ্ট্রকে তার করণীয় সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য। স্বল্পমেয়াদে এখন যা ঠিক করা হলো, সেটা অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে দেখলে বাইডেন প্রশাসনের চাপান-উতোর এবং নিয়োগমূলক কর্মকা-, পাশাপাশি ই-৩-এর সঙ্গে (জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য) তার কো-অর্ডিনেশন এবিষয়ক অগ্রগতি ঘটানোর প্রবল আগ্রহের নির্দেশক।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-উভয় দেশের সরকার অভ্যন্তরীণভাবে প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছে। জো বাইডেনের বিশাল বড় এজেন্ডা রয়েছে; কিন্তু এর জন্য তাঁর রাজনৈতিক পুঁজি কম। ইরানের মজলিসে আইএইএর স্বল্পমেয়াদি চুক্তিটা তিক্ত সমালোচনার শিকার হয়েছে। সামনের জুনে নির্বাচন, সে সময়ে কট্টরপন্থীদের আরো শত্রুভাবাপন্ন অবস্থায় দেখা যাবে, বিশেষ করে আমেরিকার ব্যাপারে। যদিও একটা সংহত রাজনৈতিক এস্টাবলিশমেন্ট হয়তো কোনো না কোনো উপায়ে বিষয়গুলো সহজ করে দেবে।
আগামী আগস্টে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি তাঁর দপ্তর থেকে বিদায় নেওয়ার আগে, দুই পক্ষ চেনামুখ নিয়ে আলোচনায় বসে চুক্তির বিষয়টির ফায়সালা করতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির বিষয়ে তার সংলগ্নতা চূড়ান্ত করতে পারবে। কূটনীতিতে যত সময় লাগবে ইরান পরমাণু বিষয়ক কর্মকা-ে তত অগ্রগতি সাধন করতে পারবে। সব বিরুদ্ধতার বিরুদ্ধে লড়ে জেসিপিওকে ডাঙায় ভেড়ানোর কৃতিত্ব ই-৩ মানে জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের প্রাপ্য। পূর্বতন ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রবল চাপ থাকার পরেও এবং সমর্থন দানের কার্যকর উপায় খুঁজে বের করায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা সত্ত্বেও ই-৩-এর উদ্যোগ আপাতত একটি কিনারা করতে পেরেছে। অতএব, এ ব্যাপারে (ইরান চুক্তি) অঙ্গীকার রক্ষিত হয়েছে বলা যায়। কিন্তু পুরো চুক্তিটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আরো অনেক দূর যেতে হবে। অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, আমেরিকা যদি আগে তাদের ওপর থেকে সমস্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়, তবেই তেহরান চুক্তিতে ফিরবে। ২০১৫ সালের চুক্তিতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তার পরিবর্তে দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য ২০১৮ সালে এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়ে পুনরায় নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিয়েছিল, যার কারণে ইরান তাদের বেশ কয়েকটি প্রতিশ্রুতির ব্যত্যয় করে।ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ বাড়িয়ে চলছে এবং বলছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ।
এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রিয়্যাক্টর জ্বালানি তৈরির কাজে ব্যবহৃত হতে পারে তবে এই একই জিনিস পারমাণবিক বোমা তৈরিতেও ব্যবহার হয়। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া এবং যুক্তরাজ্যের সাথে ইরানের একটি পরমাণু চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী- তেহরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমিয়ে আনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের পারমাণবিক প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করতে দেবে বলে একমত হয়েছিল।তবে ট্রাম্প ইরানকে নতুন একটি চুক্তিতে আসার জন্য আলোচনা করতে চাপ দেয় এবং এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়ে, ট্রাম্প ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে। ট্রাম্প তেহরানের পরমাণু কর্মসূচির ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য নজরদারি রাখতে চেয়েছিলেন এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর উৎপাদনও থামিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।কিন্তু ইরান তা প্রত্যাখ্যান করে।
২০১৯ সালের জুলাইয়ে, এটি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের শুদ্ধতার মাত্রা ৩.৬৭%-এর চেয়ে বাড়িয়ে চুক্তি লঙ্ঘন করেছে এবং এই বছরের জানুয়ারিতে ঘোষণা করেছে যে তারা ২০% পর্যন্ত বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রেখেছে। অস্ত্র তৈরি করতে ৯০% বিশুদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন। বাইডেনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেবেন কি না। বাইডেন এক কথায় জবাব দিয়েছেন, না। এদিকে, আলী খামেনি বলেছেন যে এই চুক্তির আওতায় ইরানকে সব শর্তে ফিরিয়ে আনতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে সমস্ত নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নিতে হবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম বলছে, আমরা তাদের সবকিছু মূল্যায়ন করব এবং আমরা যদি দেখি যে তারা এই বিষয়ে বিশ্বস্ততার সাথে কাজ করছে, তাহলে আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতিতে ফিরে যাব, তিনি আরও বলেন, এটাই আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, যা বদলাবে না এবং সমস্ত ইরানি কর্মকর্তারা এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। প্রেসিডেন্ট বাইডেন সিবিএসের সাথে ওই সাক্ষাৎকারে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেছেন।তিনি বলেছেন যে বেইজিংয়ের সাথে ওয়াশিংটনের সরাসরি দ্বন্দ্বের দিকে যাওয়ার কোন কারণ নেই, তবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দুটি দেশই চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। যাইহোক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের অবস্থান নানাবিধ কারণে অত্যন্ত শক্তিশালী। ইরানকে কেন্দ্র করে- ইরাক-সিরিয়াসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে দৃশ্যমান এবং অদৃশ্যমানভাবে ইরানের অত্যন্ত শক্তিশালী একটি সামরিক উপস্থিতি আছে। আর ইরানের সেই দৃশ্যমান সামরিক উপস্থিতির বিষয়টি সারা পৃথিবীর বিশ্লেষকরা দেখছেন এবং মূল্যায়ন করছেন। আমেরিকা এবং ইসরাইল নানাবিধ প্রক্রিয়ায় ইরানের স্বার্থ খর্ব করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইরানের কৌশল এবং দেশটির নীতিনির্ধারকদের দক্ষতার কারণে সে কাজটি তারা করতে পারছেন না। আর সে কারণে ঐ অঞ্চলের জন্য ইরান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বলা যায়, ইরানের অঙ্গীকার রক্ষিত হয়েছে কিন্তু অনেক দূর যেতে হবে।

গবেষক ও কলামিস্ট
ৎধরযধহ৫৬৭@ুধযড়ড়.পড়স