আইসিসির সিদ্ধান্তে ফিলিস্তিনে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু

0
91

সুভাষ দে »

ফিলিস্তিনবাসী ও বিশ্ব মানবাধিকার সংগঠনগুলির জন্য এটি শুভ সংবাদ যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ফিলিস্তিনের এলাকায় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি ফাতু বেনসুদা জানান, ২০১৪ সাল থেকে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং গাজা উপত্যকার যে সকল এলাকা ইসরায়েল দখল করেছে, সেই সব এলাকা অপরাধ তদন্তের আওতায় আসবে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের পর এ পর্যন্ত ২ হাজার ২৫০ জন ফিলিস্তিনি এবং ৭৪ জন ইসরায়েলের নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহত ফিলিস্তিনিদের অধিকাংশই বেÑসামরিক নাগরিক এবং ইসরায়েলের যারা নিহত হয়েছেন তাদের অধিকাংশই সেনা। (সূত্র : প্রথম আলো, ৫মার্চ ২০২১)
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এ বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে জানায় যে, ফিলিস্তিন ভূÑখ-ে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচারের এখতিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রয়েছে। আইসিসির এই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ফিলিস্তিনের যে সব এলাকা ইসরায়েল দখল করেছে এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর যে সব নারকীয় অপরাধ সংঘটন ও নির্যাতন চালিয়েছে, সে সবের অভিযোগ ও বিচার চাইতে পারবে ফিলিস্তিনবাসী। আইসিসির এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিতায়েহ বলেছেন, আইসিসির এই সিদ্ধান্ত ন্যায়বিচার ও মানবতা, সত্যের মূল্যবোধ, স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা এবং শহীদদের রক্তের জন্য এক বড় বিজয়।
আইসিসির তদন্ত শুরুর প্রক্রিয়া ইসরায়েল ও তার মুরুব্বি যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র নেড প্রাইস আইসিসির ঘোষণাকে দৃঢ়ভাবে নাকচ করার কথা বলেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আইসিসির পদক্ষেপকে ইহুদি বিদ্বেষ বলেছেন। অন্যদিকে ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিয়াদ আল মালিকি বলেন, ইসরায়েলের নেতারা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আইসিসির তদন্তের বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সমর্থন করলো, যা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষকে হতাশ করেছে। আমেরিকার নতুন প্রশাসন যে ইহুদি লবির বিরুদ্ধে যেতে পারবে না তা যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তে পরিষ্কার হলো। ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে জো বাইডেন যে পরিবর্তন আনবেন তা দুরাশা মাত্র। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় ইরান সমর্থক গোষ্ঠীর অবস্থানের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজা বাদশাহদের আমেরিকা হাতে রাখবে কেননা তাদের অস্ত্র বিক্রি করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও খনিজ সম্পদের ওপর ইউরোপ ও আমেরিকা কর্তৃত্ব কিছুতেই হারাতে চাইবে না। এর পরিণতিতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতÑসংঘর্ষ কখনো বন্ধ হবে না আর এটা অব্যাহত রাখতে পারলে ইসরায়েল নিরাপদ থাকবে।
বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলিও ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের হত্যাÑনির্যাতনের ব্যাপারে খুব একটা সরব নয়। ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র নেই, বিশ্বে তারাই দুর্ভাগ্যজনক জনগোষ্ঠী যাদের একদা বিস্তৃত ফিলিস্তিন পিতৃভূমি থাকলেও এখন তারা নিজ দেশে অনেকটা উদ্বাস্তু জীবনযাপন করছে। অপরের করুণার ওপর নির্ভর করে তাদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে। তাদের সাথে কিছুটা মিল রয়েছে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর। তাদের একটা আরাকান রাজ্য ছিলো। ইতিহাসÑঐতিহ্যÑসংস্কৃতি ছিলো, বার্মার স্বাধীনতার জন্য তারাও রক্ত দিয়েছে, আন্দোলন করেছে অথচ এখন তারা স্বদেশে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের নাগরিকত্ব নেই। তারা রাষ্ট্রহীন নাগরিক। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার নির্যাতনে ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেদ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতনের অভিযোগের শুনানি করছে। কিছু অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশও দিয়েছে। আমরা আশা করি দেরিতে হলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ফিলিস্তিন ভূখ-ে হত্যা, নিপীড়ন নির্যাতনের তদন্তের আদেশ দিয়ে মানবাধিকার রক্ষায় এক বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করলো।
১৯৯৩ সালে অসলোতে ১ম দফা এবং ওয়াশিংটনে দ্বিতীয়বার ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে ফিলিস্তিনের স্ব-শাসন এবং পর্যায়ক্রমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। এর আগে ১৯৪৮ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষে জাতিসংঘ ফিলিস্তিন ভূ-খ-ে ২টি স্বাধীন রাষ্ট্র স্থাপনের প্রস্তাব নেয় কিন্তু ইসরায়েল শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তার দখলদারিত্ব কায়েম করে। হাজার হাজার ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে আরবরা পরাজিত হয়। ঐ সকল দেশের অনেক এলাকা ইসরায়েল দখল করে নেয়। পরে জর্ডান, মিসর ও সিরিয়ার দখলকৃত এলাকার অধিকাংশ ফিরিয়ে দেয়।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিরা প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তোলে বিগত শতকের ষাট দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে, গেরিলা ও সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে। ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ সংগ্রাম বিশ্ববাসীর সহানুভূতি ও সমর্থন লাভ করে। তাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম জোরদার হয় সত্তর ও আশির দশকে।
অসলো শান্তি চুক্তির পর ফিলিস্তিনে সীমিত আকারে স্ব-শাসন প্রতিষ্ঠায় ইয়াসির আরাফাত সফল হয়েছিলেন কিন্তু আরাফাতের মৃত্যুর পর ইসরায়েল ফিলিস্তিনি এলাকায় দখল, সম্প্রসারণ করে এবং অবৈধ ইসরায়েল বসতি স্থাপন করে। ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন নির্যাতন বৃদ্ধি পায়। শান্তি চুক্তির পর ২৭ বছর অতিক্রান্ত হলেও শান্তি এখনও অধরা। ফিলিস্তিন ইসরায়েল রাষ্ট্র স্বীকার করে নিলেও ইসরায়েল জাতিসংঘ ও অসলো প্রস্তাব অনুসারে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাধা সৃষ্টি করতে জোরজবরদস্তিভাবে সেনা প্রহরায় দখলদারিত্ব সম্প্রসারণ করতে থাকে। এমন কি আমেরিকা ও ইসরায়েল ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্যের উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলিকে মদদ দিতে থাকে। এর ফরে ফিলিস্তিনের জাতীয়তাবাদী শক্তি বিভক্ত হয়ে পড়ে। গাজা এলাকা ধর্মীয় রক্ষণশীল গোষ্ঠী হামাস এর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, পশ্চিম তীরে মাহমুদ আব্বাস এর সরকার প্রশাসন চালায়।
বিগত ১৫ বছর ফিলিস্তিনে নির্বাচন হয়নি সম্প্রতি হামাস ও ফাত্তা নির্বাচন অনুষ্ঠানে সম্মত হয় এবং নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবে বলে তাদের মধ্যে চুক্তি হয়। এটি ফিলিস্তিনবাসীর জন্য শুভ সংবাদ। এখন এটা পরিষ্কার যে, বিশ্ব বাস্তবতা উপলব্ধি করে হামাস ও ফাত্তাকে ফিলিস্তিনিদের ঐক্যবদ্ধ করতে হবে এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জোরদার করতে হবে। ফিলিস্তিনিদের জাতিগত বিভক্তির কারণে ‘অসলো’ শান্তিচুক্তির কার্যকারিতা এগোয়নি এবং তা ইসরায়েল ও তার আমেরিকানÑইউরোপীয় মিত্রদের ইসরায়েলি আধিপত্য কায়েমের সুযোগ করে দেয়।
ফিলিস্তিনিরা তাদের স্বাধীন ভূ-খ-ের জন্য অনেক রক্ত দিয়েছে, নিপীড়ন-নির্যাতন সহ্য করেছে। আমরা চাই জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন ভূখ- ও সার্বভৌম সরকার প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ প্রস্তাব ও অসলো শান্তি চুক্তি কার্যকর করতে পদক্ষেপ নেবে। এ জন্য ফিলিস্তিনবাসীকে শান্তিপূর্ণ পন্থায় নির্বাচন সম্পন্ন করে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধভাবে অগ্রসর হতে হবে। সেই সাথে আমরা আশা করি, আমেরিকার জো বাইডেন প্রশাসন ট্রাম্পের চ-নীতি থেকে সরে এসে ফিলিস্তিনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার বর্তমান নীতির পরিবর্তন না হলে ইসরায়েলের স্বার্থ নিরাপদ থাকবে অথচ দুর্ভাগ্যের বিষয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি এই সহজ সরল সত্যটি বুঝতে অক্ষম। তারা জাতি- গোত্র এবং ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে বছরের পর বছর।
ফিলিস্তিনবাসীর ওপর ইসরায়েলের নিপীড়ন, নির্যাতন, ফিলিস্তিনি ভূ-খ-ে অবৈধ দখল ও বসতি নির্মাণ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। একটি প্রাচীন সভ্যতার জনপদ এখন রক্তাক্ত। সভ্যতা ও মানবতার স্বার্থেই ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতনের অবসান প্রয়োজন। প্রয়োজন তাদের নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনের অধিকারের স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ফিলিস্তিনি ভূ-খ-ে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের যে তদন্ত শুরু করার প্রক্রিয়া সূচনা করেছে তাতে এতদিনকার বিশ্ববাসীর দায়মোচনের সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। আরব রাষ্ট্রগুলি অনেক আগেই এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যেতে পারতো যেমন করে গাম্বিয়া রোহিঙ্গাদের পক্ষ নিয়ে আইসিসিতে অভিযোগ উত্থাপন করেছে।
ওআইসি জাতিসংঘেও ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দৃঢ় ভূমিকা রাখতে পারেনি বরং কিছু আরব রাষ্ট্র ইসরায়েলের সাথে সখ্য স্থাপনে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আমরা আশা করি আইসিসির তদন্তে ইসরায়েলের আগ্রাসী ও অত্যাচারী ভূমিকা বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হবে। আমরা বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠন, শান্তিবাদী মানুষ, লেখক বুদ্ধিজীবীদের ফিলিস্তিনবাসীর সমর্থনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।

লেখক : সাংবাদিক