লালদিয়ায় উচ্ছেদ হবেই!

0
182

কর্ণফুলী দখল
কেউ গৃহহীন থাকলে গৃহের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে : নৌ প্রতিমন্ত্রী
নদীর অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতেই হবে : অ্যাডভোকেট মানজিল মোরশেদ
১ মার্চ থেকে শুরু হতে পারে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া : বন্দর কর্তৃপক্ষ

ভূঁইয়া নজরুল :
কর্ণফুলী নদী তীরের লালদিয়া চরের বসতি উচ্ছেদ পাঁচদিন পেছালেও উচ্ছেদ প্রক্রিয়া থেকে পিছু হটছে না চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। আর আদালতের নির্দেশনা মানতে পিছু হটার সম্ভাবনাও নেই। আগামী ৯ মার্চের মধ্যে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তা আদালতকে জানানোর কাজও বন্দর কর্তৃপক্ষকে করতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার জন্য কিছু সময় চাওয়া হলে আজ বৃহস্পতিবার থেকে উচ্ছেদ কার্যক্রম না করে আগামী ১ মার্চ করা হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি ম্যানেজারর (এস্টেট) জিল্লুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘কিছু সময় দেওয়ার জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে আর্জি জানানোর কারণে এই সময় দেয়া হয়।’
তবে সময় দেওয়া হলেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তার অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তিনি গতকাল বিকেলে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, বন্দর এলাকায় জনবসতি থাকার কথা নয়। বিদেশিরা যখন এই বন্দরে এসে জনবসতি দেখতে পায় তখন বিশ্বে এই বন্দর সম্পর্কে একটি নেগেটিভ ধারণা জন্ম নেয়। নদীর পাড় থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে আদালতের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়ার পর আমরা তা বাস্তবায়ন করছি।
কিন্তু লালদিয়ার চরের বসতিদের পুনর্বাসন না করে উচ্ছেদ কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বৈধ বসতিদের উচ্ছেদ করা হলে অবশ্যই পুনর্বাসন করা হতো। কিন্ত এই স্থানে যারা রয়েছে, সবাই অবৈধ বসতি। অবৈধ বসতিদের পুনর্বাসন করা যায় না।
বিগত অর্ধ শতাব্দী বছর ধরে তারা এই এলাকায় বসবাস করছে এবং বিমান বাহিনীর জহুরুল হক ঘাঁটির জন্য তারা তাদের বাপ-দাদার ভিটে ছেড়ে এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছেন। তাহলে তাদের পুনর্বাসন নয় কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার জানামতে এমন কোনো লোক এখানে নেই। এখানে যারা রয়েছেন তারা অনেকে মধ্যস্বত্বভোগী। ঘর তৈরি করে ভাড়া দিয়ে টাকা আয় করছেন। আমরা সেসব লোকদের তালিকা তৈরি করছি।
তিনি আরো বলেন, তারপরও তাদের মধ্যে যাদের ঘর থাকবে না এমন লোকদের সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্যই গৃহের ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। মানবতার নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গৃহহীনদের জন্য গৃহ নির্মাণ করে দিচ্ছেন।
কিন্তু এই এলাকা উচ্ছেদের পর কি ইনকনট্রেন্ড কনটেইনার টার্মিনালের মতো বেসরকারি কোনো কোম্পানিকে বরাদ্দ দেয়া হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রশ্নই আসে না। একসময় বন্দরের হয়তো সক্ষমতা ছিল না। কিন্তু এখন বন্দরের নিজস্ব প্রয়োজনেই এই জায়গা লাগবে এবং সেই অনুযায়ী ব্যবহার করা হবে।

লালদিয়া চরবাসীর দাবি পুর্নবাসন
লালদিয়ার চরে তিনটি ব্লক রয়েছে। ১৯৩৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এই তিনটি ব্লক অধিগ্রহণ করেছিল। এরমধ্যে একটি ব্লক (১৩ ও ১৪ নম্বর খালের মধ্যবর্তী জায়গা) ২০০৫ সালের জুলাই মাসে উচ্ছেদ করেছিলেন তৎকালীন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরী। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি তখন তা উচ্ছেদ করেছিলেন। সেই উচ্ছেদকৃত জায়গায় পরবর্তীতে গড়ে তোলা হয়েছে ইনকনট্রেন্ড টার্মিনাল। এখন ১২ ও ১৩ নম্বর খালের মধ্যবর্তী এবং ১৪ ও ১৫ নম্বর খালের মধ্যবর্তী দুটি জায়গা রয়েছে। এখন এই জায়গা দুটি উচ্ছেদ করা হবে।
গত দুই দিন ধরে লালদিয়ার চর এলাকা ঘুরে এবং সেখানকার মানুষের সাথে কথা হয়। তারা জানান, দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের দিকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জহুরুল হক বিমান ঘাঁটি সম্প্রসারণের সময় তাদের বসতি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের লালদিয়ার চর এলাকায় বসতি স্থাপন করতে দেয়া হয়। এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সালেহ আহমদ চৌধুরী বলেন, আমাদের বাপ দাদাদের ভুল ছিল এই জায়গা নিজেদের নামে লিজ দলিল করেনি। বঙ্গবন্ধুর মৌখিক কথার ভিত্তিতে এবং তখনকার সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য এম এ মান্নানের মাধ্যমে লালদিয়ার চর এলাকায় লোকদের বসতি স্থাপন করতে দেয়া হয়। সেই থেকে আমরা এখানেই রয়েছি।
কিন্তু বন্দরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এই এলাকায় স্থানীয় কোনো মানুষ নেই, বিভিন্ন স্থান থেকে জড়ো হয়ে এখানে বসতি স্থাপন করা হয়েছে। এমন প্রশ্নের জবাবে সালেহ আহমদ চৌধুরী বলেন, যদি স্থানীয় মানুষ না হতো তাহলে তাদের জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, কবরস্থান এবং সরকারি টাকা খরচ করে নদীতীর সংরক্ষণের জন্য ব্লক তৈরি করা হতো না।‘
তিনি আরো বলেন, বন্দরের প্রয়োজনে আমরা অবশ্যই জায়গা ছেড়ে দিব। কিন্তু আমাদের পুনর্বাসন করা যেতো।
আদালত কি বলেছে ?
কর্ণফুলী নদীর উভয় তীরের অবৈধ স্থাপনা নিয়ে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের রিট মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সেই মামলা বাদি ছিলেন অ্যাডভোকেট মানজিল মোরশেদ। ২০১০ সালের ৮ জুলাই দায়ের করা সেই মামলার শুনানি শেষে ২০১৬ সালের আগস্টে হাইকোর্ট উভয় তীরের স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছিল। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলেও পরবর্তীতে তা বন্ধ হয়ে যায়। এ বিষয়ে আদালত থেকে কয়েকদফা নির্দেশনা দেয়ার পর সম্প্রতি নদী তীরের সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে আগামী ৯ মার্চের মধ্যে তা জানাতে বলা হয়েছে। এবিষয়ে মামলার বাদি মানজিল মোরশেদ বলেন, নদী তীরের অবৈধ বসতি অবশ্যই উচ্ছেদ করতে হবে। আর পুনর্বাসন ভিন্ন একটি প্রক্রিয়া। উচ্ছেদের সাথে পুনর্বাসনের কোনো সম্পর্ক নেই। সরকার চাইলে পুনর্বাসন করতেও পারে নাও পারে। তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব গৃহহীনদের গৃহের ব্যবস্থা করা। সরকারের পক্ষ থেকে সেই কাজটি চলমান রয়েছে।
উল্লেখ্য, কর্ণফুলী নদীর উভয় তীরের অবৈধ স্থাপনা নিয়ে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের রিট মামলা দায়ের করে। সেই মামলা বাদি ছিলেন অ্যাডভোকেট মানজিল মোরশেদ। ২০১০ সালের ৮ জুলাই দায়ের করা সেই মামলার শুনানি শেষে ২০১৬ সালের আগস্টে হাইকোর্ট উভয় তীরের স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছিল। আদেশে জেলা প্রশাসককে ওই এলাকা জরিপ করে আরএস ও বিএস শিট অনুযায়ী অবৈধ স্থাপনার তালিকা দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের জুনে সেই তালিকা আদালতে জমা দেয়ার পর শুনানি কার্যক্রম শুরু হয়। শুনানির পর আদালত আরএস শিট অনুযায়ী উচ্ছেদের রায় দেয় ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট। উচ্ছেদ কার্যক্রম ধারাবাহিক না থাকায় আদালতের পক্ষ থেকে দফায় দফায় নির্দেশনা দেয়া হয়। সর্বশেষ উচ্ছেদ করে তা আগামী ৯ মার্চের মধ্যে আদালতকে জানানোর জন্য বলা হয়। আর তা বাস্তবায়ন করতেই এই উচ্ছেদ অভিযান।