লক্ষ্য শীর্ষ ৩০ বন্দরে আসা

0
164

বন্দর উপদেষ্টা কমিটির ১৪তম সভা

বে টার্মিনালকে ফার্স্ট ট্র্যাক প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবনা তথ্যমন্ত্রীর
বে টার্মিনালে বিদেশিদের পাশাপাশি বন্দরের
নিজস্ব অর্থায়নে টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাবনা
প্রোডাকটিভ বন্দরের জন্য সচল শহরের প্রস্তাবনা সুজনের

নিজস্ব প্রতিবেদক:

এবার টার্গেট চট্টগ্রাম বন্দরকে শীর্ষ ৩০ বন্দরের মধ্যে নিয়ে আসা। গতবছর চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বের শীর্ষ বন্দরগুলোর মধ্যে ৫৮তম স্থান দখল করে। ২০০৯ সালে ৯৭তম স্থান থেকে পর্যায়ক্রমে এ অবস্থানে পৌঁছে চট্টগ্রাম বন্দর। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তা ৩০ এর মধ্যে নিয়ে আসার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী।
চট্টগ্রাম বন্দরের ১৪তম উপদেষ্টা কমিটির সভা শেষে প্রেসব্রিফিংএ তিনি এই লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেন। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বরের পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের শহীদ ফজলুর রহমান মুন্সী মিলনায়তনে গতকাল এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলমের সঞ্চালনায় সভাপতির বক্তব্যে নৌ পরিবহন মন্ত্রী খালিদ মাহমুদ বলেন, একসময় দেশে নেতিবাচক সংবাদ গুরুত্ব পেত। কিন্তু এখন ইতিবাচক সংবাদের গুরুত্ব বেশি। মানুষ ইতিবাচক সংবাদ শুনতে চায়। বাংলাদেশ নিজের টাকায় পদ¥া সেতু নির্মাণ করেছে, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে পারমানবিক ক্লাবে যুক্ত হচ্ছে, গভীর সমুদ্র বন্দরের মালিক হচ্ছে বাংলাদেশ, কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মিত হচ্ছে, কক্সবাজারের ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মিত হচ্ছে। সবমিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
নৌ পরিবহনমন্ত্রী আরো বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এখানে দক্ষ লোকের নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দর সংশ্লিষ্ট সড়কগুলো আধুনিকায়ন করা হবে এবং একইসাথে বন্দর হাসপাতালের পরিসেবা আরো বাড়ানো হবে এবং বন্দর স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে কাজ করা হবে।
তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধিতে আধুনিক ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সবার আগে প্রয়োজন বে টার্মিনাল
উপদেষ্টা কমিটির সভায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ওয়াসিকা আয়েশা খান বলেন, বে টার্মিনাল একটি রেডি পোর্ট, কিন্তু এটি কেন বিলম্বিত হচ্ছে তা বোধগম্য হচ্ছে না। সবার আগেই বে টার্মিনাল বাস্তবায়ন করা জরুরি।
জুম অ্যাপের মাধ্যমে যুক্ত হওয়া চিটাগাং চেম্বারের প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলমও একই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বে টার্মিনালের সেভাবে অগ্রগতি হচ্ছে না। চট্টগ্রাম বন্দরের স্বার্থে তা দ্রুত এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
সভায় অংশ নেওয়া অনেক বক্তাই বে টার্মিনাল বাস্তবায়ন নিয়ে কথা বলেছেন। একইসাথে বে টার্মিনালে কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, যতো দ্রুত সম্ভব বে টার্মিনালে কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণ করা যাবে, চট্টগ্রাম শহর ততো দ্রুত যানজট থেকে মুক্তি পাবে।
যানজটের বিষয়ে জুম অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে যুক্ত হওয়া তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, এই যানজটের কারণে বিদেশিরা চট্টগ্রামে এলে প্রথমেই একটি নেতিবাচক ধারণা পেয়ে যায়। তাই দ্রুত বে টার্মিনালে ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণ করা জরুরি।
ড. হাছান মাহমুদ আরো বলেন, বে টার্মিনালের সব টার্মিনাল বিদেশিদের দেয়া সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অর্থায়নে কিছু টার্মিনাল বাস্তবায়ন করতে পারে। আর বাকি কয়েকটি টার্মিনাল বিদেশিদের দেওয়া যেতে পারে। আর তা করা না হলে পুরো বন্দর বিদেশি অপারেটরের হাতে চলে যাবে।
বে টার্মিনালকে ফার্স্ট ট্র্যাক প্রকল্পের আওতায় আনার জন্য ২০১৬ সালে আমি নিজে প্রস্তাবনা করেছিলাম বলে উল্লেখ করেন ড. হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘এমন উপদেষ্টা কমিটির সভায় তৎকালীন নৌ মন্ত্রী তা লিপিবদ্ধ করলেও তা ফার্স্ট ট্র্যাকের আওতায় আসেনি। আমি বর্তমান মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, এই প্রকল্পটি ফার্স্ট ট্র্যাকের আওতায় আনতে সরকারি প্রক্রিয়া যাতে নেওয়া হয়।’
বে টার্মিনাল বিষয়ে নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বে টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়ে বিদেশি কিছু প্রতিষ্ঠানের সাথে সরকারের কথা চলছে। একইসাথে কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণের একটি প্রকল্পও রয়েছে। পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
২০ কিলোমিটার দূরে আরেকটি বন্দর নয়
সাবেক গৃহায়ন মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি বলেন, বে টার্মিনাল দ্রুত শেষ করতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ে বন্দর নির্মাণ বিষয়ে স্টাডি করেছে, সেখানেও একটি বন্দর হতে পারে। ২২ হাজার একর জায়গা নিয়ে ইকোনমিক জোন গড়ে উঠছে, তাই সহজেই সেখানে টার্মিনাল গড়ে উঠতে পারে।
কিন্তু এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে যদি সারা দেশের ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি বাস্তবায়ন করা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর যদি ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য সরবরাহ করতে পারে। তাহলে চট্টগ্রাম বন্দরের ২০ কিলোমিটার দূরে মিরসরাই ইকোনমিক জোনে আরেকটি বন্দরের প্রয়োজন রয়েছে কিনা তা ভাবনার বিষয়।
তিনি আরও বলেন, যত্রতত্র বন্দর গড়ে তোলা হলে ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হতে পারে। অনেকে ভারতের সাথে আমাদের উদাহরণ দেন তাদের অনেকগুলো বন্দর। বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের আয়তন প্রায় ৮ গুণ বেশি। তাই তাদের সাথে আমাদের তুলনা দিয়ে লাভ নেই। মিরসরাই ইকোনমিক জোন থেকে উপকূল দিয়ে নির্মিত রোড ও আউটার রিং রোডের দূরত্ব মাত্র ২০ কিলোমিটার। এই ২০ কিলোমিটারও রোড নির্মাণ করা হচ্ছে।
এবিষয়ে নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমাদের সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও এবিষয়ে সোনাগাজীতে একটি টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়ে প্রস্তাবনা দিয়েছেন। তারপরও সভায় যে প্রস্তাবনাগুলো উঠে এসেছে তা নিয়ে আমরা আলোচনায় বসবো।
বন্দর স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানের ও হাসপাতাল আধুনিকায়ন করার প্রস্তাবনা
তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের স্টেডিয়ামটি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করে চট্টগ্রাম নগরের মানুষকে ব্যবহারের সুযোগ দেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে। তবে অবশ্যই বন্দরের কোনো ক্ষতি না করে।
একইসাথে বন্দর হাসপাতালটি আরো আধুনিকায়ন করে সেখানে যদি নগরবাসীর সেবার সুবিধা রাখা যায় তাহলে চট্টগ্রামবাসী উপকৃত হবে। বন্দর নিজস্ব অর্থায়নে এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে পৃথকভাবে বাস্তবায়নে আইনি জটিলতা দেখা দেয়।
প্রোডাকটিভ বন্দরের জন্য প্রয়োজন একটি সচল শহর
চট্টগ্রাম বন্দরকে বাংলাদেশের সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁস উল্লেখ করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র এবি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ধ্যানজ্ঞান ছিল চট্টগ্রামকে নিয়ে। তিনি বিএনপি সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বন্দর অবরোধ করে দেয়ার পর প্রমাণিত হলো বন্দর ছাড়া দেশ অচল। তাই চট্টগ্রাম বন্দরের প্রোডাকটিভিটি বাড়াতে হবে।
কিন্তু একটি প্রোডাকটিভ বন্দরের জন্য প্রয়োজন একটি সচল শহর। চট্টগ্রাম মহানগরীর পোর্ট কানেকটিং রোড ও স্ট্যান্ড রোড বন্দরের যানবাহনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই নগরে বন্দর চাইলে তাদের যানবাহনের জন্য একটি পৃথক লেন নির্মাণ করতে পারে। আর তা করা গেলে নগরীর রাস্তাঘাটগুলো নষ্ট হবে না এবং মানুষও দুর্ভোগ থেকে রেহাই পাবে।
কোথায় থাকবে অফডক?
পটিয়া আসনের সংসদ সদস্য সামশুল ইসলাম বলেন, বিগত উপদেষ্টা কমিটির সভায় অফডকগুলো নিয়ে অনেক কথা হয়েছে এবং সেগুলো শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এসব অফডকের কারণে নগরে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এবিষয়ে অফডক মালিকদের সংগঠন বিকডার প্রেসিডেন্ট নুরুল কাইয়ুম খান বলেন, ১৯৯৮ সালে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে অফডকগুলো চালুর নির্দেশনা দিয়েছিল সরকার। একটি অফডক স্থাপন করতে বর্তমানে ৮০০ কোটি টাকা খরচ হয়। আর ২০১৬ সালের নতুন নীতিমালায় নতুন করে ২০ কিলোমিটার দূরে অফডক করতে বলা হয়েছে। কিন্তু পুরনোগুলোর বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন বলেন, ডিটি রোডের পাশে এবং নগরীর যত্রতত্র অফডক গড়ে তোলার কারণে সড়কে যানজট দেখা দেয়। তাই ব্যস্ততম জায়গায় অফডক না হওয়াই শ্রেয়। সেক্ষেত্রে সীতাকুণ্ড থেকে মিরসরাই পর্যন্ত পাহাড় ও রেললাইনের মধ্যবর্তী স্থানে অফডক গড়ে তোলা হলে শহর যানজট মুক্ত থাকবে। একইসাথে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব পণ্য সারাদেশে পৌঁছে দেয়া যাবে।
উপদেষ্টা কমিটির সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সংসদ সদস্য মোসলেম উদ্দিন আহমদ ও মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী। সভায় বক্তৃতা দেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম আবুল কালাম আজাদ। এছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম, কাস্টমসম কমিশনার ফখরুল আলম প্রমুখ। এছাড়া জুমে যুক্ত হয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রফিক আহমেদ, এফবিসিআইসি সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, বিকেএমইএ’র মোহাম্মদ হাতেমসহ আরো অনেকে।