মহিউদ্দিন চট্টগ্রামবাসীর আত্মার আত্মীয় ছিলেন

নিজস্ব প্রতিবেদক
A-b-m-Mohiuddin-Chow_Shok-S

‘মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামবাসীর আত্মার আত্মীয় ছিলেন’- বলেছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু। তিনি বলেন, ‘মহিউদ্দিন চৌধুরী আপনাদের সাথে মন্দ ব্যবহার করতেন, তার কারণ তিনি একটা অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি আপনাদের আত্মার আত্মীয় হয়েছিলেন। সেই অধিকারে মনের ভেতর থেকে আবেগ হয়ে তাঁর কথাগুলো বেরিয়ে আসতো। অথচ একথাগুলোর মর্মার্থ আমরা কোনো দিন যাচাই করিনি।’
গতকাল বুধবার বিকেলে নগরীর জিইসি কনভেনশন সেন্টারে নগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত শোকসভায় উপসি’ত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি কথাগুলো বলেন।
‘মহিউদ্দিন চৌধুরীর হৃদয়ে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া কিছু ছিল না’ জানিয়ে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, ‘ তিনি তো ঢাকার কোনো লোককে গালাগালি করতে যাননি, তিনি তো ঢাকার কোনো নেতাকর্মীর সাথে খারাপ ব্যবহার করেননি। তিনি বলতেন আপনার সাথে, আপনাদের সাথে। তিনি গালাগলি, তিরস্কার করতেন মানুষের কল্যাণের জন্য।’
‘আমরা অনেকে অনেকভাবে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে বিশ্লেষণ করতে পারি’ উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ নেতা বলেন, ‘নির্বাচনের (২০০৯ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচন) পর কয়েকজন ছাত্রনেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে আমার সাথে কথা বলছিলো। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলাম- ‘তোমরা কেন তাঁর বিরোধিতা করছো?’ তারা আমাকে বললো- ‘মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটা অপপ্রচার ছিল; তাঁর মুখ খারাপ।’ আমি বললাম- ‘একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে কখন গালি দিতে পারে, একটা মানুষ আরেকজন মানুষের ওপর কখন অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে -সেই মানুষটিকে যখন অত্যন্ত আপন মনে করে। আপন মনে না করলে সে মানুষটার সাথে খারাপ ব্যবহার করতে পারে না, শাসন করতে পারে না।’
সাবেক সিটি মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্মৃতিচারণ করে আমির হোসেন আমু বলেন, ‘আমি কয়েকবার চট্টগ্রাম থেকে সড়কপথে ভোর বেলায় যখন ঢাকা যেতাম, তখন ৫টার দিকে দেখতাম সে (মহিউদ্দিন) রাস্তায় টহল দিতো। অন্ধকারের সময় তার লোকেরা রাস্তা পরিষ্কার করছে কিনা, ময়লা পরিষ্কার করছে কিনা তিনি সেটা তদারকি করছেন।’
কয়জন লোক তা করে- প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘এটা তো তার (মহিউদ্দিন) দায়িত্ব না। এ কাজটা দেখভালের জন্য তো তার লোক রয়েছে। তারপরও তিনি এটা দেখতেন, তদারকি করতেন।’
মেয়র হওয়ার পর মহিউদ্দিনের জনকল্যাণমূলক কাজের প্রশংসা করে আমু বলেন, ‘সে প্রথম মেয়র হওয়ার কিছু দিন পর আমার সাথে দেখা হয়। বললো, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি রিক্সার রিন্যুয়াল ফি নেবো না, দোকানের সাইন বোর্ডের ফি নেবো না। মসজিদ-মন্দিরের ইলেকট্রিক বিল করপোরেশন থেকে দেবো।’
জনগণের স্বার্থে কয়জন পৌর করপোরেশনের মেয়র বা চেয়ারম্যানেরা এটা চিন্তা করেছে কোনো দিন- প্রশ্ন রেখে আমু বলেন, ‘এগুলো বাস্তবায়নের পরেও মহিউদ্দিন প্রতিটি ওয়ার্ডে স্কুল-কলেজ করেছে, কমিউনিটি ক্লিনিক-হাসপাতাল করেছে, বিশ্ববিদ্যালয় করেছে। এভাবে তিনি তার কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটিয়েছেন।’
মহিউদ্দিন চৌধুরী বিরোধী দলের প্রার্থী হয়েও মেয়র নির্বাচিত হওয়াতে বিস্ময় প্রকাশ করে আমু বলেন, ‘একটি লোক দুঃশাসনের আমলে বিরোধী দলের প্রার্থী হয়েও দুইবার চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। কত গুণের অধিকারী হলে, কতখানি মানুষের মনে তাঁর জায়গা হলে এটা সম্ভব, এটা চিন্তা করার ব্যাপার।’
মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে তাঁর প্রায় সময় দীর্ঘ আলাপ হতো- জানিয়ে আমু বলেন, ‘জাতীয় রাজনীতির বাইরে তার একটি আলাদা জায়গা ছিল। তা হলো-চট্টগ্রামের স্বার্থ সংরক্ষণ। আমি তাকে বলতাম, তোমার রাজনীতির ভেতরে অসঙ্গতি আছে। তুমি একদিকে জাতীয় রাজনীতির কথা বলছো, আরেক দিকে যেটা বলো, সেটা তো মনে হয়, চট্টগ্রামকে একদিন তুমি স্বাধীন ঘোষণা দেবে। সে (মহিউদ্দিন) হেসে বলতো, ‘প্রয়োজনে হতেও পারে। আমাদের অর্থে আপনারা চলেন। আমরা চট্টগ্রাম থেকে সিংহভাগ যে ট্যাক্স দিই, সেই ট্যাক্সেই বাংলাদেশ পরিচালিত হয়। অথচ আমাদের পেছনে আপনারা কোনো খরচ করেন না।’’
মহিউদ্দিন চৌধুরীর নাম ঢাকার প্রত্যেকটি নেতা স্মরণ করতো- জানিয়ে আমু বলেন, ‘যখনই আন্দোলন-সংগ্রামের প্রয়োজন হয়, তখনই নেত্রী বলতেন মহিউদ্দিনকে ফোন করো। সাংগঠনিক কোনো মিটিং, নেত্রীর জনসভা, মহিউদ্দিন চৌধুরীকে ফোন করো। যে কোনো কাজে মহিউদ্দিন চৌধুরীর নামটাই বলা হতো।’
সভায় নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘মহিউদ্দিন চৌধুরী হাঁটি হাঁটি পা পা করে মহীরুহে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি থাকলেও উত্তর ও দক্ষিণ জেলারও অভিভাবক ছিলেন। তিনি একজন অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। তিনি নিজের দক্ষতা, যোগ্যতা ও বিচক্ষণতায় স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।’
নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ফারুকের সঞ্চালনায় সভায় আরো বক্তব্য রাখেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নঈম উদ্দিন চৌধুরী, অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল, খোরশেদ আলম সুজন ও আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চু, যুগ্ম সম্পাদক রেজাউল করিম চৌধুরী, বদিউল আলম ও এম এ রশিদ, সাংগঠনিক সম্পাদক নোমান আল মাহমুদ প্রমুখ।