বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা

0
217

আবদুল হামিদ »

অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। অফুরান প্রাণশক্তি বাঙালি জাতির। কিসিঞ্জার যাকে বলেছিল বটমলেস বাস্কেট। সে জাতি হতে যাচ্ছে আগামীতে পৃথিবীর এগারটি ইমার্জিং ইকোনমির অন্যতম একটি। অত্যন্ত অল্পে তুষ্ট , খরা , বন্যা মোকাবিলা করে এর বাসিন্দারা পৃথিবীর সব উন্নত দেশের মানুষের লজ্জা ঢাকার বস্ত্রই শুধু সরবরাহ করছে না। নিশ্চিত করেছে গ্রামের নিরীহ নারীদের দু’মুঠো অন্ন আর সম্মানজনক একটি শহুরে বাসস্থানের । গড়ে তুলেছে একটি শিল্প – যার নাম গার্মেন্টস শিল্প।
এক সময় এর ক্ষুধাপীড়িত দরিদ্র জাতি-আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, মৎস্য উৎপাদনে পৃথিবীতে চতুর্থ। সত্যি রাজনৈতিক প্রতিকূলতা , ভঙ্গুর অর্থনীতি , ধর্মীয় গোঁড়ামি সহ আরো নানা প্রতিকূলতার নাগপাশ ছাড়িয়ে ফিনিক্স পাখির মত ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠছে একটি জাতি। যার ভূরাজনৈতিক অবস্থান এর কারণে আজ পৃথিবীর অনেক এর কপালে ভাঁজ ফেলে দিচ্ছে। সে অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।
অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে গহীন সমুদ্রের নীল জলরাশির অতল তলে।
পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগই রয়েছে সমুদ্রের গহীন নীল বুকের মাঝে। আধুনিক অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে নতুন একটি নাম বা ধারণা ‘ ব্লু ইকোনমি’। সাম্প্রতিককালে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন সমুদ্র বিজয়। যা মেলে দিয়েছে বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে এগিয়ে যাবার অপার সুযোগ। পবিত্র কুরআনেও সে বিষয়টির উপর আলোকপাত করা হয়েছে। জল-স্থল – আকাশ এ তিনটি এর মধ্যে শুধু স্থলে ও আকাশে হারাম-হালালের বিষয়টি ধর্মে বলা রয়েছে। কি আশ্চর্য ! সমুদ্রের সব কিছুকে ইসলাম ধর্মে হালাল বলা হয়েছে ! ইঙ্গিত করা হয়েছে সমুদ্রের বিশাল সম্পদ রাশির দিকে।
স্বাধীনতার পর যেখানে ছিল মাত্র দুটি বন্দর। সেখানে আগামী ২৯ শে ডিসেম্বর জাহাজ ভিড়ানো মাধ্যমে আমরা পেতে যাচ্ছি চট্টগ্রাম, মংলা, পায়রার পর দেশের চতুর্থ সমুদ্র বন্দর। অপার সম্ভাবনার দেশ পেতে যাচ্ছে অসীম সম্ভাবনার এক সমুদ্র বন্দর – মাতারবাড়ি সমুদ্র বন্দর । চাকুরি জীবনে সদ্য গড়ে ওঠা দুটি বন্দরের (পায়রা ও মাতারবাড়ি) একদম শুরু থেকে শেষ বিজয়ের সাথি হওয়া পরম সৌভাগ্যের।
সরকার এর দূরদৃষ্টি ও সঠিক নির্দেশনায় বন্ধুপ্রতিম দেশ জাপানের সহায়তায় গড়ে ওঠা আগামীর অমিত সম্ভাবনার চাবিকাঠি মাতারবাড়ি বন্দরের প্রতি চেয়ে আছে পুরো জাতি আগামীর প্রজন্ম। আগুনের ফুলকি থেকে হয় দাবানল। বীজ থেকে হয় মহীরুহ। বিন্দু থেকে গড়ে উঠে সিন্ধু। ক্ষুদ্র বালিকণা গড়ে তোলে সাগর অতল। মাতারবাড়ির আজকের এই ক্ষুদ্র পদক্ষেপ বাংলাদেশের অর্থনীতির ভাগ্য আকাশকে অদূর ভবিষ্যতে নিয়ে যাবে হয়তো বিশ্ব আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের মহাসড়কে। মাতারবাড়িতে বাণিজ্যিক জাহাজের আজকের এই যাত্রার দিনটি আগামীর বাংলাদেশকে উন্নত জাতির কাতারে নিয়ে যাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। জাপানিদের গবেষণায় বলা হচ্ছে – কক্সবাজার থেকে ঢাকা এ ভৌগোলিক অঞ্চলটির মাধ্যমে আগামীর বাংলাদেশর জিডিপি এর ৪১ % অর্জিত হবে। এটি বলা হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য সড়ংঃ ারনৎধহঃ ুড়হব ভড়ৎ বপড়হড়সরপ মৎড়ঃিয অঞ্চল। এছাড়া এখানে গড়ে তোলা হচ্ছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা ইকোনমিক জোন (ঊচত)। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮ মিটার বা ২৬ ফুট উচ্চতায় নির্মিত ডেডিকেটেড রাস্তার মাধ্যমে মাতারবাড়ির সাথে চট্টগ্রামের সংযোগ সড়ক নির্মিত হচ্ছে। উক্ত সড়কের দুই পাশে থাকবে সার্ভিস রোড। ফলে মাতারবাড়ি থেকে অত্যন্ত স্বল্প সময়ে বাধাহীনভাবে পণ্য / কন্টেইনার পৌঁছাবে চট্টগ্রামসহ পুরো বাংলাদেশে। সুতরাং চট্টগ্রাম বন্দর এর সক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি সক্ষমতা নিয়ে তথা চট্টগ্রামে আগত জাহাজের পণ্য / কনটেইনার থেকে চারগুণ বেশি পণ্য / কনটেইনার পরিবহন করে – সমগ্র জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার গেটওয়ে হিসেবে বিবেচিত হবে আগামীর মাতারবাড়ি সমুদ্র বন্দর।
শত প্রতিকূলতার বাধা জয় করে যে এগিয়ে যাওয়া যায় তা করে দেখালো নির্ভীক কর্মবীর জাপানি জাতি। করোনাকালে করোনা বাধা অতিক্রম করে দিনের বেলা বন্দর নির্মাণের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর রাতের বেলা অবস্থান নিয়েছিল মাতারবাড়ির সমুদ্রের অদূরে অবস্থানকারী একটি বহুতল জাহাজের আবাসে। আজকের এ অগ্রযাত্রায় শামিল করার জন্য পরম উন্নয়ন সহযোগী অকৃত্রিম বন্ধুপ্রতিম এ দেশটির প্রতি রইল অন্তরের অন্তস্থল থেকে নিখাদ ভালোবাসা ।
মাতারবাড়ি বন্দর সর্বমোট প্রকল্প ব্যয় হিসেবে প্রায় ১৭৭৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে রাস্তা এবং অন্যান্য অবকাঠামোসহ নির্মিত হবে। চট্টগ্রাম বন্দর এর ২২০০ কোটি টাকাসহ বন্দর অবকাঠামোর জন্য সর্বমোট ৮৯০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বাকি প্রায় ৬৭০০ কোটি টাকা জাইকা কর্তৃক বন্দর অবকাঠামোর জন্য অর্থায়ন করবে সেখানে। বর্তমানে জাপানের নেতৃত্বে সমীক্ষা চলছে। ২০২২ জুন নাগাদ উক্ত সমীক্ষা শেষ হবে।
২০২২ জুলাই থেকে বাণিজ্যিক বন্দরটি নির্মাণ শুরু হবে এবং তা ২০২৫ সালে নির্মাণ শেষ হবে। ২০২৫ জুলাই থেকে বাণিজ্যিকভাবে পুরোপুরি বন্দর চালু হবে। তবে দুপাশে সার্ভিস রোডের প্রভিশন রেখে ডেডিকেটেড রাস্তার কাজটি শেষ হবে ডিসেম্বর ২০২৫ সালে। কিন্তু ইতিমধ্যেই বন্দরটি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য অদ্য ২৯/১২/২০২০ তারিখ থেকে চালু হয়ে গেল।
অর্থাৎ কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের মালামাল নিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আজ থেকেই শুরু হল। একটি গভীর বন্দর হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে ১৪ মিটার গভীরতার জাহাজ ভিড়তে পারা। সুখবর হচ্ছে, মাতারবাড়ীতে ১৪ মিটারের স্থলে আরো বেশি গভীরতার অর্থাৎ ১৮ মিটার গভীরতার জাহাজ ভিড়তে পারবে। তবে বাণিজ্যিক জাহাজ ভেড়ানোর জন্য বর্তমানে চ্যানেলটির বিদ্যমান প্রশস্ত হচ্ছে ২৫০ মিটার । তা খনন করে আরো ১০০ মিটার বাড়িয়ে (২৫০+১০০) ৩৫০ মিটার প্রশস্ত করতে হবে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো হিসেবে কয়লা বিদ্যুৎ টার্মিনালের অপর প্রান্তে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ ভিড়ানোর টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। ইতিমধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ৮ মিটার বা ২৬ ফুট উচ্চতায় বন্দরের জন্য ডেডিকেটেড রোড নির্মাণ করে কানেক্টিভিটি সৃষ্টি করা হচ্ছে। রেল নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। ইনশাআল্লাহ, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে বন্দরটি পূর্ণভাবে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য চালু হবে । তবে সবকিছুই নির্ভর করছে জাপানি অর্থায়ন ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে আমাদের সক্ষমতা বা কৌশলের ওপর। বর্তমান চট্টগ্রাম বন্দরের সীমাবদ্ধতা হচ্ছে এখানে মাত্র ৯.৫ মিটার গভীরতার জাহাজ এবং ১৮৩ মিটার দৈর্ঘ্যের জাহাজ ভিড়ানো যায়। তাছাড়া আরও বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে যেটি অনেকেই জানেনা, চট্টগ্রাম বন্দর হচ্ছে কর্ণফুলীর মোহনা থেকে বেশ কয়েকটি বিপদজনক বাঁক পেরিয়ে ১৬ কিলোমিটার ভিতরে। পক্ষান্তরে মাতারবাড়ি চ্যানেল হচ্ছে গভীর সমুদ্র থেকে সরাসরি ১৪/৩ মিটার ভিতরে। তাছাড়া দিনে দুইবার পূর্ণ জোয়ারে শুধুমাত্র দিনের আলোতে জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে ঢুকানো যায়। মাতারবাড়িতে সেই সীমাবদ্ধতা থাকবেনা ২৪ ঘন্টা গভীর সমুদ্র থেকে জাহাজ আনানেয়া করা যাবে । মাতারবাড়ি বন্দর এর গভীরতা ১৮ মিটার হাওয়ায় বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজ যে পরিমাণ কন্টেইনার বা মালামাল নিয়ে আসে, মাতারবাড়ির প্রতিটি জাহাজ প্রায় চারগুণ বড় হওয়ায় চট্টগ্রামে আগত জাহাজের কনটেইনার বা মালামাল অপেক্ষা চার গুণ বেশি কন্টেইনার বা মালামাল আনতে পারবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশের পরিবহন ব্যয় যেমন কমবে তেমনি ভোক্তা পর্যায়ে দেশের জনগণ সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনতে পারবে। তাছাড়া নির্মিত হওয়ার পর এটি দক্ষিণ এশিয়ার কনটেইনার হাব হিসেবেও বন্দরটি ব্যবহৃত হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক