জন্মশতবর্ষ : উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক ড. আহমদ শরীফ

0
43

আহমদ সুজাউদ্দিন »

বিশিষ্টি শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ ও মনীষী অধ্যাপক ড. আহমদ শরীফর এর জন্মশতবার্ষিকী আজ।
ড. আহমদ শরীফের জন্ম ১৯২১ সালেল ১৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার সুচক্রদ-ী গ্রামে। তার পিতার নাম আবদুল আজিজ, মাতার নাম সিরাজ খাতুন। শিক্ষা গ্রহণ করেন পটিয়া ইংরেজি স্কুল, চট্টগ্রাম কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কর্মজীবন শুরু করেন কলেজে শিক্ষকতা, রেডিও ইত্যাদিতে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করে ১৯৮৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন। অধ্যাপক ড. আহমদ শরীফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছিলেন। বাংলাবিভাগের সভাপতি, ডিন ও শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন। এরপর ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে কাজী নজরুল ইসলাম অধ্যাপক পদেও নিয়োগ লাভ করেন। ড. আহমদ শরীফ বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (গবেষণা ক্ষেত্রে) ১৯৫৯ সালে, একুশে পদক লাভ করেন ১৯৯১ সালে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি-লিট ডিগ্রিতে ভূষিত হন ১৯৯৩ সালে।
ড. আহমদ শরীফ বিভিন্ন সাময়িকী ও পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন বিষয়ে অসংখ্য প্রবন্ধ লেখেন। তিনি এদেশের মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, সাংস্কৃতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবং শাসক শ্রেণির নানা গণবিরোধী নীতি ও কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তিনি কোন রাজনৈতিক দলের লোক ছিলেন না, কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ও বামপন্থি রাজনীতির তিনি ছিলেন দৃঢ় সমর্থক। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সঙ্গেও ঘনিষ্টভাবে যুক্ত হন। গণ আদালতে একজন বিচারক হিসাবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
অধ্যাপক শরীফ ছিলেন একজন যুক্তিনিষ্ঠ, বিজ্ঞানমনস্ক, মানবকল্যাণকামী, শ্রেয়োবাদী ও প্রগতিশীল লেখক। বাংলাদেশের সমাজ, সাহিত্য, রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন ইত্যাদি সম্পর্কে তিনি বিভিন্ন সময়ে যে প্রবন্ধগুলি রচনা করেছেন তার সংকলন গ্রন্থের সংখ্যা চল্লিশোর্ধ্ব। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো : বিচিত চিন্তা (১৯৬৮), সাহিত্য ও সংস্কৃতি চিন্তা (১৯৬৯), স্বদেশ অন্বেষা (১৯৭০), জীবনে সমাজে সাহিত্যে (১৯৭০), প্রত্যয় ও প্রত্যাশা (১৯৭১), যুগ যন্ত্রণা (১৯৭৪), কালের দর্পণে স্বদেশ (১৯৮৫), বাঙালির চিন্তা- চেতনার বিবর্তন ধারা (১৯৮৭), বাঙলার বিপ্লবী পটভূমি (১৯৮৯), বাংলাদেশের সাম্প্রতিক চালচিত্র (১৯৯০), মানবতা ও গণমুক্তি (১৯৯০), বাঙলা, বাঙালি ও বাঙালিত্ব (১৯৯২), প্রগতির বাধা ও পন্থা (১৯৯৪), এ শতকে আমাদের জীবনধারার রূপরেখা (১৯৯৪), স্বদেশ চিন্তা (১৯৯৭), জিজ্ঞাসা ও অন্বেষা (১৯৯৭), বিশ শতকে বাঙালি (১৯৯৮), বিশ্বাসবাদ, বিজ্ঞানবাদ, যুক্তিবাদ, মৌলবাদ (২০০০) ইত্যাদি।
সর্বোপরি ড. আহমদ শরীফ ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক, মানবতাবাদী, সুগভীর বিজ্ঞানমনস্কতা, জ্ঞানÑ-যুক্তি-বুদ্ধি ও মনীষার প্রতি প্রখর অনুরাগী। মানবতার জন্য, বিজ্ঞান চেতনার জন্য, গণমানুষের শোষণ থেকে মুক্তির জন্য, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার আর গোঁড়ামি থেকে মুক্তির জন্য তিনি আমাদের আলোকবর্তিকা। তিনি ছিলেন আপোষহীন ব্যক্তিত্ব। তাই তার মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা অন্তরের গভীর থেকে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালবাসা নিবেদন করি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ড. আহমদ শরীফ সাহস ও প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। জয় হোক বিশ্বমানবতার। জয় হোক ড. আহমদ শরীফের চিন্তা ও চেতনার।

লেখক : এম.ফিল গবেষক