‘করোনার ওষুধ’ কিনতে হুমড়ি

0
790

পরামর্শ ছাড়া কোনোরকম ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকার পরামর্শ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের #

‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরি করে সাধারণ মানুষকে ঠকাচ্ছে অসাধু সিন্ডিকেট #
রুমন ভট্টাচার্য :
করোনা ভাইরাসে বেড়েছে জ্বর, সর্দি, গলাব্যথা, কাশির ওষুধসহ ভিটামিন ও জীবাণুনাশকের চাহিদা। ইতোমধ্যে কয়েকটি করোনা ওষুধের নামও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এসব ওষুধ প্রয়োগের খবর এসেছে গণমাধ্যমেও। সেই থেকে বেড়েছে চাহিদাও। চাহিদাকে পুঁজি করে ওষুধের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে অসাধু সিন্ডিকেট। নগরীর প্রায় সব ফার্মেসিতে ‘নেই আর নেই’। এমনকি পাইকারি মার্কেট হাজারী গলিতেও সংকট। মিললেও দাম দ্বিগুণ, আবার কোথাও তিনগুণ, চারগুণ। অনেক ফার্মেসি পরিচিত ছাড়া বিক্রিই করছেন না কিছু ওষুধ।
রোববার বেলা ১২টায় সরেজমিন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ পূর্ব গেইটের বেশ কয়েকটি ওষুধের দোকানে গিয়ে দেখা যায়, স্যাভলন (বড়) বিক্রি হচ্ছে ৫০০-৫৫০ টাকা, স্যাভলন (মাঝারি) ৩০০ টাকা ছোট ৮০-৯০টাকায় বিক্রয় হচ্ছে।
দাম বাড়তি নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এসিআই লিমিডেট কোম্পানির জোনাল ম্যানেজার মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম সুপ্রভাতকে বলেন, ‘স্যাভলনের দাম বাড়ানো হয়নি। আগের দাম ফ্যামিলি সাইজ ২২০, মাঝারি ১২৫ টাকা ও ছোটটি ৩০ টাকাই রয়েছে। শুনেছি বিভিন্ন দোকানে দ্বিগুণ দামে বিক্রয় করা হচ্ছে।’
বাড়তি দামে ওষুধ বিক্রির কথা স্বীকার করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেডিক্যাল পূর্ব গেইটের একজন ফার্মেসি মালিক জানান, তাদেরও বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। এখন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কিনতে হয়। সরাসারি কেনা যাচ্ছে না। ফলে দাম বেশি। ১৫ টাকার নাপা এক্সটেন্ড এখন প্রতি পাতা-৩০ টাকা, ২০ টাকার সিভিট প্রতিপাতা ৩০-৪০ টাকা। ৪৫-৫০ টাকার স্কাবো-৬ প্রতিপাতা এখন ৪০০-৫০০ টাকা ও ১৫০ টাকার ইভেরা-১২ প্রতিপাতা ৪০০-৫০০ টাকা, ৩৩ টাকার অ্যাজিথ-প্রতিপাতা-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে তিনি জানান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর হাজারী গলিতে এসব ওষুধ ও জীবাণুনাশক বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে।
অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কেমিস্ট ড্রাগিস্ট সমিতির চট্টগ্রাম জেলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক লায়ন আশীষ ভট্টাচার্য বলেন, ‘এমন অভিযোগ সত্য নয়। কারণ বাইরে যারা বিক্রি করছেন তারা ভাসমান দোকান। এদের দৌরাত্ম্য বন্ধের জন্য আমরা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি। ক্রেতাদের কাছে অনুরোধ করব রাস্তা থেকে কোনোরকম কিছু না কেনার। দোকান থেকে কিনে অবশ্যই রশিদ নেবেন। যাতে বেশি দাম কেউ নিলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি।’ বর্তমানে বিভিন্ন কোম্পানির ঠা-াজনিত ওষুধ মার্কেটে সংকট রয়েছে বলে তিনি জানান।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ক্যাব এর চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যখনই করোনার কয়েকটা ওষুধ যেমন-ইভেরা-১২, স্কাভো-৬ ইত্যাদি নাম জানা গেল হঠাৎ করেই সেভলন ও ডেটলের মতো এসব গায়েব হয়ে গেছে। বেশি টাকা দিলে মিলছে, না হলে নাই। আর অধিকাংশ মানুষের এসব ওষুধের দাম সম্বন্ধে ধারণা ছিল না। তার কারণে ব্যবসায়ীরা যেভাবে পারছে সেভাবে নিচ্ছে। এসব বন্ধে ওষুধ প্রশাসনের নজরদারি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কারণ এটা তাদের মূল দায়িত্ব। তারা মাঠে না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ী সাধারণ জনগণের পকেট কেটে নিয়েছে।’
জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর চট্টগ্রাম এর সহকারী পরিচালক হোসাইন মোহাম্মদ ইমরান ওষুধ দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে না জানিয়ে সুপ্রভাতকে বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। কোথায় বিক্রি হচ্ছে? ইভেরা-১২, স্কাভো-৬ এগুলো করোনা সাসপেকটেড ওষুধ নয়। এগুলো কৃমির ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হত। সরকার এখনো এসব ওষুধের বিষয়ে কোনো ঘোষণা করেনি। এসব ওষুধ যদি মার্কেট ডিমান্ড থাকে তাহলে সরকার এমনিতে বানাবে। একটা রিউমার ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ যদি মনে করে চিনি খেয়ে ভালো হবে সেটার কেজি যদি ৫ হাজার টাকা হয়, মানুষ তাও খাবে! কেউ যদি ওষুধ নিয়ে সিন্ডিকেট করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী-পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান সুপ্রভাতকে বলেন, ‘বাড়তি দামে ওষুধ বিক্রির অনেক অভিযোগ এসেছে। স্যাভলন, ডেটল, স্ক্যাভো-৬, ইভেরা-১২ ইত্যাদি নিয়ে অভিযোগ প্রচুর। এছাড়া দোকানে ওষুধ বিক্রি না করে রাস্তা ও ফুটপাতে একজনকে বসিয়ে দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে সেটাও লক্ষ করেছি। দু’একদিনের মধ্যে এসব বন্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
এদিকে, পরামর্শ ও প্রেসক্রিপশন ছাড়া করোনা প্রতিরোধে কোনোরকম ওষুধ সেবন ও কেনা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস সুপ্রভাতকে বলেন, ‘স্কাবো-৬ ও ইভেরা-১২, ডক্সিসাইক্লিন এসব ওষুধ এখন মানুষ বেশি কিনছে। অনেকে কিনে স্টকে রেখেছেন। অনেকে খেয়েছেন। কিন্তু এসব ওষুধের কোনোটিই করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করে এটা শতভাগ এখনো নিশ্চিত নয়। তবে গবেষণা চলছে। স্কাবো-৬ ও ইভেরা-১২ মূলত কৃমিনাশক ওষুধ। ওষুধ নিজের মত কিনে না খেয়ে রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সেবন করলে ভালো। পরবর্তী কোনো সমস্যা হলে সেটি সমাধান করা সহজ হবে।’ ওষুধগুলোর মেজর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বলেও তিনি জানান।