জাহিদ হাসান হৃদয় »
আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বন্দরকে সম্পূর্ণ কাগজবিহীন ও স্মার্ট বন্দরে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এ পথে বহু প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ রয়েছে।
সার্ভার অচল হওয়া, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নতা, কার্ড ও নম্বর শনাক্ত না হওয়া, ছবি না মেলা এবং গেটে দীর্ঘ যানজটের পাশাপাশি কনটেইনার ওঠানামার যন্ত্রপাতি আরটিজির ত্রুটি, রাতে পর্যাপ্ত কারিগরি কর্মী না থাকা এবং টিওএস পরিচালনাকারীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ঘাটতির অভিযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম বন্দর বিষয়ক পরিচালক ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থবিষয়ক কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান পাটোয়ারি বলেন, বন্দরকে স্মার্ট বন্দরে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সার্ভার অচল হওয়া বড় প্রতিবন্ধকতা। পাশাপাশি বিভিন্ন গেটের যানজটের কারণে নির্ধারিত সময়ে পণ্য ওঠানো-নামানো সম্ভব হয় না।
তবে তাঁর মতে, বন্দরকে স্মার্ট বন্দরে রূপান্তর করতে বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তাঁর ভাষ্য, বন্দর ইতোমধ্যে অনেকটা এগিয়েছে এবং কনটেইনার ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ছে।
ডিজিটাল গেট পাস ব্যবস্থার মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে চট্টগ্রাম প্রাইম মুভার ট্রেইলার শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক হাসান মাহমুদ বলেন, অনেক শ্রমিক ও গাড়ির মালিক এখনো নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি অভ্যস্ত নন।
অনেক সময় ইন্টারনেট সংযোগ থাকে না, সার্ভার অচল হয়ে যায়, কার্ডের তথ্য বা নম্বর মেলে না। একই ছবি থাকা সত্ত্বেও কখনো ছবি শনাক্ত করা যায় না। গাড়ি প্রবেশের পর বের হওয়ার সময়ও সমস্যা দেখা দেয়। এসব কারণে গেটে যানজট তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে টিওএস উন্নয়ন কার্যক্রমও ডিজিটাল ব্যবস্থার ঝুঁকি সামনে এনেছে । সাম্প্রতিক দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সিস্টেম বন্ধ রাখার পূর্বনির্ধারিত সময় থাকলেও নির্ধারিত আট ঘণ্টায় কাজ শেষ হয়নি । রাত ২টা পর্যন্ত ব্যবস্থা পুরোপুরি সচল না হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের দাবিতে ম্যানুয়াল কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ভোর ৫টার দিকে ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয় বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায় ।
এ সময় কনটেইনার সরবরাহ, বিল অব এন্ট্রি প্রক্রিয়াকরণসহ শুল্ক ছাড়পত্রের কাজে বিঘ্ন ঘটে এবং পণ্যবাহী গাড়ি ও কনটেইনার বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়ে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সহকারী টার্মিনাল ব্যবস্থাপক (নিয়ন্ত্রণ) মো. ফারুক হাসান চৌধুরী বলেন, বন্দরে বিভিন্ন সময় সিস্টেম আপগ্রেড করা হয় এবং এজন্য সাময়িক অসুবিধার সৃষ্টি হয়। আমরা এই সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্য পরিচালনা করি।
সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ সদস্যদের অভিযোগ, বন্দরে বেশকিছু আরটিজি নষ্ট, একটি আরটিজি নষ্ট হওয়ার পর সেটি সচল করতে অন্য যন্ত্র থেকে যন্ত্রাংশ খুলে ব্যবহার করতে হয়। রাতে পর্যাপ্ত মেরামতকর্মী না থাকায় কোনো যন্ত্রে সমস্যা হলে দ্রুত মেরামত করা সম্ভব হয় না। এতে পণ্যবাহী গাড়িকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
টিওএসসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যবস্থায় দায়িত্ব পালনকারীদের প্রশিক্ষণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবে তথ্য দেওয়ার সময় ভুল হচ্ছে, নতুন প্রক্রিয়া বুঝতে সময় লাগছে এবং কোনো কোনো কাজ পুনরায় করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য একাধিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। আগামী ১ অক্টোবর থেকে কনসাইনি বিল শতভাগ অনলাইনে পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনলাইন ও ম্যানুয়াল-দুই পদ্ধতিতে বিল নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনায় রয়েছে অনলাইন গেট পাস, গেটে প্রবেশ ও বের হওয়ার তথ্য সংরক্ষণ, সময়ভিত্তিক যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, অনলাইন পণ্যবাহী গাড়ির টিকিট এবং জাহাজের ছাড়পত্র। টিওএসের নতুন সংস্করণে পণ্য ওঠানো-নামানোর টিকিট ও কনটেইনার হস্তান্তরের নথির সঙ্গে অনলাইন গেট পাসের সংযোগ করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে সেবা কেন্দ্রে অনলাইন অর্থ পরিশোধের সুবিধা বাড়ানো, ছুটির দিনেও অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা, ৭২ ঘণ্টায় মাশুল পরিশোধ না হলে স্বয়ংক্রিয় বকেয়া আদায়, বিশেষ পণ্য সরবরাহের অনুমোদন, নিলামের পণ্য সরবরাহ এবং খোলা বা খণ্ডিত পণ্য পরিবহন অনলাইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বে টার্মিনালে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ট্রাক রাখার টিকিট ব্যবস্থাও চালুর কাজ চলছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বিভিন্ন সেবায় স্বয়ংক্রিয় ও ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ায় কার্যক্রমে দক্ষতা ও গতি বাড়ছে। এনসিটির কার্যক্রম হস্তান্তরের পর দক্ষতা ১২ থেকে ১৪ শতাংশ বেড়েছে। ‘সিপিএ স্কাই’ ও জাহাজ আসার আগেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মতো ব্যবস্থাও বন্দরের কার্যক্রমে গতি আনছে।
সম্প্রতি চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ডিজিটাল কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। সভায় যানজট কমানো, রাজস্ব আদায় দ্রুত করা এবং ব্যবহারকারীদের হয়রানি কমাতে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান সচিব।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দরের ডিজিটাল রূপান্তর শুরু হয় ২০১১ সালে । এরপর অনলাইন শুল্ক, ডিজিটাল গেট পাস, অনলাইন পেমেন্ট ও একক জানালা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ২০২৬ সালে টিওএসের মাধ্যমে সরবরাহ আদেশ থেকে কনটেইনার ছাড় পর্যন্ত প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে কাগজপত্র ও অপেক্ষার সময় কমার সুযোগ তৈরি হলেও এসব সেবার নিরবচ্ছিন্ন পরিচালনা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

