জাহিদ হাসান হৃদয় »
কাগজবিহীন ও স্মার্ট পোর্টে রূপান্তরের পথে দ্রুত এগোচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। ঠিক এ অবস্থায় সার্ভার ডাউন, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন, কার্ডের তথ্য বা নম্বর না মেলা, ছবি শনাক্ত না হওয়াÑডিজিটাল গেট পাস ব্যবস্থায় এমন নানা সমস্যার অভিযোগ উঠেছে ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে।
এর সঙ্গে বন্দরের বিভিন্ন গেটে তীব্র যানজট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম বন্দর বিষয়ক পরিচালক ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের ফাইন্যান্স ইনচার্জ মো. আব্দুল মান্নান পাটোয়ারি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর ‘স্মার্ট পোর্ট’ হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো সার্ভার ডাউন। সার্ভার ডাউনের কারণে বন্দরের ডিজিটাইজেশনের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে করা সম্ভব হয় না। পাশাপাশি বন্দরের বিভিন্ন গেটের যানজটও বড় সমস্যা। এই যানজটের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে লোড-আনলোডিং সম্ভব হয় না।
তবে বন্দরকে স্মার্ট পোর্টে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আন্তরিকতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, একা কারও পক্ষে বন্দরকে স্মার্ট পোর্ট করা সম্ভব নয়। এ জন্য বন্দরের সব স্টেকহোল্ডার ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আব্দুল মান্নান পাটোয়ারি বলেন, ইতিমধ্যে বন্দর অনেকাংশে এগিয়েছে। এর ফলে কনটেইনার হ্যান্ডেলিং বাড়ছে এবং ওয়েটিং টাইম কমছে। ধীরে ধীরে বন্দর উন্নতির দিকে যাচ্ছে।
তবে ডিজিটাল গেট পাস চালুর অভিজ্ঞতা নিয়ে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন চট্টগ্রাম প্রাইম মুভার ট্রেইলার শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, ডিজিটাল গেট পাস চালুর পর অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা বেড়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক ও গাড়ির মালিক এখনো এ ব্যবস্থায় অভ্যস্ত নন। টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (টস) চালু হলেও অনেকের কাছে আগের গেট পাস রয়ে গেছে বলেও জানান তিনি।
হাসান মাহমুদ বলেন, অনেক সময় ইন্টারনেট সংযোগ থাকে না, সার্ভার ডাউন হয়ে যায়, কার্ড ম্যাচ করে না, নম্বর মেলে না। একই ছবি থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় ছবি ম্যাচ করে না। কখনো কার্ড দিয়ে গাড়ি প্রবেশ করলেও বের হওয়ার সময় সমস্যা হয়। এসব কারণে গেটে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
বন্দরকে সত্যিকার অর্থে ডিজিটাল ও আধুনিক করতে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) মতো প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিত পরিচালনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন হাসান মাহমুদ। পিসিটি সৌদি আরবভিত্তিক অপারেটর রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনালের পরিচালনায় রয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন কার্যক্রম জোরদারের কথা জানিয়েছে।
গতকাল বুধবার বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিবের স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বন্দর ব্যবহারকারীদের সেবা সহজীকরণ, দ্রুত পণ্য খালাস, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বন্দর এলাকার যানজট নিরসনে ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমানে শতভাগ ভেসেল বিল অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে। কনটেইনার ও কনসাইনি বিলও শতভাগ টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের (টস) মাধ্যমে তৈরি ও আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে সোনালী ব্যাংক পিএলসির বুথ স্থাপন ও এপিআই ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে ছুটির দিন ও অফিস সময়ের বাইরেও অনলাইন পেমেন্ট সুবিধা চালুর কাজ চলছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ই-গেট পাস ইস্যু ও গেট ইন-আউট শতভাগ অনলাইনের পাশাপাশি টস-এর মাধ্যমে টাইম স্লট ম্যানেজমেন্ট, অনলাইন কার্ট টিকিট, ই-গেট চালান ও শতভাগ ভেসেল ই-এনওসি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বন্দরের মাশুল পরিশোধ না হলে অটো পুল পেমেন্ট সিস্টেম চালু, টস-এর মাধ্যমে স্পেশাল ডেলিভারি অ্যাসাইনমেন্ট অনুমোদন, এনবিআর/কাস্টমস-এর এপিআই-এর মাধ্যমে অকশন ডেলিভারি এবং ব্রেক বাল্ক অপারেশন অনলাইনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, টস-এর নতুন সংস্করণে ড্রপ টিকিট, পিকআপ টিকিট ও ইআইআর ই-গেট পাসের সঙ্গে ইন্টিগ্রেশন করা হচ্ছে। ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারে রিয়েল-টাইম ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন, বিল জেনারেট ও কনফার্মেশন, আইসিডি ইন্টিগ্রেশন এবং বে টার্মিনালে স্লটভিত্তিক ম্যাপিং করে পেমেন্টভিত্তিক ট্রাক পার্কিং টিকিটিং ব্যবস্থা চালুর কাজও চলছে।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে সময় ও খরচ সাশ্রয়ের পাশাপাশি দ্রুত বকেয়া আদায়সহ বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে আগামী ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরকে সম্পূর্ণ পেপারলেস ও স্মার্ট পোর্টে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বন্দরের বিভিন্ন সেবায় অটোমেশন ও ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর ফলে কার্যক্রমে দক্ষতা ও গতি বাড়ছে। এনসিটির কার্যক্রম হস্তান্তরের পর দক্ষতা ১২ থেকে ১৪ শতাংশ বেড়েছে। ‘সিপিএ স্কাই’ ও প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসের মতো ডিজিটাল ব্যবস্থাও বন্দরের কার্যক্রমে গতি আনতে ভূমিকা রাখছে।
তিনি জানান, সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কনফারেন্স রুমে চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এসব কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়।
সভায় বন্দর সেবাকে আরও ডিজিটাল করার পাশাপাশি যানজট কমানো, রাজস্ব আদায় ত্বরান্বিত করা এবং ব্যবহারকারীদের হয়রানি কমাতে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের ডিজিটাল রূপান্তরের ভিত্তি অবশ্য আরও পুরোনো। ২০১১ সালে কম্পিউটারভিত্তিক কনটেইনার টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা চালুর মাধ্যমে কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের কম্পিউটারায়ন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে অনলাইন কাস্টমস, ডিজিটাল গেট পাস, অনলাইন পেমেন্ট ও টার্মিনাল পরিচালন ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়তে থাকে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আটটি গেটে ডিজিটাল পেমেন্ট ও অনলাইন গেট পাস চালুর সময় বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, আগে গেটে ম্যানুয়ালি টাকা পরিশোধ ও তথ্য লেখার কাজে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগলেও নতুন ব্যবস্থায় তা প্রায় এক থেকে দুই মিনিটে নামিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তখন প্রতিদিন প্রায় ৬ থেকে ৮ হাজার পণ্যবাহী যান বন্দরে প্রবেশের তথ্যও দেওয়া হয়েছিল।
এরপর ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি চালু হয় পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো। এর মাধ্যমে বন্দর, কাস্টমস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবাকে সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ১ জুলাই থেকে উন্নত টস-এর মাধ্যমে আমদানি পণ্যের সরবরাহ আদেশের আবেদন থেকে কনটেইনার গেট দিয়ে বের হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ ডিজিটাল কার্যপ্রবাহের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে একদিকে অনলাইন সেবা, অটোমেশন ও সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার বিস্তার ঘটছে; অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে সার্ভার, ইন্টারনেট, কার্ড শনাক্তকরণ এবং গেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে বন্দরের গেটে ডিজিটাল প্রক্রিয়া যদি প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে আটকে যায়, তাহলে কাগজের অপেক্ষার জায়গায় তৈরি হতে পারে ডিজিটাল অপেক্ষা।
স্মার্ট পোর্টের লক্ষ্য তাই এখন শুধু নতুন সফটওয়্যার চালু করা নয়; সেই সফটওয়্যার নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করানো, সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার তথ্য ও ব্যবস্থাকে সমন্বিত করা এবং গেটের যানজট বাস্তবে কমানোই বড় পরীক্ষা।
এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণ পেপারলেস ও স্মার্ট পোর্টে রূপান্তরের যে লক্ষ্য বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তার সাফল্যের চূড়ান্ত হিসাব হবে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতায়Ñট্রাক কতক্ষণ অপেক্ষা করল, পণ্য খালাসে কত সময় লাগল এবং ডিজিটাল ব্যবস্থায় বাস্তবে কতটা ভোগান্তি কমল।

