নিজস্ব প্রতিবেদক »
চট্টগ্রামকে আধুনিক, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রযুক্তি ও গবেষণার বাস্তব প্রয়োগে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ডা. শাহাদাত হোসেন।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সম্মেলন আইকনেক্ট ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র এসব কথা বলেন।
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, প্রযুক্তি এখন শুধু কম্পিউটার, মোবাইল ফোন কিংবা শিল্পকারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একটি আধুনিক শহরের যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ সাশ্রয়, নাগরিক সেবা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রযুক্তি সরাসরি যুক্ত। তাই চট্টগ্রামের নগর ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, নগরীর দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে যানবাহনের চাপ বিশ্লেষণ করে ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করা হবে। একই সঙ্গে ট্রাফিক আইন অমান্য, অবৈধ পার্কিংসহ বিভিন্ন বিষয় প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হবে।
মেয়র বলেন, একটি স্মার্ট শহর শুধু স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থার নাম নয়। নগরীর প্রতিটি সেবাকে প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এ জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নাগরিক সেবাগুলোকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হচ্ছে। ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপের মাধ্যমে নগরবাসী রাস্তা, জলাবদ্ধতা, মশা, বর্জ্য, সড়কবাতি ও পয়োনিষ্কাশনসহ বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা জানাতে পারছেন। অভিযোগের অগ্রগতিও এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রায় ১৩০ কিলোমিটার সড়কে সৌরবিদ্যুৎচালিত আধুনিক এলইডি সড়কবাতি, ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে বোর্ড ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে আরও নিরাপদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের সড়কে ঝুলন্ত তারের জঞ্জাল সরিয়ে পরিকল্পিত অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে মেয়র বলেন, মাটির নিচ দিয়ে ক্যাবল স্থাপন করা হবে। এতে নগরের সৌন্দর্য বাড়ার পাশাপাশি যোগাযোগ অবকাঠামো আরও পরিকল্পিত ও নিরাপদ হবে।
জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, কোথায় পানি জমছে, কোন এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থায় সমস্যা হচ্ছে, কোথায় বর্জ্য জমছে কিংবা কোথায় পরিবেশ দূষণের মাত্রা বাড়ছে—এসব তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এআইভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ ও অবৈধ পার্কিং শনাক্ত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে শুধু বিদেশি প্রযুক্তি আমদানি করলেই হবে না; নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করতে হবে। চট্টগ্রামের সমস্যাগুলো চট্টগ্রামের তরুণ গবেষক, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদরা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়, সিটি কর্পোরেশন, শিল্পখাত ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে।
প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু ডিগ্রি প্রদানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে বাস্তব সমস্যা সমাধানের গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে মেয়র বলেন, যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য, বায়ুদূষণ, নগর নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো সমস্যাকে গবেষণার বিষয় হিসেবে নিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান বের করতে হবে।
তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু প্রচলিত সমস্যার সমাধান নয়, ভবিষ্যতের সমস্যাগুলো নিয়েও চিন্তা করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, ডেটা সায়েন্স, ইন্টারনেট অব থিংস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও স্মার্ট অবকাঠামোর মতো প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে গবেষণা করতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. নছরুল কদির। বিশেষ অতিথি ছিলেন আইকনেক্ট ২০২৬-এর সাধারণ সভাপতি ও প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের সহযোগী ডিন অধ্যাপক ড. শহীদ মো. আসিফ ইকবাল, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শেখ ফাত্তাহ, অধ্যাপক ড. সেলিয়া শাহনাজ, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শেখ মো. রবিউল ইসলাম, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ ইফতেখার মনির, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সুফিয়া আক্তার এবং আইকনেক্ট ২০২৬-এর আয়োজক সভাপতি ও ইইই বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক টোটন চন্দ্র মল্লিক।
সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. নছরুল কদির বলেন, আইকনেক্ট ২০২৬-এর উদ্দেশ্য শুধু একটি অনুষ্ঠান আয়োজন নয়; গবেষণা, জ্ঞান ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে সমাজ, শিল্প ও দেশের অর্থনীতিতে বাস্তব অবদান রাখা। শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা এবং গবেষণার বাস্তব ও বাণিজ্যিক প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যোগাযোগ প্রযুক্তি ও কম্পিউটার ব্যবস্থা-সহ আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা ও জ্ঞান বিনিময় করা হচ্ছে। দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনে দেশ-বিদেশের গবেষক, শিক্ষাবিদ, শিল্পখাতের প্রতিনিধি ও প্রযুক্তিবিদরা অংশগ্রহণ করছেন।

