জাহিদ হাসান হৃদয় »
চট্টগ্রাম শহরের ওপর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ কমাতে এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে বহুকেন্দ্রিক নগর বা ‘পলিসেন্ট্রিক মডেল’ গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যানের (২০২৫-২০৫০) খসড়ায় নগরের তিনটি এলাকা আগ্রাবাদ, বাকলিয়া ও আনোয়ারাকে ‘অ্যাকশন এরিয়া’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ জেন জ্যাকবস ও ক্ল্যারেন্স পেরির নগর তত্ত্বের আলোকে এই তিন এলাকার নকশা সাজানো হয়েছে। তবে পরিকল্পনায় আধুনিকায়নের পাশাপাশি আনোয়ারায় ব্যাপক কৃষিজমি হ্রাসের মতো অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকির কথাও উঠে এসেছে।
আগ্রাবাদে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের প্রস্তাব
খসড়া মহাপরিকল্পনায় আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা (সিবিডি) ও ডেবারপাড় মিলিয়ে মোট ৬৩৯ একরের বেশি জমিকে উচ্চঘনত্বের নগরকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে এই এলাকার সিংহভাগ ভবনই একতলা, যা বাণিজ্যিক এলাকার ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই এখানে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ বা ভার্টিক্যাল ডেনসিফিকেশনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
নগর তাত্ত্বিক জেন জ্যাকুবসের মতে, একটি এলাকাকে নিরাপদ রাখতে হলে সেখানে ২৪ ঘণ্টা মানুষের উপস্থিতি থাকা প্রয়োজন ।
এই তত্ত্ব অনুসরণ করে আগ্রাবাদের জোন-৭ এলাকায় উচ্চঘনত্বের মিশ্র ভূমি ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে একই ভবনে বা এলাকায় অফিস, বাজার, স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট ও পার্কিংয়ের সুবিধা থাকবে। দিন শেষে অফিস ছুটি হয়ে গেলেও আবাসিক বাসিন্দা বিপণিবিতানগুলোর কারণে এলাকাটি রাতে জনশূন্য হবে না, যা অপরাধপ্রবণতা কমাবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য জোন-৬ এলাকাকে ‘কুলিনারি স্ট্রিপ’ বা খাবারের গলি হিসেবে গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।
ডেবারপাড় লেকফ্রন্টকে বিনোদনমূলক কেন্দ্র হিসেবে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলারের কারণে দৃশ্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে এই এলাকার হাঁটার পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মাস্টারপ্ল্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাকলিয়ায় হাঁটা দূরত্বে নাগরিক সুবিধা
বাকলিয়া ও চর বাকলিয়া এলাকার ৭৩৪ একর জমি নিয়ে প্রণীত পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আবাসনে সমতা ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের ওপর।
এতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ৫০ শতাংশ, মধ্যবিত্তের জন্য ৪০ শতাংশ এবং উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য ১০ শতাংশ আবাসন সংরক্ষিত রাখার প্রস্তাব রয়েছে। ক্ল্যারেন্স পেরির ‘নেইবারহুড ইউনিট’ তত্ত্বের আদলে বাকলিয়াকে ৯টি আবাসিক ব্লকে ভাগ করা হয়েছে।
প্রতিটি ব্লকের কেন্দ্রে থাকবে প্রাথমিক বিদ্যালয়, খেলার মাঠ ও জলাধার। নাগরিক সুবিধাগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন বাসিন্দারা ৪০০ মিটার বা হাঁটা দূরত্বের মধ্যেই দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে পারেন।
অন্যদিকে চর বাকলিয়ার ৪০৬ একর খালি জমিকে চট্টগ্রামের প্রথম প্রাকৃতিক পার্ক ও ইকো- ট্যুরিজম হাব হিসেবে গড়ে
তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেখানে স্কাই ডাইনিং ও ক্যাবল কারের মতো বিনোদন সুবিধা থাকবে।
পুরোনো অপরিকল্পিত এলাকাগুলো উচ্ছেদ না করে ‘ল্যান্ড রিঅ্যাডজাস্টমেন্ট’ পদ্ধতির মাধ্যমে নতুন করে সাজানোর কথা বলা হয়েছে।
আনোয়ারায় ‘ওয়ান সিটি, টু ‘টাউনস’
কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেলের সুফল কাজে লাগাতে আনোয়ারাকে ঘিরে ‘ওয়ান সিটি, টু টাউনস’ ধারণার বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। ৭ হাজার ৩১৫ একর জমির এই অ্যাকশন এরিয়া মূলত শিল্পায়ন ও নতুন নগরায়ণের কেন্দ্র হতে যাচ্ছে।
২০৫০ সাল নাগাদ এই এলাকার জনসংখ্যা ৭ লাখ ছাড়িয়ে যাবে এবং প্রায় ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আবাসিক এলাকার ভেতর দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখতে মূল সংযোগ সড়কগুলো ১৬০ ফুট চওড়া করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই সড়কগুলো শিল্প ও আবাসিক জোনকে পৃথক করবে।
তবে এই উন্নয়নের নেতিবাচক দিকও মাস্টারপ্ল্যানে উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আনোয়ারার বৈরাগ ইউনিয়নে কৃষিজমি ৯৮ শতাংশ কমে যাবে, যা স্থানীয় কৃ ষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট এলাকাকে কেবল শিল্প জোন হিসেবে ‘একক জোনিং’ করা হলে রাতের বেলা সেসব এলাকা জনশূন্য হয়ে অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
নকশাবহির্ভূত নির্মাণে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি
খসড়া মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে সিডিএ এবার কঠোর আইনি পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়েছে। ১৯৫২ সালের বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট এবং ২০১৮ সালের সিডিএ আইন অনুযায়ী, মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বা নকশাবহির্ভূত যেকোনো নির্মাণ ভেঙে ফেলার পাশাপাশি দণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

