ফারুক হোসেন সজীব »
বাংলা কথাসাহিত্যে শহীদুল জহির এক স্বতন্ত্র ও অনন্য নাম। প্রচলিত বাস্তবতার ভেতর থেকেই তিনি নির্মাণ করেছিলেন এমন এক সাহিত্যভুবন, যেখানে মানুষের জীবন, ইতিহাস, রাজনীতি, স্মৃতি, লোকবিশ্বাস ও কল্পনা পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়। তাঁর ভাষা, আখ্যানরীতি ও চরিত্র নির্মাণ বাংলা কথাসাহিত্যে তৈরি করেছে এক আলাদা প্রবণতা। তাই তাঁর সাহিত্যকে শুধু জাদুবাস্তবতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বলা যায়, তিনি নির্মাণ করেছিলেন নিজের এক কথাসাহিত্যিক ভূগোল।
শহীদুল জহিরের জন্ম ১৯৫৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকায়। তাঁর শৈশব ও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে পুরান ঢাকা, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ নানা স্থান জড়িয়ে ছিল। এসব স্থান ও সেখানকার মানুষের জীবন তাঁর সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ১৯৮৫ সালে পারাপার গল্পগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশ। এরপর প্রকাশিত হয় জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা (১৯৮৮), সে রাতে পূর্ণিমা ছিল (১৯৯৫), ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প (১৯৯৯), ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প (২০০৪) এবং মুখের দিকে দেখি (২০০৬)। তাঁর উপন্যাস আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালে, তাঁর মৃত্যুর পর।
জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর প্রথম উপন্যাস এবং বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর স্বাতন্ত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এখানে রাজনীতি কোনো দূরের রাষ্ট্রীয় বিষয় নয়; তা সাধারণ মানুষের জীবন, সম্পর্ক ও অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে। পুরান ঢাকার মানুষের জীবন ও রাজনৈতিক সময়কে কেন্দ্র করে নির্মিত এই উপন্যাসে তিনি ইতিহাসকে দেখেছেন ব্যক্তিমানুষের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। উপন্যাসটির দীর্ঘ, প্রবাহমান বাক্যরীতি তাঁর ভাষাশৈলীরও একটি উল্লেখযোগ্য পরিচয়।
সে রাতে পূর্ণিমা ছিল শহীদুল জহিরের সাহিত্যকর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এখানে বাস্তব ও অবাস্তব, স্মৃতি ও জনশ্রুতি, ইতিহাস ও কল্পনা এক জটিল আখ্যানের মধ্যে মিলিত হয়েছে। মফিজুদ্দিন মিয়ার পরিবারকে ঘিরে সংঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপন্যাসটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায়ের দিকে ইঙ্গিত করে। ফলে ব্যক্তিগত বিপর্যয় এখানে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
মুখের দিকে দেখি এবং আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু-তেও তাঁর স্বতন্ত্র কথনভঙ্গি স্পষ্ট। বিশেষ করে আবু ইব্রাহীমের জীবন ও মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তিনি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের সম্পর্কের নানা স্তর উন্মোচন করেছেন। তাঁর উপন্যাসে বড় ঘটনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সংকট, স্মৃতি ও সম্পর্কের সূক্ষ্ম পরিবর্তন।
ছোটগল্পে শহীদুল জহিরের প্রতিভা আরও ব্যাপকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। পারাপার, ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প এবং ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প তাঁর গল্পসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সংকলন। কাঁটা, ডুমুরখেকো মানুষ, কাঠুরে ও দাঁড়কাক, আগারগাঁও কলোনিতে নয়নতারা ফুল কেন নেই, চতুর্থ মাত্রা এবং আমাদের কুটিরশিল্পের ইতিহাস-এর মতো গল্পে তিনি সাধারণ মানুষের জীবন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক ভীতি ও লোকবিশ্বাসকে অসাধারণ আখ্যানশক্তিতে রূপ দিয়েছেন।
তাঁর সাহিত্যিক অবদানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভাষা ও আখ্যানের নিজস্ব নির্মাণ। দীর্ঘ ও প্রবাহমান বাক্য, কথ্যভাষার ব্যবহার, স্মৃতি ও বয়ানের পুনরাবৃত্তি এবং বাস্তবতার সঙ্গে কল্পনার মিশ্রণ তাঁর গদ্যকে স্বতন্ত্র করেছে। তাঁর চরিত্রেরা অনেক সময় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনের সাধারণ মানুষ; কিন্তু তাঁদের জীবন থেকেই তিনি বৃহত্তর সমাজ, ইতিহাস ও সময়ের ছবি নির্মাণ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যবিষয়ক গবেষণাতেও তাঁর গল্পে শহর ও গ্রামের মধ্যবিত্ত জীবনের চরিত্র এবং জীবনসংকটের গভীর উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে।
শহীদুল জহির ২০০৮ সালের ২৩ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন। মাত্র ৫৪ বছরের জীবনে তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিমাণ বিপুল নয়, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির শিল্পমূল্য ও স্বাতন্ত্র্য তাঁকে বাংলা কথাসাহিত্যে স্থায়ী জায়গা দিয়েছে। তিনি প্রচলিত গল্প বলার পথ অনুসরণ করেননি; বরং নিজের ভাষা, নিজস্ব আখ্যানরীতি ও নিজস্ব জীবনদৃষ্টির মাধ্যমে তৈরি করেছেন একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যভূমি।
এই নিজস্ব ভূগোলেই শহীদুল জহিরের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাঁর রচনায় যে শহর, যে মহল্লা, যে মানুষ, যে ইতিহাস ও যে স্মৃতি ফিরে আসে, তা একই সঙ্গে বাস্তব এবং কল্পনার। তাই তাঁর সাহিত্য পড়া মানে শুধু গল্প পড়া নয়; বরং বাংলাদেশের মানুষ ও সময়কে এক ভিন্ন কথনভঙ্গিতে আবিষ্কার করা। তাঁর এই স্বতন্ত্র সাহিত্যভুবনই তাঁকে সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কথাকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

