নিজাম সিদ্দিকী »
অন্যদিনের মতো শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সকালবেলায় অনেকেই বাসায় অপেক্ষায় ছিলেন মাছওয়ালার (ভ্যানে মাছ বিক্রেতার)। কিন্তু সকাল গড়িয়ে গেলেও তেমন কেউ আর ঘরের দুয়ারে আসেনি। কারো কোনো ডাকাডাকিও কানে বাজে নি ।
পরে জানা গেলো বাজারে মাছের সংকটের কারণে তারা ফেরি করছে না। দু’একজন এলেও তাদের ডালিতে কিছু স্থানীয় ইলিশ এবং ছোট মাছ ছিল।
গত কয়েকদিন ধরে পাড়ায় পাড়ায় রকমারি মাছ ফেরি করে বেড়ান এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আনাগোনা অনেকটাই কমে যেতে শুরু করে। কারণ বাজারে মাছের সংকট আর বাড়তি দামের কারণে তারা মাছ আনতে ভরসা পারছেন না। অত দামে বাসাবাড়িতে কেউ মাছ কিনবে না তাদের কাছ থেকে। তাছাড়া তাদেরও পোষাবে না। তাই কেউ কেউ বেচাবিক্রি বন্ধ রেখেছেন আপাতত।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ কেন্দ্র চট্টগ্রাম। সরকারের নির্বাহী আদেশে সম্প্রতি প্রতি লিটার ডিজেলের দাম একলাফে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণের পর গভীর সাগরে মাছ ধরার ফিশিং ট্রলার বা বোট পরিচালন ব্যয় আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। বাড়তি ব্যয়ের বোঝা টানতে না পেরে চট্টগ্রামের শত শত ফিশিং বোট সাগরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে।
ফলে ঐতিহ্যবাহী চাক্তাই ফিশারিঘাট থেকে শুরু করে নগরের পাহাড়তলী, চকবাজার, রিয়াজউদ্দিন বাজার ও কাজীর দেউড়িতে হঠাৎ দেখা দিয়েছে তীব্র মাছের সংকট। সামুদ্রিক ও দেশি মাছের সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। আর দাম চলে গেছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
ঘাটেই নোঙর করা অর্ধেকের বেশি ট্রলার
সরেজমিনে কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত ফিশারিঘাট ও নতুন ফিশ হারবার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ভরা মৌসুমে যেখানে শত শত বোট ইলিশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছে বোঝাই হয়ে ঘাটে ফেরার কথা, সেখানে সারি সারি ফিশিং ট্রলার অলস বসে আছে।
বোট মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গভীর সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া প্রতিটি বড় ট্রলারের জন্য এক ট্রিপে (১৫ থেকে ২০ দিন) প্রায় ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। প্রতি লিটারে ২০ টাকা বৃদ্ধির ফলে ট্রলার প্রতি কেবল তেলের খরচই বেড়েছে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এর সাথে বরফ, চাল, ডাল ও জেলেদের অগ্রিম মজুরি (দাদন) হিসাব করলে প্রতিটি ট্রিপের খরচ আগের চেয়ে প্রায় ২ লাখ টাকা বেড়ে গেছে। সাগরে গিয়ে পর্যাপ্ত মাছ না মিললে এই বিশাল লোকসান বোট মালিকদের পক্ষে বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে প্রায় ৬০ শতাংশ ট্রলার এখন সাগরে না গিয়ে নদীর পাড়ে নোঙর করে রাখা হয়েছে।
সরবরাহ অর্ধেকে, মাছের বাজারে আগুন
আকস্মিকভাবে সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের পাইকারি ও খুচরা বাজারে মাছের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বাজারে সাগরের কাচকি, পোয়া, লটকা ও কোরালের সরবরাহ যেমন কমেছে, তেমনি ইলিশের বাজারেও হাহাকার দেখা দিয়েছে। ১ কেজি ওজনের সাধারণ ইলিশের দাম এখন ২,২০০ টাকা থেকে ২,৪০০ টাকা ছুঁয়েছে, যা আগে ১,৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত। সাগরের মাছের ঘাটতির কারণে চাষের রুই, কাতলা ও পাঙাশের দামও কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা বেড়ে গেছে, ফলে প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
চট্টগ্রাম বোট মালিক সমিতির সভাপতি নুর হোসাইন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা হওয়ার পর আমাদের ব্যবসা পুরো- পুরি লাটে উঠেছে। সাগরে যাওয়ার খরচ যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় মাছ ধরা পড়ছে না। তেল বেশি দাম দিলে পাওয়া গেলেও ট্রিপের খরচ তুলতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে আমরা এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে। সরকার যদি মৎস্য আহরণকারী নিবন্ধিত বাণিজ্যিক ট্রলারগুলোর জন্য ডিজেলের ওপর বিশেষ ভর্তুকি বা বিশেষ পাসের ব্যবস্থা না করে, তবে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেবে।’
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ট্রলার মালিকরা সাময়িকভাবে সাগরে যাওয়া কমিয়েছেন, যার প্রভাব স্থানীয় বাজারে পড়েছে। তবে সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে আমরা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন এবং জেলা প্রশাসনের সাথে আলোচনা করছি যাতে ফিশারিঘাট সংলগ্ন ডিপো ও পাম্পগুলো থেকে মৎস্য ট্রলারগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল পায়। আশা করছি দ্রুতই এর একটি সুরাহা হবে।
রিয়াজউদ্দিন বাজারে মাছ কিনতে আসা স্কুল শিক্ষক মো. হোসেন জানান, মাছের বাজারে এখন আগুন লেগেছে। সাধারণ মানুষের পাঙাশ- তেলাপিয়া কেনার উপায়ও নেই। ডিজেলের দাম বাড়ার অজুহাতে বাজারে যে কৃত্রিম সিন্ডিকেট তৈরি হচ্ছে, তা ভাঙতে প্রশাসনের কঠোর তদারকি দরকার।

