মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী >>
১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকায় এক হাজার একর জায়গায় প্যারাবন সৃজন করা হয়েছিল। ছনুয়া, গণ্ডামারা, সরল, কাথরিয়া, খানখানাবাদ ও বাহারছড়া ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ এবং উপকূলীয় সড়কের পাশে সৃজিত এসব প্যারাবনের বেশির ভাগেরই এখন অস্তিত্ব নেই। বেড়িবাঁধ-সংলগ্ন চর দখল করে কোথাও লবণ, আবার কোথাও চিংড়ি চাষ করা হয়েছে।
জানা গেছে, ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে বাঁশখালী উপজেলায় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরপর উপকূলের বাসিন্দাদের জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে দেশের এনজিও সংস্থা ‘উবিনীগ’ ও জাপানের ‘ওয়েস্কা’। সংস্থা দুটি শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে সবুজ বেষ্টনীর আওতায় বাইন ও কেওড়াগাছের বন সৃজন করে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন এলাকায় এসব বনের গাছ কেটে চিংড়িঘের নির্মাণ করা হয়েছে।
বাঁশখালীর সমুদ্রসৈকতের গণ্ডামারা, সরল, কদমরসুল, কাথরিয়া ও বাহারছড়া অংশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি ঝাউগাছ ও বাইনবাগান যেন পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। তবে অব্যাহত ভাঙনে একদিকে সমুদ্রসৈকত তার সৌন্দর্য হারাচ্ছে, অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়েছে সৈকতের জীববৈচিত্র্য। নয়নাভিরাম এই সৈকত ঝড় ও ভাঙনের কবলে পড়ে হাজার হাজার ঝাউগাছ হারিয়েছে। ফলে শ্রীহীন হয়ে পড়ছে সমুদ্রসৈকত এলাকা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, যেসব এলাকায় প্যারাবন, বাইনবাগান ও ঝাউবন রয়েছে, সেসব এলাকার বেড়িবাঁধ তুলনামূলক ভালো আছে। সাগরের প্রচণ্ড ঢেউ ও তীব্র ঝড়ের প্রথম আঘাত ওইসব বাগানে পড়ায় বেড়িবাঁধ অনেকটা রক্ষা পায়। অন্যদিকে, যেসব এলাকায় বাগান নেই, সেসব এলাকার বেড়িবাঁধ অনেক আগেই বিলীন হয়ে গেছে।
পরিবেশবাদীদের মতে, ঝাউবাগানের ভেতরে এক ধরনের বেসিনের মতো গর্ত তৈরি হয়, যেখানে পানি জমে থাকে। জমে থাকা এসব পানি ভাঙনকে ত্বরান্বিত করে। তাই ভাঙন রোধে ঝাউবনের পাশাপাশি নারকেলসহ অধিক শেকড়যুক্ত এবং উপকূলীয় এলাকার জন্য উপযোগী গাছ লাগাতে হবে।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকায় বেড়িবাঁধের রক্ষাকবচ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে ঝাউগাছ। কিন্তু সাগরের করাল গ্রাস ও ঝড়ের কবলে পড়ে অধিকাংশ ঝাউগাছ ভেঙে বিলীন হয়ে গেছে। এসব এলাকায় একসময় ঝাউগাছই বেড়িবাঁধকে রক্ষা করেছিল। এখন ঝাউগাছ বিলীন হয়ে যাওয়ায় সাগরের বড় বড় ঢেউ সরাসরি বেড়িবাঁধে আঘাত হানছে। ফলে সহজেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বেড়িবাঁধ।
কদমরসুল গ্রামের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম, আনোয়ার ও শহীদুল আলম জানান, গত দুই বছরে শুধু এসব এলাকায় অন্তত ৩ থেকে ৪ হাজার ঝাউগাছ বিলীন হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে ভাঙন, নিধন ও দখলের কবলেও পড়েছে ঝাউবাগান।
ছনুয়া ইউনিয়নের খুদুকখালী এলাকার বাসিন্দা মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, একসময় খুদুকখালী পুরোনো লঞ্চঘাট এলাকায় দৃষ্টিনন্দন প্যারাবন ছিল। কতিপয় দুষ্কৃতকারী বাইনগাছ কেটে তা সাবাড় করেছে। কোনো কোনো অংশে নদীভাঙনের ফলে প্যারাবন উজাড় হয়ে গেছে। এ ছাড়া প্রতিবছর বর্ষায় ভাঙন আরও বেড়ে যায়।
খানখানাবাদ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় এলাকার শোভাবর্ধনকারী ঝাউবাগানের যথাযথ পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় সাগরপাড়ের প্যারাবন হারিয়ে যাচ্ছে। অবৈধ দখলদারদের শিকারে পরিণত হয়ে প্রতিদিন গাছ নিধন করা হচ্ছে।
বাঁশখালী উপকূলীয় বন কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান রাসেল বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরল, গণ্ডামারা ও রত্নপুর এলাকায় ৬০ একর জায়গায় বনায়ন করা হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কদমরসুলসহ বাঁশখালী সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে ঝড়ের আঘাতে ও প্রচণ্ড ঢেউয়ে ভেঙে পড়া ঝাউগাছগুলো সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গাছগুলো সংগ্রহ করা হবে।

