নিজস্ব প্রতিবেদক >>
বাড়িতে তখন আনন্দের আবহ। নতুন জীবনের পথে পা রাখছেন পরিবারের আদরের মেয়ে। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে হাসিমুখেই প্রিয়জনকে বিদায় জানিয়েছিলেন স্বজনেরা। কেউ হয়তো ভাবেননি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই আনন্দের বাড়িতে নেমে আসবে শোকের ছায়া।
নববধূকে স্বামীর বাড়ি বাঁশখালীর উদ্দেশে বিদায় দিয়ে কক্সবাজারের বাড়িতে ফিরছিলেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু ফেরার পথেই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জ্যেরটেক এলাকায় কাভার্ড ভ্যানের সঙ্গে মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। একে একে নিভে যায় চারটি প্রাণ।
নিহত চারজনের মধ্যে রয়েছেন নববধূ তাম্মিন ফায়েছা ফাহিমের ভাই নিয়াজ মোর্শেদ (২২), বোন মিফতাহ (১৭), বড় মামা ফেরদৌস আলম (৫৫) এবং মাইক্রোবাসচালক মুন্না (৪০)। নিয়াজ ও মিফতাহ ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ফেরদৌস আলম ও চালক মুন্না।
তাঁদের সবার বাড়ি কক্সবাজারের ঈদগাহ এলাকায়।
বিয়ের অনুষ্ঠানের হাসি-আনন্দ তখনও হয়তো পরিবারের সবার মনে তাজা। কিন্তু সেই স্মৃতি নিয়েই কয়েক ঘণ্টা পর স্বজনদের ছুটতে হয়েছে হাসপাতাল ও মরদেহের অপেক্ষায়।
গত শনিবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় ফাহিমের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। বাঁশখালীর কালীপুর এলাকার মো. তৈয়বের ছেলে ফখরুল আবেদীনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। কক্সবাজার থেকে তিনটি মাইক্রোবাসে করে ৩০ থেকে ৪০ জন আত্মীয়স্বজন বিয়েতে অংশ নিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে একে একে গাড়িগুলো কক্সবাজারের উদ্দেশে ফিরতে শুরু করে।
সবার শেষে ফাহিমের পরিবারের নিকটজনেরা যে মাইক্রোবাসে ফিরছিলেন, সেটিতেই ছিলেন তাঁর বাবা মনজুর আলম, মা নিলুফা আক্তার এবং ভাই-বোনসহ পরিবারের সদস্যরা। সেই গাড়িই দুর্ঘটনার শিকার হয়।
দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন কনের বাবা মনজুর আলম। তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়। আহত হয়েছেন কনের মা নিলুফা আক্তারও। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তিনি আশঙ্কামুক্ত।
পরিবারের সদস্যদের জন্য সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তটি যেন এখনো বিশ্বাসের বাইরে। বিয়ের অনুষ্ঠানে যাঁদের সঙ্গে হাসি-আনন্দ ভাগ করে নিয়েছিলেন, তাঁদেরই কয়েক ঘণ্টা পর হারাতে হয়েছে চিরদিনের জন্য।
ফাহিমের মামা ফেরদৌস আলমের ছেলে তারেক মাহমুদ বলেন, ‘অনুষ্ঠান শেষে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজন দুটি মাইক্রোবাসে করে কক্সবাজারের বাড়িতে ফিরছিলেন। ফুফি, ফুফাতো ভাই-বোনসহ বাবা-মাও ছিল গাড়িতে। ভাবতেও পারিনি আনন্দ এভাবে বিষাদে রূপ নেবে। একনিমেষে সব শেষ হয়ে গেল।’
রোববার বেলা দেড়টার দিকে হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা শেষে চারটি অ্যাম্বুলেন্সে করে নিহত চারজনের মরদেহ কক্সবাজারের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত ৮টার দিকে জানাজা শেষে তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এদিকে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূর আহমদ জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাকবলিত কাভার্ড ভ্যান ও মাইক্রোবাসটি জব্দ করে থানার হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

