দেশের বিদ্যুৎ খাতে আবারও তৈরি হয়েছে তীব্র অস্থিরতা। ভারত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ঝাড়খণ্ডের গড্ডাভিত্তিক আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের পাশাপাশি কারিগরি জটিলতায় বন্ধ হয়ে গেছে আরএনপিএলের বিদ্যুৎ উৎপাদনও। সেই সঙ্গে গ্যাসসংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে কয়েকটি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র। একই সময়ে একাধিক প্রধান কেন্দ্র বন্ধ থাকায় হঠাৎ করেই জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়েছে প্রায় ১২০০ মেগাওয়াটের অতিরিক্ত ঘাটতি। ফলে দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ ঘাটতি প্রায় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পেরিয়ে গেছে, যার সরাসরি শিকার হচ্ছেন সাধারণ জনগণ।
লোডশেডিংয়ের এই ভয়াবহ পুনরাবৃত্তি গ্রামীণ ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। শহরাঞ্চলে ঘন ঘন বিদ্যুতের আসা-যাওয়া যেমন গৃহস্থালি কাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, তেমনি গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি ধারণ করেছে চরম আকার। অনেক এলাকায় দিনে ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। চলতি তীব্র গরমের মধ্যে এ ধরনের দীর্ঘ বিদ্যুৎহীনতা জনজীবনকে এক প্রকার স্তব্ধ করে দিয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের শারীরিক কষ্ট সীমানা ছাড়িয়েছে। কেবল বাড়িঘর নয়, বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানার উৎপাদন, যা সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এই পরিস্থিতি নতুন নয়; কিন্তু এর স্থায়ী বা কার্যকর কোনো সমাধান না পাওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক। একটি বা দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হলেই পুরো বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা থমকে যাওয়া আমাদের গ্রিডের কাঠামোগত ভঙ্গুরতাকেই প্রকাশ্যে আনে। আমদানিনির্ভর বিদ্যুৎ ও নির্দিষ্ট কয়েকটি বড় কেন্দ্রের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি কতখানি, এই হঠাৎ সংকট তারই একটি স্পষ্ট স্মারক। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কাগজে-কলমে বৃদ্ধি পেলেও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি পুরো ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে।
বিদ্যুৎ ঘাটতির এই সংকট থেকে উত্তরণে সরকারকে সাময়িক প্রলেপ দেওয়ার চিন্তা ছেড়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট কৌশল হাতে নিতে হবে। কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হওয়া কেন্দ্রগুলো দ্রুত সংস্কার করে পুনরায় চালু করা যেমন জরুরি, তেমনি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। পাশাপাশি একক কোনো কেন্দ্র বা দেশীয় অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার বৈচিত্র্য ও ব্যাকআপ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সাময়িক সংকট কাটিয়ে উঠে জনগণকে একটি নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ ব্যবস্থা দেওয়া সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত জনজীবন দ্রুত ও টেকসই সমাধান জরুরি

