প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ, পাঠ নির্ণয় ও গবেষণার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের একটি দীর্ঘ সময়কে নতুনভাবে চেনার সুযোগ করে দিয়েছিলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বা আর্থিক সহযোগিতা ছাড়াই একক প্রচেষ্টায় প্রায় দুই হাজার পুঁথি উদ্ধার ও পাঠোদ্ধার করে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পুনর্গঠনে তাঁর অবদান অনন্য বলে স্মরণানুষ্ঠানে বক্তারা বলেছেন।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের ৭৩তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে চট্টগ্রাম থিয়েটার ইনস্টিটিউটে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর সাহিত্যসাধনা ও গবেষণাকর্মের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বক্তারা এসব কথা বলেন।
কবি, নাট্যকার ও গবেষক অভীক ওসমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষাবিদ, লেখক ও চট্টগ্রাম আর্ট কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ রীতা দত্ত।
রীতা দত্ত বলেন, “উনিশ শতকের বাঙালির জীবনে অনেক মহাপুরুষ দেখা দিয়েছিলেন। তন্মধ্যে চট্টগ্রামের আকাশে সৌভাগ্য-সূর্য হিসেবে উদিত হয়েছিলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন মহাতপস্বী সাধক ছিলেন।”
তিনি বলেন, প্রাচীন পুঁথি সাহিত্যকে অবলুপ্তির হাত থেকে উদ্ধার করে বাঙালি জাতির অসীম উপকার করেছেন সাহিত্যবিশারদ। মুসলমান শাসনাধীনকালে বাংলাদেশে সুলতানি আমল ও নবাবি শাসনামলের চারশ বছরের রচিত বিশাল সাহিত্যের ভাণ্ডার আবিষ্কার করে বাংলা সাহিত্যের আদি ও অন্তঃযুগের মাঝখানে যে সময়কে এতদিন অন্ধকার যুগ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, সেই সময়ের সংশয় তিরোহিত করে তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মধ্যযুগ প্রতিষ্ঠা করেন।
বাঙালি মুসলমানের অতীত ঐশ্বর্যের সন্ধান দিয়ে তিনি বর্তমানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছেন উল্লেখ করে রীতা দত্ত বলেন, তাঁকে শুধু প্রাচীন ঋষি বললে ভুল হবে। পুঁথির পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ ও পাঠ নির্ণয়ের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পুনর্গঠনে মৌলিক অবদানের পাশাপাশি বাঙালি জাতিসত্তার স্বরূপ নির্ণয় এবং জাতীয় চেতনার উন্মেষেও তিনি পথনির্দেশ করেছেন।
অনুষ্ঠানে আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘আত্মস্মৃতি’ গ্রন্থের উদ্ধৃতি তুলে ধরে বলা হয়, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের ভাষণে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা প্রথমবারের মতো অত্যন্ত জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়েছিল।
শওকত ওসমানের একটি লেখার উদ্ধৃতিতে বলা হয়, ১৯৪৩ সালে পাকিস্তান আন্দোলনের ধাক্কা যখন তুঙ্গে এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রচার চরম পর্যায়ে, তখন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সেই কোলাহলমুখর সময়ের মধ্যে এক শীর্ণকায় বৃদ্ধ যোগাসনে বসে থাকা সাধকের মতো ছিলেন।
পাকিস্তান প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের বর্ণনা দিয়ে শওকত ওসমান লিখেছেন, সাহিত্যবিশারদ তাঁকে বলেছিলেন, “পাকিস্তান ব্যাপারটা কী আমাকে বুঝিয়ে দাও।” কিছু শোনার পর তিনি বলেন, “আমার পুকুরের ওই পাড়ে হিন্দুরা পূজার সময় ঢোল বাজায়, আমি এখানে নিশ্চিন্তে নামাজ পড়ি, আল্লাহকে ডাকি।”
শওকত ওসমানের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলার ঐতিহ্যের অনুসন্ধানী একজন মানুষের কাছে এমন উচ্চারণ হয়তো স্বাভাবিক; কিন্তু সেই সময় শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে তিনি সাহিত্যবিশারদকে সালাম জানিয়েছিলেন এবং বিস্মিত হয়েছিলেন—এমন উদারতার বিশালতা তিনি কোথা থেকে লাভ করেছিলেন।
বক্তারা বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা কিংবা আর্থিক সাহায্য ছাড়াই একক প্রচেষ্টায় প্রায় দুই হাজার পুঁথি উদ্ধার ও পাঠোদ্ধারের এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে ‘সার্বভৌম গবেষক’ ও অনন্য সাহিত্যসাধক বললে তাঁর প্রতি সুবিচার হবে।
লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও সংকলনেও তাঁর বড় অবদান ছিল। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের হারিয়ে যেতে বসা পুঁথি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে তিনি সাহিত্য-ইতিহাসের একটি অনালোচিত অধ্যায় সামনে আনার পাশাপাশি বাঙালির জাতীয় সংস্কৃতি ও জাতিসত্তা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেন। তাঁর চিন্তাধারা বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিক বলে অনুষ্ঠানে উল্লেখ করা হয়।
স্মরণসভায় বক্তব্য দেন প্রবীণ সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দিন চৌধুরী, বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক রাশেদ রউফ, ছড়াশিল্পী ও দৈনিক আজাদীর অ্যাসোসিয়েট এডিটর রাশেদ রউফ, একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষক ও প্রবীণ সাংবাদিক মোহাম্মদ শামসুল হক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক এবিএম আবু নোমান, নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. কুন্তল বড়ুয়া, প্রবীণ সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সঞ্জীব বড়ুয়া, লেখক ও গবেষক অধ্যাপক শিমুল বড়ুয়া এবং লেখক ও শিক্ষক এসএমএকে জাহাঙ্গীর।
প্রখ্যাত বাচিকশিল্পী কংকন দাশের সঞ্চালনা ও সংযোজনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সৈয়দসহ সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সাংবাদিকতার বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন।

