আব্দুল হালীম বাচ্চু »
বাংলার গ্রাম মানেই শুধু সবুজ ধানের ক্ষেত, নদী কিংবা বাঁশঝাড় নয়। এই জনপদের বুকজুড়ে ছড়িয়ে আছে এমন অনেক বিস্ময়কর ভূপ্রকৃতি, যা শহুরে চোখে প্রায় অচেনা। কখনো বিস্তীর্ণ বিল, কখনো জলাভূমি, কখনো দিগন্তজোড়া মাঠ- প্রকৃতি যেন প্রতিদিন নতুন করে নিজের সৌন্দর্যের গল্প লেখে।
তেমনই এক বিস্ময়কর জায়গার সন্ধান পেয়েছিলাম ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট।
সেদিন আমরা কয়েকজন বন্ধু ও ভ্রমণপিপাসু মানুষ বেরিয়েছিলাম বিলচান্দক, কেনাই, দিঘলিয়া, রতনপুর ও পোতাজিয়া গ্রামের মাঝখানে অবস্থিত বিশাল পাথারের উদ্দেশে। আমাদের সঙ্গে ছিলেন আরিফ, মোমিন, চঞ্চল জালাল, বাচ্চু সরদার, আজমত আলী, মিঠুসহ আরও কয়েকজন প্রকৃতিপ্রেমী সঙ্গী। সকাল থেকেই সবার মধ্যে ছিল অন্যরকম উৎসাহ। কোথায় যাচ্ছি, কী দেখব- এসব নিয়ে পথজুড়েই চলছিল গল্প, হাসি আর নানা রকম অনুমান।
বর্ষার দিন। আকাশে মেঘের আনাগোনা, বাতাসে জলাভূমির সোঁদা গন্ধ, আর চারদিকে যত দূর চোখ যায়- পানি আর সবুজের অপূর্ব মিলন।
পাথারের কাছে পৌঁছেই মনে হলো, আমরা যেন কোনো বিশাল প্রাকৃতিক ক্যানভাসের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি।
দূরে কয়েকটি গ্রাম। গ্রামের ঘরবাড়ি, গাছপালা আর মানুষের জীবন যেন এই বিস্তীর্ণ পাথারকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে। বর্ষার পানিতে পাথারের রূপ বদলে গেছে। কোথাও হাঁটুজল, কোথাও একটু গভীর পানি, আবার কোথাও পানির বুক চিরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ ঘাস।
আর সেই ঘাসের মাঝেই আমাদের চোখ আটকে গেল এক অভিনব দৃশ্যে।
ঘোড়া!
একটি নয়, কয়েকটি ঘোড়া ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বিস্তীর্ণ পাথারজুড়ে। কিছু ঘোড়া পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে কচি ঘাস খাচ্ছে। আবার কিছু ঘোড়া জলে ভেজা রাস্তা ধরে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে। বর্ষার পানিতে সেই পথ কাদামাখা ও ভেজা, আর ঘোড়াগুলোর খুরের নিচে পানি ছিটকে পড়ছে চারদিকে।
কোথাও একটি ঘোড়া রাস্তার পাশে জন্মানো ঘাস খাচ্ছে, কোথাও দুটি ঘোড়া পাশাপাশি ভেজা পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। আবার কিছু ঘোড়া পানি আর রাস্তার মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজেদের মতো করে চারপাশ দেখছে।
এই দৃশ্য আমাদের আরও বেশি মুগ্ধ করেছিল।
মোমিন বিস্মিত কণ্ঠে বলল, দেখো, ঘোড়াগুলো শুধু পানিতেই নয়, পুরো পাথারটাই যেন নিজেদের রাজ্য বানিয়ে নিয়েছে!
আরিফ দ্রুত মোবাইল ফোন বের করে ছবি তুলতে শুরু করল। চঞ্চল, জালাল কখনো পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়াগুলোর দিকে, কখনো ভেজা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া ঘোড়াগুলোর দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হচ্ছিল। বাচ্চু সরদার বললেন, এই দৃশ্য শহরে বসে কল্পনাও করা যায় না!
আজমত আলী চারদিকে তাকিয়ে বললেন, প্রকৃতির কাছে এলে বোঝা যায়, পৃথিবী কত বিচিত্র।
মিঠু তখন ভেজা রাস্তা ধরে হেঁটে যাওয়া একটি ঘোড়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ওদের দেখো! মনে হচ্ছে, এই রাস্তার আসল মালিক ওরাই।
কথাটা শুনে আমরা সবাই হেসে উঠলাম।
ঘোড়াকে সাধারণত আমরা শুকনো মাঠে ছুটতে দেখি। কখনো দেখি গাড়ি টানতে, কখনো মেলায় সাজানো অবস্থায়। কিন্তু বর্ষার পানিতে দাঁড়িয়ে ঘাস খাওয়া আর জলে ভেজা পথ ধরে দল বেঁধে চলাফেরা করা ঘোড়ার দৃশ্য আমাদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ নতুন।
হঠাৎ আমাদের দলের মধ্যে কেউ মজা করে বলে উঠল, দেখো, আজ বুঝি নতুন প্রবাদ তৈরি হবে -পাথারের জলে ঘাস খায় ঘোড়া!
কথাটি শুনেই হাসির রোল পড়ে গেল।
ঘোড়াগুলো অবশ্য আমাদের হাসি কিংবা বিস্ময়ের কোনো গুরুত্ব দিল না। তারা নিজেদের মতো করেই ব্যস্ত। একটি ঘোড়া মাথা নিচু করে ঘাস ছিঁড়ছে, তারপর মুখ তুলে চারদিকে তাকাচ্ছে। আরেকটি ভেজা রাস্তা ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। তার খুরের নিচে জমে থাকা পানি ছিটকে উঠছে।
কিছু ঘোড়া আবার পানির মধ্যে শরীর ভিজিয়ে আনন্দে চলাফেরা করছে। দেখে মনে হচ্ছিল, বিস্তীর্ণ এই পাথারই তাদের খেলার মাঠ, খাবারের জায়গা এবং অবাধ বিচরণের পৃথিবী।
আমরা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে সেই দৃশ্য দেখলাম।
প্রকৃতির সৌন্দর্য অনেক সময় শব্দের প্রয়োজন করে না। শুধু তাকিয়ে থাকলেই হয়।
পাথারের বাতাসে তখন এক ধরনের মুক্তির অনুভূতি। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এসে মনে হচ্ছিল, এখানে সময়ের গতিও যেন একটু ধীর। নেই যানবাহনের হর্ন, নেই মানুষের তাড়াহুড়া। আছে শুধু বাতাসের শব্দ, পানির ঢেউ, ভেজা পথের নরম শব্দ আর দূরে কোথাও পাখির ডাক।
আরিফ ও মিঠু ছবি তুলছিল। মোমিন আর চঞ্চল জালাল ঘোড়াগুলোর চলাফেরা নিয়ে নানা রকম মজার মন্তব্য করছিল। বাচ্চু সরদার ও আজমত আলী প্রকৃতির এই বিস্তীর্ণ রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে চারদিকে তাকিয়ে ছিলেন।
সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, প্রকৃতি আসলে সবচেয়ে বড় বিদ্যালয়।
এখানে কোনো পাঠ্যবই নেই, কোনো ঘণ্টা নেই, কোনো শিক্ষক নেই। তবু প্রতিটি প্রাণী, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি জলধারা আমাদের কিছু না কিছু শেখায়।
ঘোড়াগুলোকে দেখে সেদিন আমরা শিখেছিলাম স্বাধীনতার সৌন্দর্য। বিস্তীর্ণ পাথারে তারা নিজেদের প্রয়োজনমতো চলাফেরা করছে। কোথাও পানিতে নেমে ঘাস খাচ্ছে, কোথাও জলে ভেজা পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার খোলা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে।
কিন্তু এই সৌন্দর্যের সঙ্গে একটি দায়িত্বের কথাও মনে পড়েছিল।
এই পাথার শুধু মানুষের সম্পদ নয়। এখানে পাখির অধিকার আছে, মাছের অধিকার আছে, নানা প্রাণীর অধিকার আছে। বর্ষার পানি, সবুজ ঘাস, ভেজা রাস্তা আর খোলা প্রান্তর- সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এক জীবন্ত পরিবেশ।
আমরা যদি জলাভূমি নষ্ট করি, পাথার ভরাট করি কিংবা প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবেশ ধ্বংস করি, তাহলে শুধু একটি সুন্দর জায়গাই হারাব না— – হারাবে অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয় ও খাদ্যের উৎস।
সেদিন ফেরার সময় আলো ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। পাথারের পানিতে সেই আলো পড়ে তৈরি করছিল অন্যরকম এক আবেশ। দূরে কিছু ঘোড়া তখনও পানির মধ্যে ঘাস খাচ্ছিল। আর কয়েকটি ঘোড়া জলে ভেজা রাস্তা ধরে ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছিল দূরের গ্রামের দিকে।
আমরা- আরিফ, মোমিন, চঞ্চল জালাল, বাচ্চু সরদার, আজমত আলী, মিঠুসহ সবাই ফিরে আসছিলাম নিজেদের গন্তব্যে। কিন্তু মনে হচ্ছিল, পাথারের সেই দৃশ্য যেন আমাদের সঙ্গেই ফিরছে।
আজও চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই- বিস্তীর্ণ জলরাশি, সবুজ ঘাস, দূরের গ্রাম, পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়া আর জলে ভেজা রাস্তা ধরে হেঁটে চলা ঘোড়ার দল।
তখন মনে হয়, ভ্রমণ শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়। ভ্রমণ মানে নতুনভাবে দেখা।
যে দৃশ্য প্রতিদিন স্থানীয় মানুষের চোখে স্বাভাবিক, সেটিই হয়তো একজন ভ্রমণকারীর কাছে বিস্ময়। আর সেই বিস্ময়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা প্রকৃতিকে নতুন করে চিনে নেওয়ার আনন্দ।

