নিজস্ব প্রতিবেদক »
চট্টগ্রাম নগরে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা বেসরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে দীর্ঘদিন ধরে সড়কে যানজট লেগে থাকত। তবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) টানা দুই মাসের অভিযান ও নানামুখী উদ্যোগের ফলে সড়ক ও পার্কিং ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে। যানজটও আগের চেয়ে কমে আসছে।
পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের সামনের সড়কে গাড়ি রাখা হতো। এতে দুর্ভোগে পড়তেন ওই সব এলাকা দিয়ে যাতায়াতকারী সাধারণ যাত্রীরা। স্কুলগুলোর শুরু ও ছুটির সময়ে শিক্ষার্থীদের নিতে আসা গাড়িগুলো সড়কে দাঁড়িয়ে থাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হতো।
চলতি বছরের ১২ জুন সিডিএ চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর ২১ জুলাই থেকে তিনি নগরের হাসপাতাল ও বিদ্যালয়গুলোর সামনের যানজট নিরসন এবং পার্কিং সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হন। তাঁর নেতৃত্বে সিডিএর একটি দল নগরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে।
সিডিএর অভিযান ও অনিয়মের চিত্র
সিডিএর পরিচালিত অভিযানে নগরের অন্তত ২০টি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ৪টি স্কুল এবং ২টি সুপারশপ পরিদর্শন করা হয়। এসব অভিযানে ভবনের অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন, আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনে হাসপাতাল ও স্কুল পরিচালনা এবং পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান, ফার্মেসি বা গুদাম তৈরির প্রমাণ পায় সিডিএ।
জিইসি মোড়ের মেট্রোপলিটন, রয়েল, সিএসসিআর ও মেডিকেল সেন্টার হাসপাতালে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছে।
মেট্রোপলিটন হাসপাতালে পার্কিং ব্যবস্থা থাকলেও গাড়ি সেখানে পার্কিং হচ্ছিল না। রয়েল ও মেডিকেল সেন্টারে পার্কিং অপর্যাপ্ত।
সিএসসিআর তাৎক্ষণিক নকশা দেখাতে ব্যর্থ হয়।
ল্যানসেট হাসপাতালে আবাসিক ভবনে কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি পার্কিংয়ের স্থানে ফার্মেসি ও দোকান পাওয়া যায়।
ইবনে সিনা, ডেল্টা ও ডক্টরস হাসপাতালে পার্কিং সুবিধা ও ড্রপিং বে পাওয়া যায়নি। পার্কভিউ হাসপাতালে ড্রপিং বে ২০ ফুটের জায়গায় ১৫ ফুট পাওয়া যায় এবং পার্কিং এলাকায় সিলিন্ডার রাখা ছিল।
একুশে, সার্জিস্কোপ, মেডিকেয়ার ও পিস পার্ক হাসপাতালেও কোনো নির্ধারিত পার্কিং পাওয়া যায়নি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রেসিডেন্সি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, আল-হিদায়াহ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, চট্টগ্রাম গ্রামার স্কুল (চট্টেশ্বরী) এবং চিটাগাং আইডিয়্যাল স্কুলে অভিযান চালানো হয়। এসব প্রতিষ্ঠান আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনে পরিচালিত হচ্ছে এবং অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী পার্কিংয়ের জায়গা রাখা হয়নি।
আল-হিদায়াহ স্কুলে পার্কিংয়ের স্থানে পাঠদান কার্যক্রম ও ফুডকার্ট স্থাপন করা হয়েছিল। অনিয়ম পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করার পাশাপাশি নকশা অনুযায়ী পার্কিং উন্মুক্ত করতে এক থেকে তিন মাস পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয় সিডিএ। সন্তোষজনক অগ্রগতি না হলে নতুন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও জানানো হয়।
সমন্বয় সভা ও বহুমুখী উদ্যোগ
অভিযানের পাশাপাশি যানজট নিরসনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে ফলোআপ ও সমন্বয় সভা করে সিডিএ। ২৬টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় পার্কিং ব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিক গণপরিবহন চালু এবং গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নগরের কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়।
সিডিএর এসব উদ্যোগের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। ন্যাশনাল হাসপাতাল পার্কিংয়ের স্থানে থাকা লন্ড্রি ও অফিস অপসারণ করে জায়গাটি উন্মুক্ত করেছে এবং ধারণক্ষমতা ৪০টিতে উন্নীত করেছে। ম্যাক্স হাসপাতাল ইবাদতখানা সরিয়ে পার্কিং উন্মুক্ত করেছে। মেট্রোপলিটন হাসপাতাল ডিজিটাল বোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। রয়েল হাসপাতাল আশপাশের খালি জায়গা ভাড়া নিয়ে পার্কিংয়ের পরিধি বাড়াচ্ছে।
সিএসসিআর, ডেল্টা ও ডক্টরস হাসপাতাল নতুন স্থানে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যানজট এড়াতে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠদান ভিন্ন সময়ে শুরু ও শেষ করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিজস্ব বাস সার্ভিস চালুর পদক্ষেপ নিয়েছে। সিডিএ চেয়ারম্যান ছুটির দিনেও এসব কার্যক্রমের অগ্রগতি সশরীরে তদারকি করছেন। এছাড়া ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সহায়তাকারী শিক্ষার্থীদের সংগঠন ট্রাফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট গ্রুপের (ট্যাগ) সঙ্গেও মতবিনিময় করে সিডিএ, যেখানে শিক্ষার্থীরা পার্কিং অবমুক্ত করার দাবি জানান।
ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮
ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ অনুযায়ী, নগরে যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল নির্মাণের ক্ষেত্রে ভবনের ব্যবহারযোগ্য আয়তন, শয্যাসংখ্যা বা শিক্ষার্থীর সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট সংখ্যক গাড়ি রাখার জন্য পর্যাপ্ত পার্কিং স্পেস রাখা বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে এসব ভবনে আগত সেবাগ্রহীতা বা শিক্ষার্থীদের নিরাপদে ওঠানামার জন্য মূল সড়কের বাইরে নিজস্ব সীমানার ভেতর নির্ধারিত ‘ড্রপিং বে’ থাকতে হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, গাড়ি থেকে যাত্রী নামানোর সময় মূল সড়কে যেন অন্য যানবাহন চলাচলে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। চট্টগ্রামের অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে এই বিধিমালা উপেক্ষা করে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল।
সিডিএ চেয়ারম্যানের বক্তব্য
নগরের যানজট নিরসন ও ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালগুলোর প্রায় কোনোটিই পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তোলেনি। তারা সিডিএর নকশাবহির্ভূতভাবে এবং পার্কিং ব্যবস্থা না রেখেই বাণিজ্যিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে। আংশিক পার্কিং ব্যবস্থা একটি আইওয়াশ। সেটি করা চলবে না। আমি থামবার পাত্র নই। যতদিন আমি এই চেয়ারে আছি, এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করে যাব। নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘবের প্রশ্নে কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। পরবর্তী পরিদর্শনে যদি হাসপাতালের আকার অনুসারে পার্কিং ব্যবস্থা দৃশ্যমান না হয়, তবে কোনো অজুহাত না শুনে সরাসরি কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

