১১ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন দেশের প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক আমিরুল ইসলাম। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা
জিন্নাহ চৌধুরী »
শিশুসাহিত্য নিয়ে লিখতে বসলে প্রথমেই মনে হয় ছোটদের জন্য লেখা মোটেই ছোট কোনো কাজ নয়। শিশুর মন জয় করতে হলে তার চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখতে হয়; তার কৌতূহল, বিস্ময়, আনন্দ ও কল্পনার সঙ্গে একাত্ম হতে হয়। ছড়া-কবিতার কয়েকটি সহজ শব্দের মধ্যেও তাই কখনো তৈরি হয় এক বিশাল জগৎ।
বাংলা শিশুসাহিত্যে দীর্ঘদিন ধরে সেই জগৎ নির্মাণ করে চলেছেন আমীরুল ইসলাম। ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, জীবনী, জ্ঞানভিত্তিক লেখা- শিশুসাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর বিচরণ। তবে আমার কাছে তাঁর সবচেয়ে আপন পরিচয়- আমীরুল ভাই।
আমাদের সময়ে চট্টগ্রাম কিংবা ফেনীর মতো মফস্বল শহর থেকে ঢাকায় যাওয়া ছিল এক ধরনের অভিযাত্রা। সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুষ্ঠান, ছোটদের আসর কিংবা বইমেলায় গেলেই পরিচিয় হতো নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে। এরমধ্যে কয়েকজন লেখক খুব সহজেই আপন হয়ে উঠেছিলেন- লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম, আলী ইমাম, আসলাম সানি, আনজীর লিটন, আহমদ মাযহার। তাঁদের স্নেহ ও আন্তরিকতায় মফস্বল থেকে আসা আমাদের মতো তরুণদের সংকোচ অনেকটাই কেটে যেত।
তাই আমাদের প্রজন্মের কাছে বইমেলা শুধু বইয়ের মেলা ছিল না; ছিল প্রিয় মানুষদের সঙ্গে দেখা হওয়ারও উৎসব। বইমেলা মানেই যেন- রিটন ভাই, আমীরুল ভাই, আলী ইমাম ভাই।
আমীরুল ইসলামের শিশুসাহিত্যের প্রধান শক্তি তাঁর ছড়া। ছড়া দেখতে ছোট, কিন্তু লেখা কঠিন। শব্দকে সহজ রাখতে হয়, ছন্দকে স্বাভাবিক রাখতে হয়, আবার তার মধ্যে থাকতে হয় কল্পনা ও আনন্দের খেলা।
আমীরুলের ছড়ায় শিশুর চেনা পৃথিবীই নতুন রূপ পায়। পাখি, পশু, প্রকৃতি, স্কুল, পরিবার, খেলাধুলা কিংবা ছোটখাটো দুষ্টুমি- সবকিছুই তাঁর ছড়ায় কল্পনার আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ভাষা সহজ, ছন্দ প্রাণবন্ত; ফলে তাঁর ছড়া শুধু পড়ার নয়, মুখে মুখে বলারও।
‘ছড়া যখন ছবি’, ‘ছড়া যখন হালুম’, ‘মজার পড়া ১০০ ছড়া’ কিংবা বহু খ-ের ‘ছড়া রচনাবলী’ তাঁর দীর্ঘ সৃষ্টিশীলতার পরিচয় বহন করে। কিন্তু বইয়ের সংখ্যা দিয়ে তাঁর গুরুত্ব মাপা যায় না। আসল কথা হলো, তিনি শিশুর কাছে ছড়াকে আনন্দের বিষয় করে তুলেছেন।
সহজ করে লেখা তাঁর একটি বড় কৃতিত্ব। কারণ সহজ লেখা আর সহজে লেখা এক কথা নয়। শিশুর ভাষায় কথা বলার জন্য লেখককে নিজের অনেক জটিলতা আড়াল করতে হয়। আমীরুল সেই কাজটি দক্ষতার সঙ্গে করেছেন।
তিনি শুধু ছড়াকার নন। শিশুকিশোর গল্প, জীবনী ও জ্ঞানভিত্তিক লেখাতেও তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে। ‘কিশোর গল্পসমগ্র’, ‘ছোটদের জানা অজানা’-র মতো বইয়ে গল্প ও জ্ঞানের সঙ্গে শিশুর কৌতূহলকে যুক্ত করার চেষ্টা দেখা যায়।
শিশুকে সরাসরি উপদেশ দেওয়ার বদলে গল্পের মধ্য দিয়ে ভাবতে শেখানো- এটাই শিশুসাহিত্যের শক্তি। আমীরুলের লেখায় সেই স্বাভাবিক শিক্ষণীয়তা আছে; কিন্তু তা কখনো ভারী নীতিকথায় পরিণত হয় না।
বিদেশি ছড়ার সঙ্গেও তিনি বাংলা পাঠকের পরিচয় করিয়েছেন। ‘হে বিদেশি ছড়া’ ও ‘দেশি রঙে বিদেশি ছড়া’-র মতো অনুবাদগ্রন্থের মাধ্যমে শিশুর সাহিত্যিক পৃথিবীকে আরও বিস্তৃত করেছেন। ফলে তাঁর কাজ একদিকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে বিশ্বসাহিত্যের দিকেও জানালা খুলে দেয়।শিশুসাহিত্যে তাঁর দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৬ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন তিনি।আমাদের প্রজন্মের অনেকেই সাহিত্যকে দূরের কোনো জগত মনে করতাম। কিন্তু রিটন ভাই, আমীরুল ভাই, আলী ইমাম ভাইদের মতো মানুষের সান্নিধ্য সেই দূরত্ব কমিয়ে দিয়েছিল।
আজ বইমেলা অনেক বড় হয়েছে। বইয়ের সংখ্যা বেড়েছে, প্রকাশনার ধরন বদলেছে, প্রযুক্তি আমাদের পাঠাভ্যাসও পাল্টে দিয়েছে। তবু আমাদের স্মৃতির বইমেলা অন্যরকম- সেখানে ভিড়ের মধ্যে পরিচিত মুখ খুঁজে পাওয়ার আনন্দ আছে, বই হাতে লেখকের সামনে দাঁড়ানোর উত্তেজনা আছে, আর আছে কিছু মানুষের স্নেহে নিজেকে আপন মনে হওয়ার অনুভূতি। সেই স্মৃতির ভেতর আমীরুল ভাই আছেন।
একজন শিশুসাহিত্যিকের সবচেয়েবড় পুরস্কার হয়তো কোনো পদক নয়- একটি শিশুর মুখে তাঁর ছড়া শুনতে পাওয়া, কোনো কিশোরকে তাঁর বই হাতে দেখতে পাওয়া। সেই অর্থে আমীরুল ইসলামের দীর্ঘ সাহিত্যজীবন নিঃসন্দেহে সার্থক।
তিনি ছোটদের জন্য লিখেছেন, কিন্তু তাঁর লেখার সঙ্গে আমাদের মতো বড় হয়ে যাওয়া মানুষদেরও এক অদৃশ্য সম্পর্ক আছে। তাঁর ছড়া আমাদের ফিরিয়ে নিতে পারে সেই বয়সে, যখন একটি বই ছিল বিস্ময়ের দরজা, একটি ছড়া ছিল আনন্দের খেলা আর একজন লেখকের স্নেহ ছিল বিরাট প্রাপ্তি।তাই আমীরুল ইসলামকে নিয়ে লিখতে বসে শুধু শিশুসাহিত্যিক আমীরুলকে পাই না; খুঁজে পাই আমাদের সময়ের আমীরুল ভাইকেও।
তাঁর লেখা ছোটদের জন্য,তাঁর স্মৃতি আমাদের জন্য।আর তাই আমাদের কাছে তিনি শুধু আমীরুল ইসলাম নন। ছোটদের আমীরুল।

