মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন >> একজন মানুষ যখন হাসপাতালে ফোন করেন, আমরা অনেক সময় সেটিকে খুব সাধারণ একটি বিষয় হিসেবে দেখি। কেউ হয়তো চিকিৎসকের সময় জানতে ফোন করছেন, কেউ অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে, কেউ কোনো পরীক্ষা সম্পর্কে জানতে, আবার কেউ জরুরি অবস্থায় কী করবেন—সেটি জানতে চাইছেন।
কিন্তু আমার কাছে একটি ফোনকল কখনোই শুধু একটি ফোনকল নয়।
কারণ ফোনের ওপাশে একজন মানুষ আছেন। তিনি হয়তো নিজে অসুস্থ, কিংবা পরিবারের কোনো সদস্যকে নিয়ে চিন্তিত। তাঁর মাথায় অনেক প্রশ্ন। তিনি হয়তো জানেন না কোথা থেকে শুরু করবেন।
সেই মুহূর্তে হাসপাতালের সঙ্গে তাঁর প্রথম যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে।
আর সেই প্রথম যোগাযোগই অনেক সময় হাসপাতাল সম্পর্কে তাঁর প্রথম ধারণা তৈরি করে।
হাসপাতালের সঙ্গে মানুষের পরিচয় সবসময় দরজা দিয়ে শুরু হয় না
আগে একজন রোগীর হাসপাতালের সঙ্গে পরিচয় বলতে আমরা বুঝতাম—হাসপাতালে এসে রিসেপশনে কথা বলা, চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করা কিংবা পরিচিত কারও মাধ্যমে তথ্য নেওয়া।
এখন পরিস্থিতি বদলেছে।
মানুষ আগে গুগলে খোঁজেন। হাসপাতালের ওয়েবসাইট দেখেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য পড়েন। কোনো চিকিৎসকের নাম খোঁজেন। তারপর ফোন করেন।
অর্থাৎ হাসপাতালে আসার আগেই হাসপাতালের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ শুরু হয়ে যায়।
এই কারণে একটি হাসপাতালের ব্র্যান্ড শুধু লোগো, বিজ্ঞাপন বা প্রচারণা দিয়ে তৈরি হয় না। ওয়েবসাইটের একটি তথ্য, ফেসবুকের একটি পোস্ট, গুগলে পাওয়া একটি নম্বর, এমনকি ফোনে একজন কর্মীর সঙ্গে কয়েক মিনিটের কথোপকথনও ব্র্যান্ডের অংশ।
আমার কাজের অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের এই ছোট ছোট জায়গাগুলোই শেষ পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠানের বড় পরিচয় তৈরি করে।
ফোনের ওপাশের মানুষটি আসলে কী চান?
স্বাস্থ্যসেবায় এই প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি হয়তো জানতে চাইছেন, “কোন চিকিৎসকের কাছে যাব?”
কিন্তু তাঁর আসল প্রয়োজন হয়তো আরও বড়—তিনি নিশ্চিত হতে চাইছেন যে তিনি সঠিক জায়গায় যাচ্ছেন।
কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করছেন, “অ্যাপয়েন্টমেন্ট কখন পাওয়া যাবে?”
কিন্তু তাঁর ভেতরের প্রশ্ন হতে পারে—“আমার মাকে নিয়ে এত দূর থেকে এসে যদি চিকিৎসা না পাই?”
কেউ হয়তো জানতে চাইছেন, “এই পরীক্ষা এখানে হয় কি না?”
কিন্তু তিনি আসলে জানতে চাইছেন—“আর কোথায় যেতে হবে না তো?”
তাই রোগীর প্রশ্নের শুধু উত্তর দিলেই হয় না। তাঁর পরিস্থিতিটাও বুঝতে হয়।
একজন মানুষকে তথ্য দেওয়া আর একজন উদ্বিগ্ন মানুষকে আশ্বস্ত করে সঠিক তথ্য দেওয়া—দুটো এক বিষয় নয়।
একটি ভুল তথ্যের প্রভাব অনেক দূর যেতে পারে
হাসপাতালে রোগীরা নানা ধরনের তথ্য জানতে ফোন করেন। কোন চিকিৎসক কোন রোগ দেখেন, কখন তাঁর চেম্বার, কীভাবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া যায়, কোন পরীক্ষা কোথায় করা হয়, জরুরি অবস্থায় কোথায় যোগাযোগ করতে হবে—প্রশ্নের শেষ নেই।
এখানে একটি ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য রোগীর জন্য বাড়তি ভোগান্তি তৈরি করতে পারে।
আর স্বাস্থ্যসেবায় সেই ভোগান্তির প্রভাব শুধু একটি ফোনকলেই শেষ হয় না। রোগীর সময় নষ্ট হতে পারে, চিকিৎসা নিতে দেরি হতে পারে, পরিবারের উদ্বেগ বাড়তে পারে।
তাই কল সেন্টার বা ফোনে রোগীকে তথ্য দেওয়ার বিষয়টিকে শুধু প্রশাসনিক কাজ হিসেবে দেখলে হবে না।
এটি রোগীর সেবারই একটি অংশ।
একটি ফোনকলও বলে দেয় মানুষ আসলে কী জানতে চাইছে
ফোনকলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে।
মানুষ কী জানতে চাইছে, সেটি মন দিয়ে শুনলে হাসপাতালও অনেক কিছু শিখতে পারে।
ধরা যাক, প্রতিদিন অনেক মানুষ একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসাসেবা নিয়ে ফোন করছেন। তাহলে বোঝা যায়, এই বিষয়ে মানুষের তথ্যের প্রয়োজন আছে।
আবার যদি একই প্রশ্ন বারবার আসে, তাহলে হয়তো ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যটি আরও সহজভাবে দেওয়া দরকার।
কেউ যদি বারবার জানতে চান কোন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, তাহলে হয়তো কোন বিশেষজ্ঞ কোন রোগের চিকিৎসা করেন—সে বিষয়ে আমাদের তথ্য আরও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
অর্থাৎ ফোন শুধু রোগীর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম নয়।
ফোন আমাদের রোগীর কথা শোনারও একটি জায়গা।
আমার কাছে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা বিপণনে অনেক সময় ভাবি—আমরা মানুষকে কী বলতে চাই।
কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—
মানুষ আমাদের কী জানতে চাইছে?
বড় হাসপাতালের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ
একটি বড় হাসপাতালে অনেকগুলো বিভাগ, বিশেষায়িত চিকিৎসা ও নানা ধরনের সেবা থাকে। রোগীর কাছে এত বিস্তারিত জানা সবসময় সম্ভব নয়।
তিনি হয়তো শুধু জানেন—তাঁর বুকে ব্যথা হচ্ছে।
কেউ জানেন তাঁর কিডনির সমস্যা হয়েছে।
কেউ সন্তানের হৃদযন্ত্র নিয়ে চিন্তিত।
কেউ ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য তথ্য খুঁজছেন।
কেউ আবার জরুরি অবস্থায় দ্রুত কোথায় যাবেন, সেটিই জানেন না।
এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রামে হৃদরোগ, ক্যান্সার, নিউরোসায়েন্স, কিডনি ও ডায়ালাইসিস, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, শিশুদের হৃদরোগসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা রয়েছে। ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবাও রয়েছে।
কিন্তু রোগীর কাছে এতগুলো বিভাগের নাম জানার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—“আমার সমস্যার জন্য আমাকে কোথায় যেতে হবে?”
এই জায়গায় সহজ ও পরিষ্কার যোগাযোগ খুব বড় ভূমিকা রাখে।
প্রযুক্তি বাড়ছে, কিন্তু মানুষের কণ্ঠের প্রয়োজন কমছে না
আজ স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট, স্বয়ংক্রিয় বার্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য বিশ্লেষণ—সবকিছুই রোগীর অভিজ্ঞতাকে আরও সহজ করতে পারে।
আমি প্রযুক্তির বিরোধী নই। বরং প্রযুক্তি যত বেশি কাজে লাগানো যায়, ততই রোগীর জন্য অনেক কাজ সহজ করা সম্ভব।
কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—সব প্রশ্ন প্রযুক্তি দিয়ে সমাধান করা যায় না।
একজন মানুষ যখন বলেন, “আমি বুঝতে পারছি না কী করব”—তখন শুধু একটি স্বয়ংক্রিয় উত্তর সবসময় যথেষ্ট নয়।
কখনো একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন হয়।
কখনো একটু ধৈর্য নিয়ে শোনার প্রয়োজন হয়।
কখনো শুধু এই অনুভূতিটুকু দেওয়ার প্রয়োজন হয় যে—“আপনার কথাটি আমরা গুরুত্ব দিয়ে শুনছি।”
প্রযুক্তি আমাদের কাজ সহজ করতে পারে। কিন্তু মানবিক যোগাযোগের প্রয়োজন শেষ করে দিতে পারে না।
ব্র্যান্ডের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় বাস্তব জীবনে
আমরা একটি হাসপাতালে বলতেই পারি—“আমরা রোগীকেন্দ্রিক।”
কিন্তু রোগী যখন ফোন করেন, তখন সেই কথার বাস্তব পরীক্ষা হয়।
আমরা বলতে পারি—“সহজে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিন।”
কিন্তু সত্যিই কি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া সহজ?
আমরা বলতে পারি—“মানবিক সেবা।”
কিন্তু একজন উদ্বিগ্ন মানুষ ফোন করলে তাঁর সঙ্গে কীভাবে কথা বলা হচ্ছে?
আমরা বলতে পারি—“উন্নত চিকিৎসা।”
কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্যটি কি রোগী সহজে পাচ্ছেন?
এই জায়গাটিই আমার কাছে ব্র্যান্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
আমরা নিজেদের সম্পর্কে কী বলছি, তার চেয়ে মানুষ আমাদের কাছ থেকে কী অনুভব করছে—সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সুনাম তৈরি হয় ছোট ছোট অভিজ্ঞতায়
একটি বড় বিজ্ঞাপন হয়তো অনেক মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
একটি সংবাদ হয়তো হাজারো মানুষ পড়বেন।
কিন্তু একজন রোগী যদি ভালো অভিজ্ঞতা নিয়ে পরিবারের সদস্যকে বলেন, “ওখানে ভালোভাবে কথা বলেছে”—সেই কথাটির প্রভাবও অনেক গভীর।
আবার উল্টো অভিজ্ঞতাও সত্য।
একটি ছোট খারাপ অভিজ্ঞতা মানুষের মনে অনেক বড় ছাপ ফেলতে পারে।
তাই হাসপাতালের সুনাম শুধু জনসংযোগের দায়িত্ব নয়। চিকিৎসক, নার্স, ফ্রন্ট অফিস, কল সেন্টার, ডিজিটাল টিম, পরিচালনা—প্রতিটি মানুষই এই সুনাম তৈরির অংশ।
কারণ রোগী কখনো বলে না, “আমি জনসংযোগ বিভাগের সঙ্গে ভালো অভিজ্ঞতা পেয়েছি।”
তিনি বলেন—
“হাসপাতালে আমার অভিজ্ঞতা ভালো ছিল।”
এই পুরো অভিজ্ঞতাটিই আসলে ব্র্যান্ড।
একটি ফোনকলের মূল্য তাই অনেক বেশি
একটি ফোনকল হয়তো মাত্র দুই-তিন মিনিটের।
কিন্তু সেই কয়েক মিনিটে একজন মানুষ হাসপাতাল সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করে ফেলতে পারেন।
তিনি হয়তো মনে করতে পারেন, “এখানে আমাকে গুরুত্ব দিয়ে কথা বলা হয়েছে।”
অথবা উল্টোটা।
তাই আমি মনে করি, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করার সময় বড় প্রচারণার পাশাপাশি এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় বড় কথায় নয়, ছোট ছোট আচরণে।
একজন রোগীর ফোন ধরা।
তাঁর কথা মন দিয়ে শোনা।
সঠিক তথ্য দেওয়া।
প্রয়োজনে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়া।
এগুলো খুব সাধারণ কাজ মনে হতে পারে।
কিন্তু একজন রোগীর কাছে এগুলোই হয়তো সেই মুহূর্ত, যখন তিনি প্রথমবার অনুভব করেন—
“হ্যাঁ, আমি সঠিক জায়গায় যোগাযোগ করেছি।”
আমার কাছে একটি হাসপাতালের ব্র্যান্ডের সবচেয়ে সুন্দর পরিচয় হয়তো এখানেই।
বিজ্ঞাপনের ভাষায় নয়।
প্রচারণার আড়ম্বরেও নয়।
বরং একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের কয়েক মিনিটের কথোপকথনে।
কারণ কখনো কখনো হাসপাতালের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্র্যান্ড বার্তা কোনো বিজ্ঞাপনে থাকে না—থাকে একটি ফোনকলের ওপাশে।
মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন
হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর
এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম

