হাসনাইন মাবরুর জিমাম »
একটি শহর কতটা বাসযোগ্য, তা পরিমাপে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও আইএসও ৩৭১২ এবং জাতিসংঘের ‘ইউএন-হ্যাবিট্যাট’-এর সুনির্দিষ্ট কিছু সূচক রয়েছে। কিন্তু এই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিপরীতে আমাদের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের অবস্থান কোথায়?
সম্প্রতি প্রণীত ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫-২০৫০)’-এর খসড়া প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক করুণ চিত্র।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে এই প্রতিবেদনের উপাত্ত মেলালে দেখা যায়, বাসযোগ্যতার প্রায় প্রতিটি সূচকেই শহরটি যোজন যোজন পিছিয়ে আছে।
সবুজের হাহাকার
৯৩ শতাংশ ঘাটতি ইউএন-হ্যাবিট্যাট এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি স্বাস্থ্যকর শহরে জনপ্রতি ন্যূনতম ৯ বর্গমিটার উন্মুক্ত সবুজ এলাকা থাকা আবশ্যক। অর্থাৎ, প্রতি এক লাখ নাগরিকের জন্য অন্তত ৯০ হেক্টর পার্ক বা সবুজ স্থান থাকা বাধ্যতামূলক।
কিন্তু মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া প্রতিবেদন বলছে, চট্টগ্রাম শহরে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় ৯৩ শতাংশ উন্মুক্ত স্থান ও পার্কের ঘাটতি রয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় মাত্র ৭ শতাংশ প্রয়োজনীয় উন্মুক্ত স্থান রয়েছে। ৩ হাজার ৪৯৪ একর চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ আছে মাত্র ২৫৪ একর।
পাহাড় ও জলাশয় ভরাটের কারণে শহরের প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেম ধ্বংসের মুখে। ফলে কংক্রিটের এই জঙ্গলে শিশুদের খেলার জায়গা বা বয়স্কদের একটু হাঁটার মতো সবুজ পরিসর এখন রীতিমতো বিলাসবহুল স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
অচল নিষ্কাশন ব্যবস্থা : ১০০ শতাংশের বিপরীতে করুণ চিত্র
আইএসও ৩৭১২০-এর বর্জ্য ওপানি নিষ্কাশন সূচক অনুযায়ী, একটি আদর্শ ও টেকসই শহরের ১০০ শতাংশ নাগরিককে নিরবচ্ছিন্ন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্টর্মওয়াটার ড্রেনেজ (বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন) সুবিধার আওতায় থাকতে হবে।
অথচ চট্টগ্রামের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। মাস্টারপ্ল্যানের তথ্যমতে, গত চার দশকে শহরের ৭০ শতাংশ প্রাকৃ তিক জলাশয় ভরাট করে ফেলা হয়েছে। শহরের ৮.৪২ শতাংশ এলাকা নিয়মিত জলাবদ্ধতার শিকার
হয়।
ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, শহরের ৪২ শতাংশ পানি প্রবাহের ক্ষমতা পলি ও অবৈধ দখলের কারণে হারিয়ে গেছে। রাস্তার পাশের ৯০ শতাংশ ড্রেন জরুরি ভিত্তিতে পরিষ্কার করা প্রয়োজন এবং ৩২
শতাংশ ড্রেন ভাঙা বা অকেজো।
এছাড়া, শহরের মাত্র ৭ শতাংশ পয়োবর্জ্য (ফিক্যাল স্লাজ) ব্যবস্থাপনার আওতায় রয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই তাই শহরের মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
হাঁটার উপযোগিতা : ফুটপাত যেন মরণফাঁদ
আধুনিক নগর পরিকল্পনায় ওয়াকাবিলিটি বা হাঁটার উপযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্লোবাল স্ট্রিট ডিজাইন গাইডলাইন অনুযায়ী, পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য ফুটপাতের ন্যূনতম প্রস্থ হতে হবে ১.৫ মিটার (প্রায় ৫ফুট), আর আদর্শ প্রস্থ ১.৮ থেকে ২.০ মিটার।
মাস্টারপ্ল্যানের ট্রাফিক ও ট্রান্সপোর্টেশন অধ্যায়ে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের ফুটপাতগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বেশিরভাগ ফুটপাত হকারদের দখলে, ভাঙা স্ল্যাব বা নির্মাণসামগ্রী দিয়ে অবরুদ্ধ।
এমনকি মোটরসাইকেল ও গাড়ি পার্কিংয়ের জন্যও ফুটপাত ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে পথচারীদের মূল রাস্তা দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাঁটতে হয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ওহাঁটার উপযোগিন্তু এখানে পুরোপুরি অনুপস্থিত।
বাসস্থান ও ভবিষ্যৎ প্রজেকশন
আরবান বেইসলাইন সার্ভে অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে চট্টগ্রামের জনসংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু এই বিপুল জনসংখ্যার জন্য আবাসন কোথায়?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ (প্রায় ৩ লাখের বেশি) বস্তি বা নিম্ন আয়ের অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বাস করে, যেখানে সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনের তীব্র অভাব রয়েছে।
পরিত্রাণের উপায়
পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের ফলে চট্টগ্রাম আজ যানজট, জলাবদ্ধতা আর দূষণে হাঁসফাঁস করছে। মাস্টারপ্ল্যানের খসড়ায় এই সংকট উত্তরণে বেশ কিছু প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে- ২০৩৫ সালের মধ্যে ১০০০ একর নতুন পার্ক ও খেলার মাঠ তৈরি, ১৪০ কিলোমিটার নতুন ও উন্নত ফুটপাত নির্মাণ, খালগুলোর অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ।
তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, শুধু কাগজে- কলমে মাস্টারপ্ল্যান করলেই হবে না । প্রজেকশন ভ্যালিডেশন্থ বা বাস্তবসম্মত পূর্বাভাসের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলো কেবল তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে তা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারলেই কেবল চট্টগ্রাম ফিরে পাবে তার হারানো বাসযোগ্যতা। নয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই শহর কেবলই একটি কংক্রিটের ভাগাড়ে পরিণত হবে।

