বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হোক দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের দৃষ্টান্ত

ঞ্যোহলা মং

আমাদের দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয় না। যেটুকু আলোচনা হয় তা ছোট পরিসরে কিছু অফিসে চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সাধারণ জনগণের মধ্যে এই নিয়ে চা টেবিলে, মুদির দোকানে, স্টেশনে কিংবা বন্ধুদের মাঝে খুব একটা সিরিয়াস আলোচনা হতে দেখা যায় না। আর যারা পানি ও পয়ঃনিস্কাশন নিয়ে সারা দেশে কাজ করছেন তাদের মধ্যে প্রশিক্ষণ চলাকালিন সময়টুকু অল্পস্বল্প আলোচনা হয় মাত্র।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি ব্যাপক আলোচ্য বিষয় হিসেবে আমরা ভাবতে শিখিনি। অথচ মনুষ্যসৃষ্ট বর্জ্যই আমাদের এই নিরাপদ ধরণীকে দিনকে দিন হুমকির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের অব্যবস্থাপনার কারণে বর্জ্য থেকে বায়ুদূষণ সৃষ্টি করছি। আমাদের চারপাশের পরিবেশকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছি। শহরের বৃষ্টির স্বাভাবিক প্রবাহের গতিরোধ করছি। আমাদের চারপাশের নদনদীকে দূষিত করছি যা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য।
পৃথিবীর অনেক দেশ তার সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উন্নতির শিখরে পৌঁছেছে। তারা তাদের নিজেদের চারপাশ, শহর ও পুরো দেশকে বসবাসের উপযোগী করে রাখতে ইতিমধ্যে জীবনের একটি অপরিহার্য কাজে পরিণত করেছে। আমরাও চাইলেই কিন্তু এই বিশাল জনবহুল দেশকে অতিসহজে একটি সুন্দর পরিবেশ বান্ধব দেশে পরিণত করতে পারি। এখানে পাঠক প্রশ্ন করতেই পারেন, আমি, আপনি পরিবর্তন হয়ে কি হবে, যেখানে বড় বড় কল কারখানাইতো বেশি পরিবেশ দূষণকারী। আমার মতে, কেবল আমরা পরিবর্তন হলেই এই বড় বড় কলকারখানার মালিকগণও পরিবর্তন হতে বাধ্য। বেশ কয়েক বছর আগেও আমরা ধূমপায়ীদের অত্যাচারে গাড়িতে ভ্রমণ করতে পারতাম না যা এখন অতীত। এখন খুব কম লোকই গাড়িতে ধূমপান করছে। আর কাউকে ধূমপান করতে দেখলে বলার সাথে সাথে ফেলে দিচ্ছে কিংবা অন্যান্য যাত্রীরাও কণ্ঠ মিলিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। অনুরূপভাবে আমরাও পারি আমাদের এই দৈনন্দিনের বর্জ্য সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশ এবং পৃথিবীকে একটি বাসযোগ্য পরিবেশ বজায় রেখে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রেখে যেতে। এই জন্য চাই আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন এবং ব্যক্তির মানসিকতার পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের উদ্যোগ চাই।
আমরা জানি, পরিবারই আদিম ও বর্তমান সময় পর্যন্ত একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান। একজন মানুষ পরিবারেই বড় হয় এবং প্রথম শিক্ষা গ্রহণ শুরু করে। সুতরাং পরিবারে যদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চর্চা শেখে, সে সবর্ত্রই এর চর্চা অব্যাহত রাখবে।
আমাদের স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়সব পাঠ্যবইনির্ভর। পাঠ্যবইয়ের বাইরে তারা বের হতে চায় না। কোন রকমে পাঠ্যবইয়ের পাঠটুকু শেষ করে দিতে পারলেই শিক্ষকতা শেষ। আমাদের স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের খুব কমই দেখা যায় জীবনমুখী পরামর্শ কিংবা উপদেশ দিতে। আমাদের শিক্ষকরা উপদেশ দেয়, ভাল করে পড়ালেখা করতে, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে, গাড়িঘোড়া, বিমান চড়তে হবে ইত্যাদি। কিন্তু খুব কম শিক্ষক আমাদের বলে থাকেন, যেখানে সেখানে ময়লা ও আবর্জনা না ফেলতে। তাছাড়া আমাদের স্কুলগুলোতে এই বর্জ্য সমস্যা নিয়ে কোন চর্চাই হয় না। আমাদের এই স্কুলগুলো যদি এই চর্চা শুরু করে আামাদের এই সময়ে এসেও বর্জ্য নিয়ে চিন্তা করতে হতো না। আমাদের শিক্ষকরা নিজেদের স্কুল কলেজকে পরিষ্কার রাখা নিয়ে চিন্তা করেন না। আবার পরিষ্কার রাখা মানে বুঝে থাকি, রাজনীতিমুক্ত রাখা ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শিক্ষা দেয় কাজটি শুধু মেথরদের, ঝাড়দারদের। আমাদের কাজ নয়।
আবার আমাদের হাটবাজার মানেই, দেখেশুনে হাঁটা। কেননা আমাদের পা যেকোন মুহূর্তে কলার খোসায় কিংবা ময়লার স্তূপে পড়তে পারে। ময়লা পানিতে পা ডুবে যেতে পারে। আমাদের বাজারগুলো একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়নি। আমাদের সমাজে বাজার মানে ব্যবসায়ী আর ক্রেতাদের ঠেলাঠেলি। শেখার ক্ষেত্র নয়। আমাদের বাজারে ফুটপাতে চা দোকান থেকে প্রতিদিন প্রচুর বর্জ্য উৎপন্ন হয়। তারা প্রতিদিন দোকান খোলে আর রাতে দোকানের আশপাশে বিশাল ময়লা রেখে চলে যায়। এটি যেন তার কাজ নয়, এটি ঝাড়ুদারদের কাজ।
বাজারে এই ছোটবড় দোকানগুলোতে যদি নিজেদের একটি করে ডাস্টবিন থাকে আমাদের বাজারগুলো এত নোংরা থাকে না। দিন শেষে নির্দিষ্টস্থানে ময়লা ফেলে দেয়া একটি নিয়মিত কাজে পরিণত হয়নি। রাস্তার দুধারে সকল দোকানদার মনে করে রাস্তাই তাদের ডাস্টবিন। দেশের ৯০% দোকানগুলোতে ডাস্টবিন থাকে না এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়। বাজারে মাছ বিক্রেতারা মনে করে মাছ বিক্রি তার কাজ, তার দ্বারা উৎপন্ন বর্জ্য পরিষ্কার করা তার কাজ নয়। তার জন্য রয়েছে আলাদা লোকজন।
আমাদের দেশের বড় বড় শহরের প্রায় সবকটি আবাসিক দালানকোঠার নিচে (বিশেষ করে দালানের পিছন দিকে কিংবা দুটি দালানের মাঝখানের জায়গায়) দেখা যাবে ময়লার স্তূপ হয়ে জমতে জমতে পঁচে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করলেও বাড়ির মালিকদের বিবেকজ্ঞান জাগ্রত হয় না। ঢাকার ন্যায় শহরে একটি দালান থেকে মালিকেরা যেখানে ৩-৪ লক্ষ টাকা অনায়াসে ভাড়া পেলেও পাঁচশত থেকে একহাজার টাকা খরচ করে তার দালানের আশপাশ পরিস্কার করার উদ্যোগ নেয় না। কখন এসে সিটি করপোরেশন পরিষ্কার করবে তার অপেক্ষায় থাকেন। আর দালানের বসবাসকারীরাও সুযোগ পেলেই দালানের উপর থেকে নিচে ময়লা নিক্ষেপ করার সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। নিজেরা এয়ার কন রুম, এয়ার কন গাড়িতে চড়বে কিন্ত দালানের উপর থেকে নিচে ময়লা ফেলতে একটুও সময় নেয় না।
আমরা যারা বিভিন্ন পরিবহণের যাত্রী, যাত্রাপথে যা খাই তা ফেলে দিই রাজপথে। যাত্রাপথে ড্রাইভার ও সুপারভাইজারদের কোনরূপ নির্দেশনা থাকে না ময়লা যেখানে সেখানে না ফেলার। যাত্রাপথে পরিবহন মালিকের পক্ষে যাত্রার শুভকামনা করা হয়। আবার তাদের এয়ারকন গাড়িতে যেন কেউ বমি করে নোংরা করতে না পারে সেদিকে শতভাগ খেয়াল রাখা হয় মাত্র। অন্যান্য বর্জ্য বা ময়লা যেদিকে যাবে যাক। রেলপথের অবস্থা আরো ভয়াবহ।
আমাদের দেশে সিনেমা, টেলিভিশনে কি কখনো দেখেছেন, নায়ক নায়িকারা হাঁটতে হাঁটতে তাদের হাতে থাকা জুসের প্যাকেট বা ক্যান রাস্তার ধারে থাকা ডাস্টবিনে ফেলতে। কিংবা শিশুদের জন্য নির্মিত কোন কার্টুন ছবিতে দেখেছেন শিশুটি ডাস্টবিন ব্যবহার করতে। কিন্ত ইংরেজি অনেক ছবিতে, শিশুদের জন্য নির্মিত অনেক কার্টুনে দেখেছি ডাস্টবিন ব্যবহারের চিত্র দেখাতে। নিজেরাও তা লক্ষ্য করে থাকবেন। তবে আমাদের দেশে চিত্রপরিচালকদের মাঝে এই চিত্রটি দেখানোর বিষয় হয়ে আসেনি এখনও।
আমাদের দেশের শিশুরা যেন পড়ালেখা নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। সপ্তাহে ৬দিনই স্কুলে যেতে হবে। তার সাথে তাদের মা বাবারাও ব্যস্ত থাকেন সন্তানকে মানুষ করাতে। পৃথিবীর অনেক দেশেই দেখেছি ৫দিনের বেশি স্কুল হয় না (যেমন অস্ট্রেলিয়ায়)। ফলে বাকি দুদিন শিশুরা মা-বাবার সাথে সময় কাটাতে পারে। আমরা অন্যান্য অনেক দেশের চেয়ে বেশি শিক্ষা দিই, আমাদের শিশুরা বেশি সময় স্কুলে ব্যয় করে। অনেক স্কুল কলেজ বন্ধের দিনেও কোচিং করায়। আমাদের চাহিদা খাতার নম্বরে, ছাত্রের আচরণের মধ্যে নয়। আমাদের মাঝে সেইস্কুল ভাল যে স্কুলের ছাত্ররা বেশি নম্বর পায়। ছাত্ররা ছাত্রথাকাকালীন যদি কোথাও যান (যেমন শিক্ষা সফর) যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে দেয়। সাথে শিক্ষক আর অভিভাবক থাকলেও এই বিষয়টিকে তারা কোন সমস্যা হিসেবে দেখেন না।
আমাদের দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখুন, এই ছাত্ররাই তাদের ক্যাম্পাসকে নানাভাবে ময়লা করছে। ফলে আমাদের চারপাশ থেকে শেখার সুযোগ খুবই কম। একটি শিশু তার দৈনন্দিন দেখাদেখি থেকে যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়। আমাদের চারপাশ আমাদের আচরণ পরিবর্তে কোন শিক্ষা দেয় না।
অস্ট্রেলিয়াতে দেখেছি সহজে কেউ রাস্তায় ময়লা করে না। গাড়ি থেকে কেউ টিস্যু ফেলে দিয়ে যায় না। বড় বড় গাড়িতে ময়লা করতে পারে এমন খাবার খায় না। প্রত্যেক বাড়ির সামনে দুটি বিভিন্ন রঙের ডাস্টবিন থাকে (একটি রিসাইক্লিং এর জন্য)। সপ্তাহে দুদিন গাড়ি এসে দু ধরনের বর্জ্য নিয়ে যায়। ছেলে থেকে বুড়ো সবাই মানছে। শুনেছি, রাস্তাঘাটে ময়লা করলে নাকি জরিমানা করা হয়। গাড়ি থেকে কেউ ময়লা ফেলতে দেখলে যে কেউ সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগ করতে পারবে যে কোন সময় যে কোন জায়গা থেকে। ক্যানের ন্যায় বর্জ্যগুলো সংগ্রহের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। একটি ব্যবহৃত ক্যান জমা দিলে দশ সেন্ট করে দেয়া হয়। অনেকে এই ধরনের ক্যান জমা দেয়ার লক্ষ্যে সংগ্রহ করে নানান জায়গা থেকে। আমি নেপালেও দেখেছি একটি ভূমিকম্প ও রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল দেশ হলেও রাজধানীর ছোট ছোট ভাঙা রাস্তাঘাটে অপ্রয়োজনে কেউ যেমনি হর্ন বাজায় না তেমনি রাস্তাঘাটে ময়লা ফেলে দেয় না (যেমন থামেল বাজার এলাকা)। দোকানদাররা দোকান বন্ধ করার সময়ে ময়লা পলিথিনে করে নিয়ে ফেলে দিচ্ছে।
কোন মিডিয়া প্রচার করে না দেশে কোন কোন স্কুল কলেজগুলো পরিবেশ সচেতন। পরিবেশ নিয়ে নাগরিক দায়িত্ববোধ উদ্বুদ্ধ হতে পারলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এটি নাগরিক দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে দেশপ্রেমও জাগিয়ে তুলবে। আমাদের দায়িত্ব হবে যেখানে সেখানে ময়লা না ফেলা, পরিবেশ দূষণ না করা, গাড়ি থেকে টিস্যু না ফেলা, শহর বন্দর গ্রামের গলিতে গলিতে থাকা চা দোকানদারদের কর্তৃক সৃষ্ট ময়লা জমা করে নিজেরাই নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা, দালানকোঠা থেকে নিচের দিকে ময়লা নিক্ষেপ না করা, হোক প্রতিটি নৌকা এবং বোটে একটি করে ডাস্টবিন রাখা। এর মাধ্যমে দেশকে বিনিয়োগ ও পরিবেশ বান্ধব করে তোলার চিন্তা (কাপ্তাই লেক যদি পরিষ্কার থাকে সেখানে অনেক লোক দেখতে যাবে, সি বিচ পরিষ্কার থাকলে পর্যটক বাড়বে) করা।
ছবি: লেখকের নিজের (প্রথম ছবি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে তোলা, দ্বিতীয় ছবিটি University of South Australia ক্যাম্পাস থেকে তোলা, ছবিতে একজন বৃদ্ধ ক্যান সংগ্রহ করছে)।
লেখক : উন্নয়ন কর্মী, খাগড়াছড়ি

আপনার মন্তব্য লিখুন