টিয়ার বাড়ি তেঁতুল গাছে

মিলন বনিক
macaw-final_0

শর্মি পাখি ভালোবাসে।
তার অনেক দিনের সখ। একটা টিয়া পুষবে। ময়না, টিয়া, শালিক, চড়ুই আরো কত সব নাম না জানা পাখি। সবগুলোই শর্মির প্রিয়। কিন্তু খুব আফসোস, সে সবগুলো পাখির নাম জানে না। টুনু’দা হরেক রকম পাখির ছবিওয়ালা একটা বইও কিনে দিয়েছে। ওটা দেখে শর্মি পাখি চেনার চেষ্টা করে।
টুনু’দার কাছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক গল্প শুনেছে শর্মি। শীতের সময় অনেক অতিথি পাখি বেড়াতে আসে। দল বেঁধে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার আশে পাশের লেকে কিছুদিন থাকে। সুদূর সাইবেরিয়া থেকেও নাকি পাখিরা বেড়াতে আসে। নাম না জানা অনেক পাখি। টুনু’দাও সবগুলোর নাম জানে না। শর্মি কিছুতেই ভেবে পায় না, এতদূর থেকে আমাদের দেশে পাখিগুলো কীভাবে আসবে?
ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরা আসছে, উড়ছে, খেলছে। ঝুপ করে পানিতে নামছে আবার উড়ে গিয়ে গাছের ডালে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। প্রতিদিন শত শত লোক, ছেলে বুড়ো যাচ্ছে ওদের দেখতে। টুনু’দার কথামতো শর্মি এসব কল্পনায় ভাবতে থাকে। সে তো কখনও বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়নি। তাই দেখেনি।
টুনু’দা শর্মির কাকাতো ভাই। টুনু’দা বলেছে, ক্লাস ফাইভে উঠলে শর্মিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বাবদ্যালয়ে পাখি দেখাতে নিয়ে যাবে। সেই সাথে ভালো রেজাল্ট করলে খাঁচাসহ একটি টিয়া পাখিও কিনে দেবে। শর্মি পাখি পুষতে পারবে। টিয়া ভালো পোষ মানে। কথা বলতে পারে। গান গাইতে পারে। আর দেখতেও সুন্দর। শর্মির ভাগ্য ভালো। বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। এর মধ্যে যতবারই টুনু’দা বাড়ি এসেছে ততবারই মনে করিয়ে দিয়েছে,
আমার টিয়া পাখি কবে কিনে দেবে?
দেবো, দেবো। আগে মন দিয়ে লেখাপড়া কর।
তোমরা বড়রা খালি শর্ত দিয়ে রাখো।
শর্ত কেন হবে?
তা নয়তো কী? এটা করলে ওটা পাবো, না করলে কি পাবো না?
ওরে বাবা! তুই তো অনেক পাকা হয়ে গেছিস।
তাইতো। লেখাপড়া করে ভালো পাশ তো এমনিই করতে পারবো। তার সাথে পাখির কী সম্পর্ক?
ঠিক বলেছিস তো। সরি, আমার ভুল হয়ে গেছে।
সরি বলতে হবে না। আমার টিয়া পাখিও লাগবে না।
রাগ করেছিস?
না।
সত্যি বলছি, ওরকম আর বলবো না। সামনে নববর্ষের ছুটি। নববর্ষে বাড়ি এলে বৈশাখি মেলা থেকে নিশ্চয় কিনে দেবো।
নববর্ষে ছুটিতে ঠিকই বাড়ি আসলো টুনু’দা। শর্মিও খুব খুশি। সারাদিন ঘুরে ঘুরে বৈশাখি মেলা দেখলো। ডিসি হিলে, সিআরবি শিরিষতলায়। কিন্তু কোথাও পাখি দেখতে পেলো না। যতই বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে ততই শর্মির মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। রাগও হচ্ছে খুব। রাগ করলে কী হবে? টুনু’দারও বা দোষ কী? সেও খুঁজছে। একবার বাবার সাথে রথের মেলায় গিয়ে খাঁচাশুদ্ধ পাখি বিক্রেতা দেখেছিলো। ছোট ছোট লোহার পিঞ্জরগুলোকে বাঁশের সাথে বেঁধে সারা মেলা ঘুরে ঘুরে বিক্রি করছিলো। তখর শর্মির পাখি পোষার ইচ্ছা জাগেনি। এখন মনে হচ্ছে সেদিন পাখিটা কিনে ফেললে ভালো হতো। এতদিনে কথা বলতে পারতো। এখন কিনতে না পারার কষ্টটা বেশি লাগছে। টুনু’দা এটা-সেটা, চুড়ি, ফিতা কত কী কিনতে বললো। না কিছুই নেবে না। তার পাখি চাই। অবশেষে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হলো। সেদিন আর টুনু’দার সাথে কথা বলেনি শর্মি।
টুনু’দা শর্মিকে খুব ভালোবাসে। রাতে না খেয়ে শুয়ে পড়েছে শর্মি। টুনু’দা পাশে গিয়ে বসলো। মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, ‘দেখ, আমি তো কিছুদিন আছি। আর ক’দিন পর জব্বারের বলি খেলা। চট্টগ্রামে বেশ জমজমাট মেলা বসে। থাকেও দু’তিনদিন। অনেক জিনিস পাওয়া যায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানান জিনিস নিয়ে বিক্রেতারা আসে। তখন নিশ্চয় পাখিও পাওয়া যাবে। চল এবার ভাত খেয়ে নিই।’
বৈশাখের বারো তারিখে জব্বার মিয়ার বলিখেলা। বলিখেলা উপলক্ষে লালদীঘির পাড় জুড়ে বিশাল মেলা। শর্মি টুনু’দার সাথে নাগরদোলায় চড়ে। কত সুন্দর সুন্দর মাটির তৈরি জিনিসপত্র, হাড়ি পাতিল, আরও কত কী! কোথাও পাখি দেখছে না। টুনু’দা বার বার বলছে, ‘কী নিবি বল’? ভীষণ গরম পড়ছে। ‘আমার কিছুই লাগবে না’ বলে শুধু এটা ওটা দেখে যাচ্ছে। টুনু’দা বুঝতে পারছে, শর্মির খুব রাগ হচ্ছে।
শর্মি টুনু’দার হাত ধরে লালদীঘির পাড় ঘুরে জেলা পরিষদের সামনে চলে যায়। অনেক দূর থেকে বাঁশওয়ালা পিঞ্জিরাগুলো দেখতে পায় শর্মি। লোকটি এদিকেই আসছে। লোকটি যতই কাছে আসছে ততই খাঁচার পাখিগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। খাঁচাগুলোতে একটা দু’টো করে অনেকগুলো পাখি। ময়না, টিয়া, শালিক, চড়ুই। শর্মির বিশ্বাস হচ্ছে না। সবগুলো জীবন্ত পাখি!
লোকটি কাছে আসতেই টুনু’দাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো শর্মি। পাখিগুলো খাঁচার মধ্যে লাফালাফি করছে। উড়তে পারছে না। পাখিগুলো একে অন্যের সাথে পাখা ঝাপটিয়ে কথা বলতে চাইছে। কথা বলতে পারছে না। খাঁচার মধ্যে থেকে কেউ একে অপরের কাছে যেতে পারছে না। টিয়া পাখিগুলো একা একা।
শর্মির খুব কষ্ট হলো। চারিদিকে লোকে লোকারণ্য। পাখিওয়ালাকে ঘিরে ধরেছে অনেকগুলো ছেলেমেয়ে। টুনু’দা একটা টিয়া পাখির খাঁচা হাতে নিয়ে বললো, ‘এইতো তোর টিয়া পাখি। কোনটা নিবি বল’? শর্মির ইচ্ছা করছে সব পাখিগুলো একসাথে কিনে নিতে। তা কী করে সম্ভব? শর্মি টিয়া পাখির খাঁচাগুলোতে হাত বুলিয়ে আদর করতে চাইলো। একটা খাঁচায় হাত বুলাতেই পাখিটা খ্যাঁক খ্যাঁক করে তেড়ে আসলো। শর্মি ভয়ে হাত সরিয়ে নিলো। আর একটা টিয়া বেশ চুপচাপ বসে আছে। শর্মি হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,
ও টিয়া তোর বাড়ি কোথায়?
তেঁ—-তুল গাঁছে—-তেঁ—–তুল গাঁছে।
শর্মি বুঝতে পারলো টিয়াটা সত্যিই কথা বলছে। ঠিক ঠিক জবাব দিয়েছে। কী ষ্পষ্ট জবাব! তেঁতুল গাছে। টিয়াটা পাখা ঝাপটিয়ে শর্মিকে অভিনন্দন জানিয়ে আনন্দ প্রকাশ করলো।
তোমার নাম কী? আবার জিজ্ঞাসা করলো শর্মি।
টিঁ—টুস—-টিঁ—–টুস।
বাহ! বেশ সুন্দর নাম তো।
টিয়াটা এবার খিক্‌ খিক্‌ করে হেসে উঠলো। টুনু’দা জিজ্ঞাসা করলো,
কি রে, এটা তোর পছন্দ হয়েছে?
পাখিওয়ালা সায় দিল।
আফা, আফনে এইডা লইয়া যান। বড় চতুর আর ভদ্র পাখি। পুইষা আরাম পাইবেন। দ্যাখেন না, কেমুন সোন্দর কইরা কথা কয়।
শর্মি খাঁচাসহ টিটুসকে নিয়ে বাড়ি ফিরলো। পরের দিনগুলো শর্মির খুব আনন্দে কাটছে। নাওয়া খাওয়ার সময় নেই। টিটুসের পেছনে লেগে আছে। পারলে যেন একদিনে সব কথা শিখিয়ে দেয়। অনবরত কথা বলতে থাকে টিটুসের সাথে। বাবাকে বলে প্রতিদিন কলা আনিয়ে নিচ্ছে। ধান, চাউল তো ঘরে আছে। টিটুসও খুব খুশি। এত খাবার আগে কোথাও পায়নি। পাখিওয়ালা ছোট্ট একটা বাটিতে সামান্য একটু ধান দিতো শুধু। তাতে টিটুসের ক্ষুধা মিটতো না।
একদিন শর্মি বারান্দায় বসে টিটুসের সাথে কথা বলছিলো। আকাশজুড়ে দেখতে পেলো একঝাঁক সবুজ টিয়া পাখি। তারা সবাই শর্মিদের বাড়ির সামনের বড় তেঁতুল গাছটাতে এসে বসলো। তাদের চিৎকার চেঁচামেচিতে সারা বাড়ি মাতিয়ে তুললো। সবার কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে। একটা দুইটা নয়। শয়ে শয়ে টিয়া পাখি। কচি কচি তেঁতুল পাতাগুলো সব কুচি কুচি করে কেটে ছারখার করে দিচ্ছে। এতো টিয়া পাখি শর্মি একসাথে কখনও দেখেনি।
এতগুলো বন্ধুদের একসাথে পেয়ে টিটুসও আনন্দে ছটফট করছে। কোনোভাবে খাঁচা থেকে বের হতে পারছে না। খুব কষ্ট হচ্ছে টিটুসের। কয়েকটা টিয়া শর্মিদের ঘরের চালে এসে বসেছে। একটা টিয়া যেন চিৎকার করে টিটুসের জন্য সমবেদনা জানিয়ে বলছে,
প্লিজ, আমাদের বন্ধুটিকে ছেড়ে দাও।
কিন্তু ও তো আমারও বন্ধু। আমি কিনে এনেছি।
তুমি জানো না, ওই দুষ্টু পাখিওয়ালা টিটুসকে ওর মায়ের কাছ থেকে চুরি করে নিয়ে এসেছে।
তাই না কি? তোমরা সত্যি বলছো তো?
হ্যাঁ, সত্যি বলছি। আমি ওর মা।
আর ওরা সবাই?
ওরা টিটুসের বন্ধু।
তোমার বাড়ি বুঝি তেঁতুল গাছে?
তুমি কীভাবে জানলে?
টিটুস বলেছে।
ও একদম ঠিক বলেছে। দেখছো না বন্ধুদের জন্য, মায়ের জন্য টিটুসের কী কষ্ট। ও খাঁচা থেকে বের হতে পারছে না।
তাই বুঝি তোমরা দল বেঁধে ছাড়িয়ে নিতো এসেছো।
আমাদের সেই সাধ্য নেই। জানি তুমি খুব ভালো মেয়ে। আর খুব দয়ালু। তাই আমরা সবাই তোমাকে অনুরোধ করছি। তোমার তো কোনো দোষ নেই। তুমি টিটুসকে ভালোমতো খেতে দিয়েছো, আদর যত্ন করে বড় করেছো। এজন্য তোমার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
শর্মি একমুহূর্ত কী যেন ভাবলো। তারপর আস্তে করে খাঁচার দরজাটা খুলে দিলো। কী আশ্চার্য! খাঁচার দরজা খোলা পেয়েও টিটুস কিন্তু বের হলো না। খুশিতে বার কয়েক পাখা ঝাপটা মেরে খাঁচার ভিতর কয়েকটা পাক দিলো। তারপর খাঁচা থেকে বের হয়ে শর্মির কাঁধে বসলো। ওদিকে অন্য বন্ধুরা সবাই আনন্দে শর্মিকে ধন্যবাদ দিচ্ছে।
টিটুসটা যেতে চাচ্ছে না। একবার উড়ে গিয়ে আবার শর্মির হাতে কাঁধে এসে বসলো। শর্মি বললো,
যাও, তোমার মা আর বন্ধুরা এসেছে তোমাকে নিতে। তুমি ভালো থেকো। তোমার জন্য আমার খুব খারাপ লাগবে।
টিটুসও বলে উঠলো-
খাঁ—রাপ—-লাঁগ—বে, খাঁ—রাপ—-লাঁগ—বে।
তারপর ফুড়ুৎ করে উড়ে গিয়ে বন্ধুদের সাথে মিশে গেলো। শর্মি টিটুসকে আর আলাদা করে খুঁজে পেলো না। মুক্তির আনন্দে টিটুস পাখা মেলে উড়ছে তো উড়ছেই…।

আপনার মন্তব্য লিখুন