লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

অর্থায়নে অনিশ্চয়তা

ভূঁইয়া নজরুল

লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দর অর্থায়ন করার কথা থাকলেও তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। একদিকে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত নির্দেশনা বাস্তবায়নে ফ্লাইওভার বাস্তবায়নকারী সংস’া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের তৎপরতা, অপরদিকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের অনীহা। দুইয়ে মিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিত্তিপ্রস্তর স’াপন করা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
অনিশ্চয়তার সূত্রপাত হয় গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সমন্বয় সভায়। সেই সভায় উপসি’ত একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দরের অর্থায়নের বিষয়টি উঠে আসে। এ সময় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে বলা হয়, আগামী ২০২০ সালের মধ্যে তাদের নিজেদের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ২৮ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। তহবিলে রয়েছে মাত্র ৮ হাজার কোটি টাকা। বাকি টাকা ঋণ হিসেবে সংগ্রহ করতে হবে।
এ বিষয়ে কথা হয় বৈঠকে উপসি’ত বন্দরের মুখপাত্র ও সদস্য ( প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলমের সাথে। তিনি বলেন, ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের অর্থায়ন নিয়ে আমাদের কাছে টাকা চাওয়া হয়েছিল। সভায় আমাদের আর্থিক প্রতিবেদন উপস’াপন করেছি। আমাদের নিজেদেরই অর্থের ঘাটতি রয়েছে। তখন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আমাদেরকে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রাক্কলিত ২৮ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজনীয়তার বিস্তারিত আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছেন। আমরা তা জমা দেব।’
অপরদিকে এই ফ্লাইওভারের অর্থায়নের বিকল্প উৎস প্রসঙ্গে বলেছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘দুটি চীনা কোম্পানির সাথে এর অর্থায়ন নিয়ে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।’ তবে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হলেও তেমন অগ্রগতি নেই।
এ বিষয়ে গতকাল কথা হয় গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর কেন টাকা দেবে? বন্দরের নিজস্ব উন্নয়নের জন্য তাদের নিজেদের টাকার প্রয়োজন।’
তাহলে যে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন- পাল্টা প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিলেও বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে। আমাদের ফান্ড রয়েছে, আমরা নিজেরা ফান্ডের ব্যবস’া করবো।’
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের অর্থায়ন বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, ‘আমার কাছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাই মুখ্য। আর সে অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ টাকা দেয়ার কথা। এখন যদি বন্দর দিতে না পারে তাহলে কে দেবে বা কিভাবে অর্থায়ন হবে তা প্রধানমন্ত্রী ঠিক করে দেবেন। কারণ এই প্রকল্প সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তদারক করছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা হবে।’
তবে অপর এক সূত্রে জানা যায়, মন্ত্রীকে অগোচরে রেখে গত ৩০ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম লালখান বাজার থেকে বিমান বন্দর পর্যন্ত ৩ হাজার ২১৮ কোটি টাকার ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স’াপনের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন। ভিত্তিপ্রস্তর স’াপন করার পর এই প্রকল্পের ডিপিপি ( বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাবনা) পাঠানো হয় মন্ত্রণালয়ে। ইতিমধ্যে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের রিপোর্ট গত ১১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মিলনায়তনে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, স’ানীয় সংসদ সদস্য ডা. আফসারুল আমিনসহ বিভিন্ন সংস’ার প্রতিনিধিদের উপসি’তিতে উপস’াপন করা হয়। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের সামনেও তা উপস’াপন করা হয়।
সিডিএ কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত নির্মিত ফ্লাইওভারটি লালখান বাজারে এসে থামবে না। তা সরাসরি বিমান বন্দরের দিকে চলে যাবে। সেক্ষেত্রে ওয়াসা মোড় থেকে একটি লুপ হবে আলমাস সিনেমা হলের দিকে। লালখান বাজার মোড়ে স্টেডিয়ামের দিকে যাওয়ার জন্য একটি র্যাম থাকবে। এছাড়া উঠা-নামার সুযোগের জন্য টাইগারপাস মোড়, বাদামতলী মোড়, বারিকবিল্ডিং মোড়, নিমতলা পোর্ট কানেকটিং রোড মোড়, কাস্টমস মোড়, ইপিজেড মোড়, স্টিল মিল ও কাঠগড় মোড়ে উঠা-নামার জন্য উভয় দিকে চারটি করে র্যাম থাকবে।
কি সেই নির্দেশনা :
২০১৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময়ে কিছু নির্দেশনা দেন। ২৭ নম্বর নির্দেশনায় বলা হয়েছে লালখান বাজার থেকে বিমান বন্দর পর্যন্ত সম্প্রসারণ হতে যাওয়া ফ্লাইওভারের ব্যয়ভার বহন করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এই নির্দেশনার ভিত্তিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ ফাহিমুল ইসলাম অফিস আদেশ জারি করেন। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্ত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় লালখান বাজার থেকে বিমান বন্দর পর্যন্ত ফ্লাইওভারটি সম্প্রসারণে বাস্তবায়নকারী সংস’ার দায়িত্ব দেওয়া হয় সিডিএকে এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের নিয়মিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত না করে এই ফ্লাইওভারে অর্থ বরাদ্দ করবে বলে উল্লেখ করা হয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন