চট্টগ্রাম বন্দর: ভাবনায় খোলা পণ্য

0
244

আধুনিক বন্দরের ভেতর থেকে পণ্য ডেলিভারি দেয়া হয় না: বন্দর ব্যবহারকারী#
বাফা বন্দরের বাইরে শেড নির্মাণ করতে পারে: বন্দর কর্তৃপক্ষ#
গাড়ি রাখার মতো আমাদেরকেও শেড বা জায়গা বরাদ্দ দিতে পারে বন্দর: বাফা#

ভূঁইয়া নজরুল:
ইয়ার্ডের ভেতরে খোলা পণ্য রাখার শেড ও কনটেইনার খেকে পণ্য বের করে খালাস করা আধুনিক বন্দরের পরিচয় বহন করে না। এসব পণ্য রাখার জন্য বন্দরের বাইরে শেড নির্মাণের সময় এসেছে। আর বন্দরের ভেতর থেকে যতো দ্রুত এসব কাজ বাইরে নিয়ে যাওয়া যাবে ততোই গতিশীল হবে চট্টগ্রাম বন্দর। বুধবার বন্দরের একটি শেডে অগ্নিকা-ের পর এমনই অভিমত বন্দর ব্যবহারকারী ও বন্দর সংশ্লিষ্টদের।
বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, একসময় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সব ধরনের পণ্য ডেলিভারি হতো। জাহাজ থেকে নামার পর বন্দরের ইয়ার্ডে জমা হতো। কিন্তু এই বন্দর দিয়ে আমদানি রপ্তানি বাড়তে থাকায় প্রায় ২০ বছর আগে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠে অফডক। এখন প্রায় ১৯টি অফডকে শতভাগ রপ্তানিপণ্যের কনটেইনার এবং আমদানিকৃত কনটেইনার অফডকে যাচ্ছে। এতে বন্দরে গতি এসেছে এবং কমে এসেছে কনটেইনার জট। কিন্তু এলসিএল (যে কনটেইনারে একাধিক আমদানিকারকের পণ্য থাকে) কনটেইনারে আসা পণ্য বন্দরের ইয়ার্ড থেকে ডেলিভারি হয় এবং জাহাজ থেকে নামানোর পর পণ্যগুলো বিভিন্ন শেডে রাখা হয়। বন্দরের ভেতরে এমন ১৪টি শেড রয়েছে। তবে এলসিএল কনটেইনারের পণ্য ছাড়াও বাল্ক পণ্য (খোলা অবস্থায় যেসব পণ্য আসে। যেমন- স্ক্র্যাপ, কাপড়ের রোল, মেশিনারিজ প্রভৃতি) রাখার জন্য কিছু শেড রাখার প্রয়োজন।
আধুনিক বন্দরের জন্য এধরনের শেড থাকা এবং খোলা পণ্য ইয়ার্ডের ভেতর থেকে ডেলিভারি দেয়ার নজির নেই জানিয়ে অন্যতম শিপিং লাইন এমএসসির সিনিয়র ম্যানেজার আজমীর হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘পণ্য ডেলিভারি হবে বন্দরের বাহির থেকে। এজন্য প্রয়োজনে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অধীনে ওয়্যার হাউজ নির্মিত হবে। সেখান থেকে পণ্যগুলো ডেলিভারি হবে। যেমনিভাবে অফডকগুলো কাজ করছে, সেগুলোও একইভাবে কাজ করবে। আর তা বাস্তবায়ন করা গেলে পণ্য চুরি হওয়ার যে অভিযোগ উঠে এরও নিরসন হবে।’
একই মত পোষণ করে বন্দর ব্যবহারকারীদের অন্যতম স্টেক হোল্ডার বিজিএমইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি এম এ ছালাম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে যখন এই শেডগুলো নির্মিত হয় তখন হয়তো এর প্রয়োজন ছিল। এখনো অনেক ক্ষুদ্র আমদানিকারক কম পরিমাণে পণ্য আমদানি করেন। তাই অনেক আমদানিকারকের পণ্য মিলে একটি কনটেইনারে রাখা হয়। সেসব পণ্যগুলো এখন ইয়ার্ডের মধ্যে ডেলিভারি হচ্ছে। আর একক কনটেইনারগুলো বন্দরের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তবে সময় এসেছে এসব খোলা পণ্যগুলো বন্দরের বাইরে নিয়ে গিয়ে ডেলিভারি দেয়ার জন্য। এক্ষেত্রে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের এগিয়ে আসতে হবে। তারা এগিয়ে এলে বন্দরের কার্যক্রমে আরো গতি আসতো।
এদিকে গত মঙ্গলবার বন্দরের একটি শেডে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। অনেক বছরের পুরনো দ্রব্যের মধ্যে আগুন লাগে। এবিষয়ে বন্দরের পক্ষ থেকে সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলমকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এবিষয়ে জাফর আলম বলেন, ‘বন্দরের বাইরে এসব পণ্য ডেলিভারি দেয়ার সুযোগ তৈরি না হওয়ায় এখনো তা বন্দরের ভেতরে রয়েছে। তবে ফ্রেইট ফরোয়ার্ডাররা এক্ষেত্রে এগিয়ে এসে অফডকের মতো ওয়্যারহাউজ নির্মাণ করতে পারে।
তিনি আরো বলেন, তদন্ত কমিটির রিপোর্টে সবগুলো শেডের প্রয়োজন রয়েছে কিনা তা যাচাই করে দেখা হবে এবং তা বাহিরে নেয়া যায় কিনা তা বিবেচনায় আনা হবে। একইসাথে বে টার্মিনালে একটি শেড নির্মাণের কাজও চলমান রয়েছে। যেখান থেকে এসব পণ্য ডেলিভারি দেয়া হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরে কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের কাজ করে সাইফ পাওয়ারটেক। এবিষয়ে সাইফ পাওয়ার টেকের প্রধান নির্বাহি ক্যাপ্টেন তানভির বলেন, ‘যদি ইয়ার্ডের ভেতরে শেড না থাকতো আরো প্রায় ২০ হাজার একক কনটেইনার বেশি রাখার স্পেস পাওয়া যেতো। একইসাথে কনটেইনার হ্যান্ডেলিং কার্যক্রমে আরো গতি আসতো।’
কীভাবে গতি আসতো জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্পেস বেশি থাকলে একস্থান থেকে অন্য স্থানে কনটেইনার নিয়ে যেতে সহজ হতো। এতে মুভমেন্ট অনেক সহজ হয়।
বাফার বক্তব্য
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার এসোসিয়েশনের (বাফা) পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘আধুনিক বন্দরের ভেতরে পণ্য খালাস হতে পারে না। এজন্য নির্ধারিত ওয়্যারহাউজ থেকে পণ্য খালাস হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদেরকে এমন সুযোগ দেয়া হয়নি।’
তিনি আরো বলেন, ‘গাড়ি আমদানিকারকদের জন্য বন্দরের বাহিরে যেভাবে শেড নির্মাণ করা হয়েছে গাড়ির রাখার জন্য। ঠিক তেমনভিাবে এলসিএল কনটেইনারের পণ্য রাখার জন্য যদি এমন শেড নির্মাণ বা জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয় তাহলে আমদানিকারকরা যেমন দ্রুত সেবা পাবে তেমনিভাবে বন্দরের কাজেও গতি আসবে।’
বাফার এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম বলেন, ‘ফ্রেইট ফরোয়ার্ডাররা নিজ উদ্যোগে সরকার থেকে জায়গা বরাদ্দ নিয়ে বা জায়গা কিনে এমন শেড নির্মাণ করবে। বন্দর তো তা করে দিতে পারে না।’
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের ৯২ শতাংশ পণ্য আদান প্রদান হয়ে থাকে। বন্দরের ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা রয়েছে ৪৯ হাজার একক কনটেইনার রাখার। কিন্তু ইয়ার্ডের ভেতরে যদি শেডগুলো না থাকতো এবং ভেতর থেকে পণ্য ডেলিভারি না হতো তাহলে বন্দরের কার্যক্রমে আরো গতি আসতো।