করোনার অ্যান্টিবডি ক্ষণস্থায়ী

0
119

সুপ্রভাত ডেস্ক :

কভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা লোকেরা কয়েক মাসের মধ্যেই এ রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারেন। নতুন একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, ভাইরাসটি সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতো বছরের পর বছর মানুষকে সংক্রামিত করে চলতে পারে।

এই ফলাফল ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। এছাড়া এটি নভেল করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে ‘হার্ড ইমিউনিটি’র (গোষ্ঠী প্রতিরোধ ক্ষমতা) ধারণাকেও অকার্যকর প্রমাণ করলো।

এই ধরনের প্রথম একটি ছোট পরিসরের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা গাই’স অ্যান্ড সেন্ট থমাস এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের শতাধিক রোগী ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। বিশ্লেষণে তারা ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণগুলো শুরুর প্রায় তিন সপ্তাহ পরে ভাইরাসটিকে ধ্বংস করতে পারে এমন মাত্রায় অ্যান্টিবডি খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু  সেগুলো আবার দ্রুত হ্রাস পেয়েছে বা উধাও হয়ে গেছে।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের রক্ত পরীক্ষায় দেখা গেছে, ভাইরাসের সর্বোচ্চ মাত্রার সংক্রমণের বিপরীতে ৬০ শতাংশ মানুষের শরীরে ‘শক্তিশালী’ অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল এবং তিন মাস পর তাদের মধ্যে মাত্র ১৭ শতাংশের মধ্যে সমান কার্যকর অ্যান্টিবডি বিদ্যমান ছিল। ওই সময়ে অ্যান্টিবডির পরিমান প্রথম অবস্থার ২৩ গুণ নিচে নেমে গেছে। কিছু ক্ষেত্রে এতোই কমে গেছে বা দুর্বল হয়ে পড়েছে যে অ্যান্টিবডি শনাক্ত করারই অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনের প্রধান লেখক কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক ডা. কেটি ডোরস বলেছেন, মানুষের শরীরে ভাইরাসের বিরুদ্ধে পরিমিত অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে এবং এটি অল্প সময়ের মধ্যে অচল হয়ে পড়ছে। আপনার আক্রান্তের মাত্রার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় যে অ্যান্টিবডিগুলো কত দিন স্থায়ী হবে।

গবেষণাটিতে একটি ভ্যাকসিনের বিকাশ এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীতে হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গবেষকরা বলছেন, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থার একাধিক উপায় রয়েছে। তবে অ্যান্টিবডিকেই যদি প্রতিরক্ষার মূল হাতিয়ার ধরা হয়, তাহলে কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে মানুষ একাধিকবার সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলত, ভ্যাকসিনও তাদের বেশি দিন রক্ষা করতে পারবে না বলেই ধরে নেয়া যায়!

ডোরস বলেন, ভাইরাসের সংক্রমণ আপনাকে সর্বোত্তম অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়া দেয়। তাই আপনার সংক্রমণটি যদি আপনাকে এমন মাত্রার অ্যান্টিবডি দেয়, যা দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ক্ষয়ে যায়, তবে ভ্যাকসিনও একই আচরণ করতে পারে। ফলে সুরক্ষিত থাকতে অ্যান্টিবডিকে মাঝে মধ্যে উসকে দেয়া বা উত্তেজিত করার প্রয়োজন হতে পারে।

এর আগে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক ফলাফলগুলো প্রমাণ করেছে যে, ভাইরাসে সংক্রমিত মানুষের তুলনায় ভ্যাকসিনটি বানরের শরীরে কম মাত্রায় অ্যান্টিবডি তৈরি করে। ভ্যাকসিনটি প্রাণীদের মারাত্মক সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তারা এখনও সংক্রমিত হচ্ছে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক রবিন শাটক বলেন, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলো ভালোভাবে চললে তার দলের তৈরি একটি প্রতিযোগিতামূলক ভ্যাকসিন আগামী বছরের প্রথমার্ধে পাওয়া যাবে। কোনো সন্দেহ নেই যে, সবগুলো ভ্যাকসিনই কাজ করবে। তবে সংক্রমণ প্রতিরোধে কোন স্তরের প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রয়োজন তা এখনো পরিষ্কার নয়।

কিংস কলেজের গবেষণাটিতে গবেষকরা কভিড-১৯ ভাইরাসের লক্ষণ প্রকাশের পর তিন মাস ধরে রোগী ও হাসপাতালের কর্মীদের মধ্যে অ্যান্টিবডি স্তর পর্যবেক্ষণ করেছে। ভাইরাসটিতে সংক্রমিত হওয়া ৬৫ জন রোগী, ৬ জন হাসপাতাল কর্মী এবং মার্চ থেকে জুনের মধ্যে নিয়মিত অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা ৩১ জন স্বেচ্ছাসেবীর পরীক্ষার ফলগুলো নেয়া হয়েছিল।

গবেষণাটি একটি জার্নালে জমা দেয়া হলেও এখনো পিয়ার-রিভিউ করা হয়নি। সেখানে দেখা গেছে, গুরুতর আক্রান্ত রোগীর মধ্যে অ্যান্টিবডির মাত্রা বেশি বেড়েছে এবং সেগুলো দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়। এটার কারণ হতে পারে, তীব্র সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অ্যান্টিবডিও বেশি তৈরি হয়।

গবেষণা প্রতিবেদনটির সহ-লেখক অধ্যাপক স্টুয়ার্ট নিল বলেন, এই করোনাভাইরাস সম্পর্কে আমরা একটি বিষয় জানি যে, একজন একাধিকবার সংক্রমিত হতে পারে। এর মানে হলো, শরীরে যে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়, তা বেশিদিন স্থায়ী হয় না।

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক জোনাথন হিনি বলেন, এই গবেষণাটি প্রমাণ করেছে যে, কভিড-১৯ এর প্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্ষণস্থায়ী। সবচেয়ে বড় কথা এটা হার্ড ইমিউনিটি ধারণার কফিনে আরো একটি পেরেক গেঁথে দিল।

অধ্যাপক রবিন শাটক বলেন, তবে আমরা ধারণা করছি, কোনো ব্যক্তির দ্বিতীয় সংক্রমণ কম তীব্র হবে। কারণ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রথম সংক্রমণের স্মৃতি ধরে রাখবে এবং ভাইরাসটির বিরুদ্ধে তারা আরো দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবে। গবেষণাটির এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, প্রাকৃতিক সংক্রমণের চেয়ে ভ্যাকসিনের প্রতিক্রিয়ায় তৈরি অ্যান্টিবডির মাত্রা আরো বেশি হতে হবে।