ঘরেই করোনামুক্ত ৭৮ শতাংশ রোগী

0
199
3D illustration of Coronavirus, virus which causes SARS and MERS, Middle East Respiratory Syndrome

সালাহ উদ্দিন সায়েম :
চট্টগ্রামে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) শনাক্তের সংখ্যা বাড়লেও অর্ধেক রোগী সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগ রোগী হাসপাতালে যাচ্ছেন না। ঘরোয়া চিকিৎসায় তারা সুস্থ হয়ে উঠছেন।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২২ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরী ও ১৪টি উপজেলায় নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ২৩ হাজার ৩২১ জনের। এর মধ্যে পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে ৬ হাজার ৬৯৯ জন। যা গড় হার ২৮.৭২ অর্থাৎ প্রায় ২৯ শতাংশ। আক্রান্তের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৩ হাজার ২৯৯ জন। সুস্থতার হার ৪৯.২৪ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৫০ শতাংশ। এর মধ্যে গত ৮০ দিনে হোম আইসোলেশনে (বাসায় আলাদাভাবে থাকা) ঘরোয়া চিকিৎসা করে ৭৮ শতাংশ রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন। বাকি ২২ শতাংশ সুস্থ হয়েছেন হাসপাতালে। উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে করোনার প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ৩ এপ্রিল।
চট্টগ্রামে সংক্রমণের তৃতীয় মাসে এসে নমুনা পরীক্ষার তুলনায় সংক্রমণের হার দাঁড়িয়েছে ২৯ শতাংশে। আক্রান্তের পরিসংখ্যানে ঢাকার পরই এখন চট্টগ্রামের অবস্থান। ইতোমধ্যে করোনা সংক্রমণে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় চট্টগ্রাম নগরীর ১০টি ওয়ার্ড ও ৯ উপজেলাকে ‘রেড জোন’ ঘোষণা করেছে সরকার।
পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ার সাথে বাড়ছে শনাক্তের সংখ্যাও
চট্টগ্রামে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ার সাথে শনাক্তের সংখ্যাও বেড়ে গেছে। জুন মাসে ল্যাবের সংখ্যা দুটি বাড়ানোর পর প্রতিদিন গড়ে ৯০০-১০০০ নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে। গত ২২ দিন ধরে গড়ে ১৫০ জন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এপ্রিল মাসে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয় ৭২ জনের। তখন কেবল ফৌজদারহাট বিআইটিআইডিতে নমুনা পরীক্ষা হতো। একমাস পর খুলশী ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ও কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজে নমুনা পরীক্ষা শুরু হলে শনাক্তের হার ৩৫ গুণ ছাড়িয়ে যায়। মে মাসে শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ৯১০ জনে। এই মাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ইমপেরিয়াল হাসপাতালে নমুনা পরীক্ষা শুরু হয়। ২২ জুন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৪৮২ জনে। কিন্তু এর অর্ধেক ৩ হাজার ৭১৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে গত ২২ দিনে।
দুটি কারণে চট্টগ্রামে করোনার সংক্রমণ বেড়ে চলেছে বলে মনে করছেন চট্টগ্রাম বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মোস্তফা খালেদ। সুপ্রভাতকে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক জোন হওয়ায় বিশেষ করে পোশাক কারখানা, বন্দর ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে এখানে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বেশি। দ্বিতীয় কারণ হলো, চট্টগ্রামের মানুষ স্বাস্থ্য বিধিও মানছেন না। আমরা দেখছি, ২০ শতাংশ মানুষ মাস্ক ব্যবহার করছেন না। ৩০ শতাংশ মানুষ মাস্ক ব্যবহার করে মুখের নিচে। সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে করোনাভাইরাসের বিস্তার তো ঘটবেই।’
জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি সুপ্রভাতকে বলেন, ‘ঢাকা সিটিতে জনসংখ্যার বিপরীতে আক্রান্তের যে চিত্র, চট্টগ্রামেও একই চিত্র। চট্টগ্রামে জনসংখ্যা বেশি, তাই সংক্রমণের হারও বেশি। স্বস্তির বিষয় হলো, চট্টগ্রামে আক্রান্তের অর্ধেকই সুস্থ হয়ে গেছেন।’
ঘরোয়া চিকিৎসায় কীভাবে করোনামুক্ত হচ্ছেন রোগীরা?
চট্টগ্রামে পজিটিভ শনাক্ত হওয়া ৬ হাজার ৪৮০ জন রোগীর মধ্যে ২২ জুন পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ৩ হাজার ২০৪ জন। এর মধ্যে হোম আইসোলেশনে ২ হাজার ৫০৫ জন (৮৭ শতাংশ) আর হাসপাতালে ৬৯৯ জন (১১ শতাংশ) সুস্থ হয়েছেন।
বৃদ্ধদের মধ্যে করোনা আক্রান্তের ঝুঁকি হলো সবচেয়ে বেশি। দুর্বল প্রতিরোধক্ষমতা ও স্বাস্থের অবনতির কারণে করোনায় সহজেই আক্রান্ত হচ্ছেন বয়স্করা। চট্টগ্রামে ৬০ বছরের উর্ধ্বে করোনায় আক্রান্ত রোগীর হার ১০ শতাংশ। যাদের অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে মারা গেছেন। আবার অনেক রোগী হাসপাতালে না গিয়ে ঘরোয়া চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে গেছেন। নগরীতে করোনামুক্ত হওয়া পাঁচজন বয়স্ক রোগীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শে উপসর্গ অনুযায়ী কিছু ওষুধ খেয়েছেন। বাসায় প্রয়োজনে অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহার করেছেন। পাশাপাশি নিয়মিত গরম পানির ভাপ ও গার্গল করেছেন। এছাড়া মধু, কালোজিরা, আদা, দারুচিনি, লবঙ্গ, এবং ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার লেবুর শরবত ও মাল্টার জুস পান করেছেন।
নগরীর লালখান বাজার এলাকার বাসিন্দা ৭৫ বছর বয়সী কাজী মনিরুল হোসাইন ৫ জুন নমুনা পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ হন। তিনি হাসপাতালে না গিয়ে বাসায় ঘরোয়া চিকিৎসা নেন। ৭ দিনের মাথায় তিনি করোনামুক্ত হন।
কাজী মনিরুল হোসাইন সুপ্রভাতকে বলেন, নিয়মিত গরম পানির ভাপ ও গার্গল করেছি। এছাড়া মধু, কালোজিরা, আদা ও দারুচিনি খেয়ে আমি সুস্থ হয়ে গেছি। বাসায় অক্সিজেন সিলিন্ডার থাকলেও ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি।
মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা জাহানারা বেগমের ৫ জুন করোনা শনাক্ত হয়। তিনি হাসপাতালে না গিয়ে বাসায় আইসোলেশনে থেকে এক সপ্তাহ আগে করোনামুক্ত হয়েছেন। সুপ্রভাতকে তিনি বলেন, আমার কোনো উপসর্গ ছিল না, তাই বাসায় আইসোলেশনে থেকেছি। নিয়মিত গরম পানি পান ও গার্গল করতাম। আর ভিটামিন সি জাতীয় খাবার খেতাম। ৭ দিন পর আমার নেগেটিভ ফলাফল আসে।
আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আবদুর রব সুপ্রভাতকে বলেন, ‘আমরা শুরু থেকে বলে আসছি, করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে ৮০ শতাংশ রোগীর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন নেই। তারা আইসোলেশনে থাকলে স্বাভাবিকভাবে ভাইরাসটি শরীর থেকে চলে যাবে। ২০ শতাংশ রোগী যাদের জটিল সমস্যা আছে তাদের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।’
হাসপাতালে কেন যাচ্ছেন না রোগীরা
বাসায় আইসোলেশনে থাকা অধিকাংশ রোগী হাসপাতালে যাচ্ছেন না মূলত চিকিৎসা না পাওয়ার শঙ্কায়। চট্টগ্রামে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৬০০ জন রোগীকে ভর্তি রাখার মতো ব্যবস্থা রয়েছে। চট্টগ্রামে ২২ জুন পর্যন্ত ৩ হাজার ৪০০ জন করোনা পজিটিভ রোগী রয়েছেন। যার মধ্যে মাত্র ২২ শতাংশ রোগী হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
বাসায় আইসোলেশনে থাকা কয়েকজন করোনা পজিটিভ রোগীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে শয্যা খালি না থাকা ও চিকিৎসা না পাওয়া এবং বেসরকারি হাসপাতালে গলাকাটা ফি নেওয়ার কারণে তারা হোম আইসোলেশনকে নিরাপদ মনে করছেন।
নগরীর হালিশহর ঈদগাহ এলাকার ৭৫ বছর বয়সী আহমেদ সোবহানের করোনা ধরা পড়ে গত ২ জুন। কিন্তু বয়োবৃদ্ধ এ রোগী হাসপাতালে ভর্তি না হয়েও করোনামুক্ত হয়ে গেছেন। তার ছেলে আহমেদ নেওয়াজ সুপ্রভাতকে বলেন, কোনো সরকারি হাসপাতালে এখন সিট খালি নেই। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে গলাকাটা ফি নেওয়া হচ্ছে। আমার বাবার কিছু জটিল সমস্যা থাকলেও আমরা নিরুপায় হয়ে তাকে বাসায় আইসোলেশনে রেখেছি। বাসায় তাকে অক্সিজেন দিয়েছি। ঘরোয়া চিকিৎসায় তিনি করোনামুক্ত হয়ে গেছেন।