হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক কে হচ্ছেন?

0
342

আল্লামা শফি মজলিশে শূরার বেঠক ডেকেছেন আজ #
আলোচনায় নুর আহমদ, জুনায়েদ বাবুনগরী ও দিদার কাসেমী #
নেপথ্যে ভূমিকা রাখছেন নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী #

সালাহ উদ্দিন সায়েম :
হাটহাজারী আল জামেয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার বুধবার মজলিশে শূরার বৈঠক ডেকেছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পরিচালক শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফি। সোমবার বিকেলে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে মাদ্রাসায় ফিরে তিনি মজলিশে শূরার বৈঠকের আহ্বান করেন।
বুধবার সকাল ১০টা থেকে মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক আহমদ শফির কার্যালয়ে মজলিশে শূরার বৈঠক শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে মজলিশে শূরার ১৭ জন সদস্যের মধ্যে ১০ জন অংশ নেবেন। বাকি ৭ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন মাদ্রাসাটির বর্তমান প্রধান পরিচালক ও হেফাজতে ইসলামের আমির ১০৪ বছর বয়সী আল্লামা আহমদ শফি।
হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে মাদ্রাসার নতুন প্রধান পরিচালক নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে শূরা কমিটির সদস্যদের এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। তাদেরকে চিঠিতে বিবিধ আলোচনার কথা বলা হয়েছে।
জানতে চাইলে মাদ্রাসার মজলিশে শূরার সদস্য হাটহাজারী মেখল মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা নুমান ফয়েজী সুপ্রভতকে বলেন, আল্লামা শফি নানা বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত। তিনি এখন স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারছেন না। এ অবস্থায় তিনি হয়তো মাদ্রাসার কর্মকা- পরিচালনার জন্য তাঁর উপস্থিতিতে প্রধান পরিচালক নিয়োগ দিয়ে দিতে পারেন। যাতে পরবর্তীতে কোনো ঝামেলা না হয়। এ জন্য তিনি হয়তো মজলিশে শূরার বৈঠক ডেকেছেন।
মাদ্রাসার সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী কমিটি মজলিশে শূরার সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচিত হয় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পরিচালক। আল্লামা শফি দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে হাটহাজারী দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
জানা গেছে, হাটহাজারী মাদ্রাসার নতুন প্রধান পরিচালক যিনি হবেন তিনি পদাধিকার বলে হেফাজতে ইসলামের নতুন আমির হবেন।
কে হচ্ছেন নতুন প্রধান পরিচালক?
হাটহাজারী দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার মজলিশে শূরার ৪ জন সদস্যের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক পদে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা রাখেন তিনজন। এরা হলেন মাদ্রাসার শিক্ষা সচিব ও প্রধান মুফতি আল্লামা নুর আহমদ, মাদ্রাসার সহযোগী পরিচালক ও হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী এবং সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা আহমদ দিদার কাসেমী।
তিনজনের মধ্যে জুনায়েদ বাবুনগরীর ওপর চরম অসন্তুষ্ট আল্লামা শফি। হেফাজতের সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গত প্রায় এক বছর ধরে বাবুনগরীর সাথে বিরোধ চলে আসছে আল্লামা শফির।
২০১৭ সালের জুলাই মাসে আহমদ শফি অসুস্থ হয়ে পড়লে মজলিশে শূরার বৈঠকে তাঁকে দৈনন্দিন কাজে সহযোগিতা করার জন্য মাদ্রাসার সহযোগী পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল জুনায়েদ বাবুনগরীকে। তখন তাদের দুজনের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল। কিন্তু তাঁরা এখন দুজন দুই মেরুতে। তাঁদের সম্পর্ক এখন সাপে-নেউলে।
গত ১৬ মে দুপুরে আল্লামা শফি হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়লে হাটহাজারী মাদ্রাসার মসজিদে জোহরের নামাজ শেষে হেফাজতের কয়েকজন নেতা জুনায়েদ বাবুনগরীকে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বসেন। বিকেলে আল্লামা শফির জ্ঞান ফিরে আসার পর তিনি এই খবর শুনে বাবুনগরীর ওপর প্রচ- ক্ষেপে যান বলে জানা গেছে। ওই দিন রাতে তিনি ফেসবুক লাইভে এসে মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব কাউকে দেননি বলে জানিয়ে দেন।
আল্লামা শফির ঘনিষ্ট মাদ্রাসার একজন শিক্ষক সুপ্রভাতকে বলেন, গত ১৬ মে এর ঘটনায় বাবুনগরীর সাদা কাপড়ে দাগ লেগে গেছে। ওই ঘটনায় হুজুর (আল্লামা শফি) মনে অনেক কষ্ট পেয়েছেন। মূলত ওই ঘটনার কারণেই হুজুর তাঁর উপস্থিতিতে কাউকে মাদ্রাসার প্রধান পরিচালকের দায়িত্ব দিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আল্লামা শফি চিকিৎসাধীন থাকার সময় গত শনিবার ভোরে তাঁকে দেখতে আসেন জুনায়েদ বাবুনগরী। কিন্তু বাবুনগরীর সাথে কোনো কথাই বলেননি আল্লামা শফি।
হাটহাজারী মাদ্রাসার মজলিশে শূরার অপর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মুফতি আল্লামা নুর আহমদ এবং আল্লামা আহমদ দিদার কাসেমীর মধ্যে একজনকে বেচে নিতে পারেন আল্লামা শফি। দুজনের মধ্যে আল্লামা শফি আহমদ দিদার কাসেমীকে পছন্দ করেন। কারণ আহমদ কাসেমীর পিতা মাওলানা আবদুল ওয়াহাব ৪০ বছর এ মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক ছিলেন। আহমদ শফি ছিলেন তাঁর ছাত্র।
হাটহাজারী মাদ্রাসার মজলিশে শূরার চট্টগ্রাম জেলার একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুপ্রভাতকে বলেন, উনি (আল্লামা শফি) আমাদের সবার মুরব্বী। উনি যদি বৈঠকে কারো নাম প্রস্তাব করে আমাদের সম্মতি চান তাহলে আমরা তার মতামতের বাইরে যেতে পারবো না। আর যদি তিনি কাকে নির্বাচন করবেন সে ব্যাপারে শূরার সদস্যদের মতামত চান সেক্ষেত্রে হয়তো দুই-তিনজনের নাম উঠে আসতে পারে।
নেপথ্যে ভূমিকা রাখছেন নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী
জানা গেছে, হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক নির্বাচন নিয়ে নেপথ্যে ভূমিকা রাখছেন ফটিকছড়ির সংসদ সদস্য ও তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়্যদ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী। আল্লামা শফি ও জুনায়েদ বাবুনগরীর পক্ষের লোকজন তাঁর সাথে যোগাযোগ করেছেন বলে জানা গেছে।
হেফাজত নেতাদের অনেকে মনে করছেন, সূফি মতবাদে বিশ্বাসী নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর সাথে আক্বীদাগত দিক থেকে হেফাজতের মতভেদ থাকলেও তিনি স্থানীয় ও ধর্মীয় সংগঠনের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে কোনো বিশেষ মহলের নির্দেশে ভূমিকা রাখছেন।
সৈয়্যদ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সুপ্রভাতকে বলেন, হাটহাজারী মাদ্রাসার নতুন পরিচালক নির্বাচন নিয়ে আমার সাথে দুটি পক্ষ যোগাযোগ করে আসছেন। যদিও এটি তাদের মজলিশে শূরার বিষয়। তবে আমি চাই, হাটহাজারী মাদ্রাসার নতুন পরিচালক পদে যেন কোনো জামায়াত-প্রীতির লোক না আসে।
উল্লেখ্য, হেফাজতের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীর সাথে যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদ-প্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে শামীম সাঈদীর সাক্ষাতের একটা ছবি মাস খানেক আগে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।