হাজারীলেইনের চিত্র পাল্টায়নি

0
245
হাজারিগলির ওষুধের দোকানগুলোতে না মিললেও ভিতরের রাস্তা ও ফুটপাতে দ্বিগুণ দামে পাওয়া যাচ্ছে স্যাভলন-সুপ্রভাত

পাইকারিতে ওষুধ কিছুটা মিলছে, খুচরায় সংকট, রাস্তায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে ডেটল, স্যাভলন #
রুমন ভট্টাচার্য :
প্রশাসনের দফায় দফায় অভিযান ও জরিমানার পরও তেমন পাল্টায়নি হাজারিলেইনের চিত্র। ওষুধের খুচরা দোকানগুলোতে শুধু নেই আর নেই। আছে ওষুধের সংকট ও বাড়তি দাম। প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট আরো প্রকট। পাইকারিতে কিছু ওষুধ মিললেও খুচরায় একবারে মিলছে না। ফলে অনেককে প্রয়োজনের বেশি ওষুধ কিনতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে। আবার অনেক ফার্মেসিতে পরিচিত মুখ দেখে ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে সেই বাড়তি দামেই।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) বেলা ১২ সরেজমিন হাজারিলেইন ঘুরে মিলল এমন তথ্য ও চিত্র।
সরেজমিন দেখা গেছে, ডেটল, স্যাভলন দোকানে নেই। অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে রাস্তার উপর। স্যাভলন ১০০০ মিলির দাম ৫০০টাকা। ১১২ এমএল স্যাভলনের দাম ১১০-১২০, ৩৮ টাকা ডেটলের দাম ১০০ টাকা। এছাড়া নকল সুরক্ষাসামগ্রীরও অভাব নেই। বিক্রি হচ্ছে দেদারছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিক্রেতাদের একজন জানান, ‘স্যাভলন তারা বেশি দামে রেয়াজুদ্দিন বাজার থেকে কিনে আনছেন।
এ সময় প্রতিবেদক নিজেই ক্রেতা সেজে মেসার্স আলী ফার্মেসী, চৌধুরী ড্রাগ হাউস, স্বপ্না ফার্মেসীসহ আরো বেশ কয়েকটিতে নাপা, নাপা এক্সটেন্ড, জিম্যাক্স, ফেক্সো, সিভিট, স্কাভো-৬, ইভেরা-৬, ইভেরা-১২সহ জীবাণুনাশক স্যালভন ও ডেটলসহ আরো বেশকিছু ওষুধ ও থার্মোমিটারের খোঁজ করলে বিক্রেতারা এককথায় নেই বলে জানান।
পি কে সার্জিক্যালে গেলে ১ ডজন থার্মোমিটারের দাম চাওয়া হয় ৪০০ টাকা। বিক্রেতা খুচরা বিক্রি হয় না বলে জানান। পপুলার হেলথ কেয়ারে ইভেরা-১২ এক বক্স অর্থাৎ ১০টি ট্যাবলেটের দাম চাওয়া হয় ৩০০ টাকা।
খুচরা দোকানদাররা জানান, মার্কেটে ওষুধ কোম্পানিগুলোর পর্যাপ্ত সাপ্লাই নেই। চাহিদা অনুযায়ী কাউকেই তারা ডেলিভারি দিতে পারছেন না। আবার অনেক ক্রেতা অপ্রয়োজনে ওষুধ কিনে নিয়ে ঘরে স্টক করছেন। ফলে সংকট কাটছে না।
তবে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির দাবি তারা নিয়মিত হাজারিলেইনে ওষুধ সরবরাহ করছেন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধগুলো তারা পর্যাপ্ত পরিমাণে দিচ্ছেন।
দুপুর সাড়ে ১২টা পঞ্চাষোর্ধ একজন ব্যক্তি আসেন স্যাভলনের খোঁজে। বেশ কয়েকটি দোকানে খোঁজ করে পাননি। পরে তিনি রাস্তায় বসা একজনের কাছ থেকে ৫০০ টাকায় ১০০০ মিলির একটি জার কেনেন বলে জানান।
এরপর দুপুর ১টায় নাপা, জি ম্যাক্স, সিভিট, জিঙ্ক সিরাপ ও থার্মোমিটারের খোঁজে আসেন টেরীবাজারের বাসিন্দা রাজু। প্রায় ৬ দোকান ঘুরলেও কোনটিতেই পাননি বলে জানান। এছাড়া সিভিটের বিকল্প কিছু তিনি খুঁজে পাননি।
ফার্মেসির তথ্য মতে, করোনা শুরুর পর থেকে বেক্সিমকোর প্যারাসিটামল গ্রুপের নাপা ও নাপা এক্সটেন্ড ও স্কয়ার ফার্মাসিটিউক্যালস এর অ্যান্টিবায়োটিক অ্যাজিথ্রোমাইসিন গ্রুপের জিম্যাক্স-৫০০ এমজি ট্র্যাবলেট, কাশির জন্য ফেক্সো ট্যাবলেট ও ভিটাসিন সি গ্রুপের সিভিট ট্যাবলেটের চাহিদা বেড়েছে বহুগুণ। বাজারে এখন এই দুই কোম্পানির ওষুধের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।
এ বিষয়ে স্কয়ার ফার্মাসিটিউক্যালস কোম্পানির চট্টগ্রামের ডিপো ম্যানেজার আবদুল মালেক বলেন, ‘আমরা মার্কেটে নিয়মিত সিভিট সরবরাহ করছি। আজকেও (মঙ্গলবার) দিলাম। আগে প্রতিমাসে বিক্রি হতো ১২-১৩ হাজার বক্স। এখন বিক্রি হচ্ছে ২৫-৩০ হাজার বক্স। তারপরও দেখা যায় যাদের যে পরিমাণ দরকার সে পরিমাণ দিতে পারছি না। হাজারী লেইনে আছে হয়ত আপনাকে দেখায়নি। আমাদের প্রোডাক্ট সাড়ে ৮০০। বর্তমানে প্যারাসিটামল, সিভিট ও জিম্যাক্সের চাহিদা খুব বেশি। আগে নরমালি যা দিতাম এখন তার দ্বিগুণ ও তিনগুণ মার্কেটে দিচ্ছি। তারপরও চাহিদা মোতাবেক হচ্ছে না এরকম একটা অবস্থা।’ এ অবস্থা প্রায় সব ওষুধ কোম্পানির বলে জানান তিনি।
বেক্সিমকো ফার্মাসিটিউক্যালস কোম্পানির চট্টগ্রামের জোনাল হেড জাহিদ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘বাজারে এখন একটা আর্টিফিসিয়াল ডিমান্ড তৈরি হয়েছে। ওই ডিমান্ডটা আমরা মেটাতে পারছি না। তবে প্রতিদিন আমরা হাজারিলেইনসহ বিভিন্ন ফামেসিতে প্রোডাক্ট দিচ্ছি। নাপা, নাপা এক্সটেন্ড, অ্যাজিথ্রোমাইসিনের, ইভেরা-৬ ও ইভেরা-১২ এসব ওষুধের এখন চাহিদা বেশি। ওষুধগুলো মার্কেটে পর্যাপ্ত পরিমাণ দিচ্ছি। আমরা সপ্তাহের প্রতিদিনই সাপ্লাই দিয়ে যাচ্ছি।’
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ক্যাব এর চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘হাজারিলেইনে অভিযানে কোনো সুফল আসেনি, চিত্র আগের মতই। কারণ অভিযানের ফলোআপ নেই। ওষুধ প্রশাসনকে শুধু ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায়। বাকি সময় তাদের কোনো খবর থাকে না। ফলে যেটার হওয়ার সেটাই হচ্ছে।’
বাংলাদেশ কেমিস্ট ড্রাগিস্ট সমিতির চট্টগ্রাম জেলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক লায়ন আশীষ ভট্টাচার্য বলেন, মার্কেটে প্রয়োজনীয় ওষুধের চাহিদার সংকট রয়েছে। কোম্পানিগুলো চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছেন না। অথচ প্রশাসন সেটা চিন্তা না করে উল্টো হাজারিলেইনে অভিযান পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে আমরা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনার ও ওষুধ প্রশাসনকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি অবহিত করেছি।’
চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম এর সহকারী পরিচালক হোসাইন মোহাম্মদ ইমরান সুপ্রভাতকে বলেন, ‘হাজারিগলি মূলত পাইকারি ওষুধের মার্কেট। রিটেইল দোকান ও হসপিটাল ফার্মেসিতে এসব ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। স্যাভলন বিক্রি এখন সিন্ডিকেটের হাতে চলে গেছে। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। হাজারিগলিতে এখন ওষুধ স্টক করা হচ্ছে না। আমরা নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছি।’
ক্যাবের অভিযোগ বিষয়ে তিনি খুচরা ওষুধ কিনতে রিটেইল দোকান ও হাসপাতালের ফার্মেসিগুলোতে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।