‘হটস্পট’ সাতকানিয়ায় করোনার মাথা নত!

0
238

গত ৫ দিনে ৯৯টি নমুনায় মাত্র ১ জন শনাক্ত #
সাতকানিয়া মডেল অন্য উপজেলায়ও বাস্তবায়ন করা হবে : সিভিল সার্জন #

সালাহ উদ্দিন সায়েম :
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় গত ১২ মে ৩৯ জনের নভেল করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে পজিটিভ শনাক্ত হয় মাত্র ১ জন। এরপর ১৩ থেকে ১৬ মে পর্যন্ত চার দিনে ৬০ জনের নমুনা পরীক্ষায় ফলাফল ছিল শূন্য। গত পাঁচ দিনে ৯৯টি নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের সংখ্যা কেবল ১ জনই।
তবে কি করোনার ‘হটস্পট’ সাতকানিয়ায় সংক্রমণ কমে গেছে?
চট্টগ্রামে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ৯ এপ্রিল প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে সাতকানিয়ায়। এরপর দুই দিনের মাথায় সাতকানিয়ায় ৭ জন করোনায় আক্রান্ত হয়। চট্টগ্রামে তখন ২৭ জনের মধ্যে সাতকানিয়ায় ৮ জন আক্রান্ত হওয়ায় উপজেলাটিকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ‘হটস্পট’ (অতিঝুঁকিপূর্ণ) হিসেবে বিবেচনায় নেয় প্রশাসন। এরপর ১৫ এপ্রিল সাতকানিয়া লকডাউন করে স্থানীয় প্রশাসন।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ১৬ মে পর্যন্ত সাতকানিয়ায় ২১৭ টি নমুনা পরীক্ষায় পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে ৩২ জন। অর্থাৎ আক্রান্তের হার ১৪.৭৪ শতাংশ।
গত ৭ মে ৭ জন শনাক্ত হলেও ৮ থেকে ১৬ মে পর্যন্ত ১১৮টি নমুনা পরীক্ষায় পজিটিভ শনাক্ত হয় ৪ জন। অর্থাৎ গত ৯ দিনে আক্রান্তের হার নেমে আসে ৩.৩৮ শতাংশে।
গত ৫ মে থেকে সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে কক্সবাজার সরকারি মেডিক্যাল কলেজে।
গত ৯ দিনে সাতকানিয়ায় নমুনা পরীক্ষার পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৪ লাখ জনসংখ্যার এই উপজেলায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকির মাত্রা অনেক কমে এসেছে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ও সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাও মনে করছেন, নানা পদক্ষেপের কারণে সাতকানিয়ায় করোনার ঝুঁকির মাত্রা অনেক কমে এসেছে। শনিবার জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে চট্টগ্রামে করোনার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সাতকানিয়ার চিত্র উঠে আসে। কর্মকর্তারা সাতকানিয়ায় করোনা পরিস্থিতি নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেন।
কীভাবে সাতকানিয়ায় করোনা সংক্রমণের অতিঝুঁকির মাত্রা কমে এসেছে?
গত ১১ এপ্রিল সাতকানিয়ার পশ্চিম ঢেমসা ইউনিয়নের ইছামতি আলিনগর গ্রামে ৬৯ বয়সী সিরাজুল ইসলাম নামে এক বৃদ্ধের নমুনা পরীক্ষায় করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। নমুনা শনাক্তের দুই দিন আগে ৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান।
এরপর ১২ এপ্রিল সাতকানিয়ায় আরও ২ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। ১৪ এপ্রিল আরও ৫ জনের করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। তারা সবাই পশ্চিম ঢেমসা ইউনিয়নের ইছামতি আলিনগর গ্রামের বাসিন্দা ছিল।
সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবদুল মজিদ ওসমানী সুপ্রভাতকে বলেন, চট্টগ্রাম নগরীর সাগরিকা হয়ে সাতকানিয়ায় করোনা ঢুকেছে। মারা যাওয়া বৃদ্ধ সিরাজুল ইসলাম সাগরিকায় ব্যবসা করতেন। তিনি সেখান থেকে করোনা বহন করে সাতকানিয়ায় নিয়ে এসেছিলেন।
তিনি বলেন, সিরাজুল ইসলাম মারা যাওয়ার পর তার পরিবারের সদস্য ও স্বজন মিলে ১২ জন আক্রান্ত হন। যারা কেউ তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন, কেউ তার জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন। এরপর ৩ নম্বর পশ্চিম ঢেমশা ওয়ার্ডের ৩৪২টি পরিবারসহ পুরো এলাকা লকডাউন করা হয়।
ডা. আবদুল মজিদ ওসমানী বলেন, আক্রান্তের সংখ্যা আটকানোর জন্য আমরা একটা সিস্টেমের মধ্যে এগিয়েছি। সিস্টেমটা হলো, কোনো এলাকায় কেউ শনাক্ত হলে সেখানে তার পরিবার, স্বজন ও আশপাশের সবার নমুনা সংগ্রহ করেছি। এর আগে আমরা চিকিৎসক, নার্স থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করি। আক্রান্তের সাথে পরীক্ষার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এতে উন্মেচিত হতে থাকে করোনার চিত্র। মানুষ সতর্ক ও সাবধান হয়ে যায়। এই সিস্টেমের কারণে করোনাকে আমরা আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছি।
চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার মধ্যে ১৬ মে পর্যন্ত সাতকানিয়ায় সর্বোচ্চ ২৬৬টি নমুনা সংগ্রহ হয়েছে বলে জানান তিনি।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি সুপ্রভাতকে বলেন, আসলে সাতকানিয়ায় করোনার সামাজিক সংক্রমণ ছড়ায়নি। মারা যাওয়া ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে নির্দিষ্ট কিছু পরিবারে করোনার সংক্রমণ হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসনের বেশি সংখ্যক নমুনা সংগ্রহের পদক্ষেপ ও লকডাউনের কারণে করোনার সংক্রমণ আর বিস্তৃত হয়নি। সাতকানিয়া উপজেলায় করোনা আটকানোর এই ফর্মূলা আমরা সামনে অন্যান্য এলাকায় বাস্তবায়ন করবো।