সদরঘাট থানায় সেবা নিতে যাচ্ছে না কেউ!

0
228

ওসিসহ ১০ পুলিশ করোনা আক্রান্ত
মোহাম্মদ রফিক :
নগরের সদরঘাট থানার ওসিসহ ১০ পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্তের খবর জানা গেছে গত ১৩ মে রাতে। নগরে একসঙ্গে এত পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। জানা গেছে, ওসি ফারুকী ছাড়াও আক্রান্তদের মধ্যে ২ জন এএসআই এবং ৭ জন কনস্টেবল রয়েছেন। এদের মধ্যে একজন ওসির দেহরক্ষী এবং আরেকজন গাড়ি চালক।
আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসা চলছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে। এর আগে গত সপ্তাহে এ থানার এক মুন্সির শরীরে করোনার সংক্রমণ ঘটে বলে থানার একটি সূত্র জানিয়েছে।
তবে এত পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হলেও সদরঘাট থানা ভবনকে লকডাউনের আওতায় আনা হয়নি। এ নিয়ে কিছু পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। তাদের মধ্যে কেউ বলছেন, পুলিশ সদস্যদের সুরক্ষার বিষয়টি পুরোপুরি আমলে নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। ফলে দিন দিন আক্রান্ত বেড়েই চলেছে।
শনিবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, সদরঘাট থানায় সুনসান নীরবতা। ওসি ফারুকীর দপ্তরটি বন্ধ। অন্যান্য রুমে হাতেগোনা কিছু পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের চোখে মুখে আতংক। এক ঘণ্টা থানা প্রাঙ্গণে অবস্থান করে দেখা যায়নি কোন সেবাগ্রহীতার আনাগোনা।
সিএমপির ডিসি ট্রাফিক (উত্তর) অফিসের সীমানার ভেতর চার কক্ষের টিনশেড ঘরে চলছে সদরঘাট থানার কার্যক্রম। শনিবার দুপুর ১২টার দিকে থানার সামনে দায়িত্ব পালন করেন কনস্টেবল মোজাম্মেল হক। তিনি জানান, সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ছাড়া অন্য কোন কাজ আপাতত হচ্ছে না। তার সঙ্গে কথা বলার সময় ছুটে আসেন এক নারী পুলিশ সদস্য। তার দাবি, ১০ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হলেও তাদের মনবল চাঙ্গাই আছে।
এদিকে ১৫ মে করোনা উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক পুলিশ কনস্টেবলের মৃত্যু হয়েছে। তিনি করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত ছিলেন কি না, তা জানতে তার নমুনা পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। এখন ফলাফল আসেনি।
মৃত পুলিশ সদস্য নাইমুল হক (৪০) নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের বন্দর অঞ্চলে কনস্টেবল পদে কর্মরত ছিলেন। তার বাসা নগরের আমবাগান এলাকায়। করোনা উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রামে এ প্রথম কোনো পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হলো।

নাম প্রকাশ না করে সদরঘাট থানার এক পুলিশ সদস্য বলেন, ওসি স্যারসহ করোনায় দশজন পুলিশ আক্রান্ত হওয়ায় পর থানায় ডিউটি করতে আসতেও ভয় লাগছে। সেবা নিতেও আসছেন না লোকজন। সবাই এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে আছি।
এ থানার একজন এসআই বলেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই পুলিশ নিজেদের সুরক্ষার চেয়ে জনগণের সুরক্ষার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়ার কারণে পুলিশের এত বেশি সদস্য আক্রান্ত হচ্ছেন।
নগর পুলিশ কমিশনার মো. মাহবুব রহমান বলেন, ‘পুলিশ সদস্যদের শারীরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি উন্নয়নের বিষয়টি নিয়েও আমরা কাজ করছি।’
এদিকে সদরঘাট থানার করোনা আতঙ্ক ছড়িয়েছে একই সীমানার মধ্যে থাকা নগর ট্রাফিক পুলিশের উত্তর বিভাগের দপ্তরেও। এ দপ্তরের ট্রাফিক পুলিশ ইন্সপেক্টর (টিআই) মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, সদরঘাট থানার দশ পুলিশের করোনা শনাক্ত হওয়ার পর খুব সাবধানতার সাথে কাজ করতে হচ্ছে।
আরেক কর্মকর্তা বলেন, একই সীমানার মধ্যে সিএমপির দুটি প্রতিষ্ঠান থাকায় থানা ভবন লকডাউন করা যায়নি। কারণ থানা ভবন পুরোপুরি লকডাউন করা হলে কার্যত ট্রাফিক অফিসও অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। এ কারণে সদরঘাট থানা লকডাউন করা যায়নি।
ট্রাফিক পুলিশের আরেক কর্মকর্তা বলেন, একই বৃত্তের মধ্যে পুলিশের দুটি প্রতিষ্ঠান। একটির লোকজন আক্রান্ত হলেও আরেকটি প্রতিষ্ঠানের জন্য লকডাউন করা যাচ্ছে না। এ মুহূর্তে সদরঘাট থানা যেন তাদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জানা গেছে, চট্টগ্রামে প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় গত ৩ এপ্রিল। নগরের দামপাড়ায় ৬৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তি প্রথম সংক্রমিত হন।
এ বৃদ্ধের করোনায় আক্রান্তের খবর যেদিন বেরুলো, সেদিন রাতেই গিয়ে তার দামপাড়ার ১নম্বর গলির বাড়িসহ আশপাশের আরও ৫টি বাড়ি লকডাউন করে দেয় পুলিশ।
তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ মে পর্যন্ত সিএমপিতে মোট ৪৪ জন পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯ জন সুস্থ হয়েছেন। এ কারণে নগরের ১৫২ স্থানের ১১২টি ভবন ও ৪১৫টি ঘর লকডাউন করেছে পুলিশ।