ধপ করে চারিদিকে অন্ধকার

0
198

আবদুল মান্নান

১৪ মে বুহষ্পতিবার । 4:55 pm!! RIP Abba! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও আমার মোবাইলে আনন্দের ক্ষুদে বার্তা। আনন্দ জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের একমাত্র ছেলে । বাবার মৃত্যু সংবাদটা এই ভাবেই দিল। মনে হল ধপ করে সব বাতিগুলো নিভে গেল, চারিদিকে সব অন্ধকার । দেশে ও দেশের বাইরে বাংলা ভাষাভাষি মানুষ যেখানেই থাকুন না কেন তারা প্রফেসর আনিসুজ্জামানকে চিনেন না তেমন কাউকে পাওয়া যাবে না । দীর্ঘদিন ভুগছিলেন বার্ধক্য জনিত রোগে । কবে বৃহষ্পতিবার রাতে জানা গেল স্যার করোনা পজিটিভ ছিল । ভর্তি হয়েছিলেন একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে । প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ও পারিবারিক ইচ্ছায়  কয়েক দিন আগে তাঁকে সিএমএইচএ ভর্তি করানো হয় । প্রধানমন্ত্রী তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাঃ আবদুল্লাহকে নিয়োজিত করেছিলেন তাঁর চিকিৎসার জন্য । প্রফেসর আনিসুজ্জামান প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি শিক্ষকও ছিলেন । শুধু প্রধানমন্ত্রী কেন বলি তিনি জাতির প্রগতিশীল অংশের প্রতিটি মানুষের শিক্ষক ছিলেন প্রফেসর আনিসুজ্জামন। প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা  করতেন তাঁর শিক্ষককে অসম্ভব রকমের ।  সব কিছু ছেড়ে তাঁর হাজারো গুণমুগ্ধকে ছেড়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তিনি ছিলেন বাংলার একজন বাতিঘর। সেই বাতিঘর চিরতরে নিভে গেল । ক’দিন আগে আর এক বাতিঘর প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন । দেশটা এখন বামানে ভরে যাচ্ছে ।

প্রফেসর আনিসুজ্জামানের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৬৯ সালে তাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি’র এক অনুষ্ঠানে । তখন আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র । একই সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন রিডার হিসেবে (সহযোগী অধ্যাপক)। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর যোগ দেয়ার পিছনে কারণ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রমোশন পাওয়ার সহজে সুযোগ হচ্ছিল না কারণ কোন পোস্ট ছিল না । তখন একটা পোস্ট সৃষ্টি করা কত দুরুহ ছিল তা আজকের প্রজন্মকে বুঝানো যাবে না । আর আপগ্রেডেশন শব্দটি ছিল অজানা । ১৯৭৩ সালে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলে তাঁর সাথে আমার  ঘনিষ্ট হওয়ার সুযোগ হয় । তিনি এত সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও আমাদের মতো এত জুনিয়রদের কাছে টেনে নিতে পারতেন তা না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না । চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর আনিসুজ্জামান যোগ দেয়ার পর তিনি শুধু এই বিশ্ববিদ্যালয়কেই আলোকিত করেন নি তিনি চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সাংষ্কৃতিক জগৎকেও সমৃদ্ধ করেছিলেন, আরোকিত করেছিলেন  । সেই সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন প্রফেসর আনিসুজ্জামান ছাড়াও সৈয়দ আলি হাসান, আবু হেনা মোস্তাফা কামাল, এখলাসউদ্দিন আহমদে, শামসুল হক (পদার্থ বিজ্ঞান), আবদুল করিম, আলমগির মোহাম্মদ সিরাজুদ্দিন, মোঃ ইউনুস, রশিদ চৌধুরী, মুরতাজা বশির, দেবদাস চক্রবর্তি, মোহাম্মদ আলি, আলি ইমদাদ খান প্রমূখরা । এঁদের অনেকেই আজ আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তাঁরা আমাদের প্রজন্মের জন্য এক একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র । ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সহ আরো বেশ ক’জন সিনিয়র শিক্ষক ক্যাম্পাস ছেড়ে সপরিবারে ভারতে চলে যান । পথে তাঁরা এক রাতের জন্য আশ্রয় নিয়েছিলেন গহিরা গ্রামের দানবীর নূতন চন্দ্র সিংহের বাড়িতে । । চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এক রাতের আশ্রয় দেয়ার অজুহাতে রাউজানের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজ হাতে নূতন চন্দ্র সিংহকে  গুলি করে হত্যা করে । প্রফেসর আনিসুজ্জামান মানবতা বিরোধী অপরাধ  ট্রাইবুনালে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিচার চলাকালিন সময়ে সেখানে সাক্ষ্য দিতে গিয়েছিলেন । মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময় তিনি প্রবাসী সরকারের পরিকল্পনা কমিশনে একজন সদস্য হিসেবে যোগ দেন, দেশ ত্যাগী শিক্ষকদের একটি জোট গঠন করার জন্য চেষ্টা করেন।

দেশ স্বাধীন হলে প্রফেসর আনিসুজ্জামান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার শিক্ষক হিসেবে ফিরে আসেন । তখন হতেই তিনি হয়ে উঠেন সকলের আনিস স্যার । কোন অনুষ্ঠান হলে হতে পারে তা সাহিত্য বিষয়ক অথবা কোন সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান, আনিস স্যার অবধারিত ভাবে তাতে প্রধান অতিথি । তিনি আমাকে অসম্ভব স্নেহ করতেন । মনে করতেন কোন একটি কাজ অন্যকে দিয়ে না হলেও আমাকে দিয়ে হতে পারে । হোক না তাঁর গুরু প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক স্যারের জন্য শুঁটকি কেনা অথবা রেল ষ্টেশনে গিয়ে কোন একটা জরুরী চিঠি রেল ডাক সার্ভিসে দিয়ে আসা । একবার জানালেন তিনি জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে একটি আন্তজার্তিক সেমিনার করবেন । আমাকে ডেকে বললেন চট্টগ্রামেতো এই রকম সেমিনার করার কোন অডিটোরিয়াম নেই, কোথায় করা যেতে পারে? বললাম চট্টগ্রামের আমেরিকান সেন্টারে একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম আছে, তিনি অনুমতি দিলে আমি কথা বলে দেখতে পারি । পরিচালকের সাথে আমার ভাল জানা শোনা আছে । তাঁর অনুমতি নিয়ে পরিচালকের সাথে কথা বলতেই তিনি রাজি হয়ে গেলেন । আরো কিছু জুনিয়র শিক্ষকদের নিয়ে সেই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল অত্যন্ত সুচারু ভাবে ।  বাংলা বিভাগ আর আমাদের বিভাগ ছিল পাশাপাশি । হঠাৎ দেখি সেমিনার শেষ হওয়ার পর দিন  বেলা দশটার দিকে স্যার আমাদের কক্ষে এসে হাজির । আমি কিছুটা অবাক । তিনি  বললেন ‘মান্নান সম্মেলনের আয়োজন ও সব কিছু দেখে সকলে খুশি । আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে এসেছি’। এক অজ্ঞাত কারণে তিনি আমাকে সব সময় আপনি করে কথা বলতেন । অনেকবার বলেছি আমাকে তুমি বলতে কারণ আমি তাঁর আপনি সম্বোধনে অস্বস্তি বোধ করতাম । তিনি কখনো আমাকে তুমি বলতে রাজি হন নি ।

১৯৮৫ সালে খবর রটলো স্যার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাচ্ছেন । বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ছোট খাট একটি আন্দোলন গড়ে তুললেন  এই সিদ্ধানেতর বিরুদ্ধে ।  স্যারকে কিছুতেই ঢাকা যেতে দেবেনা  না । পরবর্তিকালে এই আন্দোলনে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরাই  না যোগ দিল শিক্ষক আর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরাও । যাবার দিন ক্ষণ যখন ঘনিয়ে এলো তখন আন্দোলন তাঁর ক্যাম্পাসের বাস ভবন পর্যন্ত পৌঁছে গেল । একদিন এক ছাত্র বোতল ভর্তি কেরোসিন নিয়ে স্যারের বাসার সামনে গিয়ে বললেন স্যার মত না পাল্টালে সে আত্মহুতি দেবে । স্যার ভীতর হয়ে এসে তাকে নিভৃত করলেন ।

আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে ১৯৮৫ সালের ১৭ আগষ্ট তিনি রাতের ঢাকা মেইল যোগে ঢাকা যাবেন বলে  যখন সপরিবারে চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে উপস্থিত হয়েছেন তখন স্টেশনে তাঁর ছাত্র-ছাত্রী, গুণগ্রাহী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপচে পড়েছে । আমরা কয়েকজন তাঁর মালপত্র তাঁর বগিতে তুলে দিতে সাহায্য করলাম । তিনি তখন স্টেশনে সকলের কাছ হতে বিদায় নিচ্ছেন । বললেন তিনি নিয়মিত আসবেন । কেউ কেউতো অনেকটা বিলাপ করে কাঁদছেন । এমন দৃশ্য কদাচিৎ দেখা যায় । সময় ঘনিয়ে এলে ট্রেনের হুইসেল বাজলো । স্যার ট্রেনে উঠলেন । আমি ছিলাম সেই চলন্ত ট্রেন হতে নামা শেষ ব্যক্তি । এক সময় ট্রেনখানি রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল । নিরবে আমার চোখ হতে দু’ফোটা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পরলো ।

১৯ আগস্ট ১৯৮৫ সালে আনিস স্যার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন । এর পর যখনই ঢাকা এসেছি তখনই স্যার ও ভাবির সাথে দেখা করেছি। ভাবির পিড়াপিড়িতে অনেক দিন খেয়ে এসেছি । তখন তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কোয়ার্টারে থাকতেন । ২০০৩ সালের ৩০ জুন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে অবসর নিয়ে প্রথমে গুলশানে পরে মহাখালিতে বসবাস শুরু করেন । অন্তত প্রতিমাসে একবার স্যারের বাসায় যাওয়া হোত । মাঝে মধ্যে তিনি কোন একটা কিছু তথ্যের জন্য আমাকে ফোনও করতেন । হাসপতালে  হওয়ার ক’দিন আগেও তাঁর বাসায় গিয়েছি । বেশ দুর্বল । ভাবি জানালেন কিছু খেতে পারেন না । স্যারের একটা অভ্যাস নিয়ে ভাবিতো বলতেনই, আমিও অনেক সময় বলতাম । স্যার কোন অনুষ্ঠানে কেউ ডাকলে না করতে পারতেন না । বলতেন এতদিন না করি নি এখন কি ভাবে না করি?

আনিসুজ্জামান স্যারের অসংখ্য ছাত্রছাত্রি ও গুণগ্রাহীকে কাঁদিয়ে তিনি আজ না ফেরার দেশে চলে গেলেন । প্রধানমন্ত্রী তাঁর আর একজন বিশ্বস্ত অভিভাবককে কয়েকদিনের ব্যবধানে হারালেন । আর দেশের প্রগতিশীল মানুষ হারালো আর একজন সদা উজ্জ্বল বাতিঘরকে । স্যার আপনি যেখানেই থাকুন ভাল থাকুন । এই দেশ ও তার মানুষ আপনার কাছে অনেক কারণে ঋণী ।

 

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক । ১৪ মে ২০২০