ফরাসি তারুণ্যের বিশ্ব জয়

দেবজ্যোতি চক্রবর্তী

মস্কোর লুঝনিকির আকাশও ক্রোয়েশিয়ার মডরিচ-মানজুকিচদের সাথে কাঁদছিলো গতকাল। বিশ্বকাপের ম্যাচে আগেও গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছিল। তবে এমন ঝুম বৃষ্টি হয়নি একটি ম্যাচেও। তাই ক্রোয়াটদের বেদনায় রাতের আকাশও কালো হয়েছিল। পুরো মাঠে আধিপত্য দেখিয়েছে তারা, কিন’ শেষ হাসি হেসেছে ফ্রান্স। বৃষ্টিও তাদের উদযাপনে বাধা হতে পারেনি। ফরাসি তারুণ্যের কাছে হার মেনেছে ক্রোয়াটদের সোনালী প্রজন্ম।
২০ বছর পর দ্বিতীয় শিরোপা ঘরে তুললো ফ্রান্স। জিনেদিন জিদানের পর এমবাপ্পে-গ্রিজম্যানদের হাত ধরেই এলো সোনালী ট্রফি। সেই সাথে কোচ দিদিয়ে দেশমও সেই ফাঁকে রেকর্ড গড়ে ফেললেন। জাগালো ও বেকেবাওয়ের পর খেলোয়াড় এবং কোচ হিসেবে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে তিনি শিরোপা জিতলেন।
১৯৬৬ সালের পর ফাইনালে ৪-২ গোলে ব্যবধানে জয় দেখে বিশ্ব। তবে সেবার খেলা গড়িয়েছিল অতিরিক্ত সময়ে। ১৯৩৮ সালে ৯০ মিনিটেই হাঙ্গেরিকে ৪-২ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথম শিরোপা জিতে ইতালি।
ম্যাচের আগে ফ্রান্স ছিলো অন্যতম ফেভারিট। সেই গ্রুপ পর্ব থেকে অপরাজিতছিলো দুই দল। তাই ক্রোয়েশিয়াকেও পিছিয়ে রাখা যাচ্ছিলো না। সেটা তারা গতকাল দেখিয়েছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণে মনোযোগী ছিলো ক্রোয়েশিয়া। কিন’ যে মানজুকিচের প্রতিপক্ষের জালে গোল করার কথা তিনিই আত্মঘাতী গোল করে বসেন। সেই সাথে বিশ্বকাপও দেখলো ফাইনালে প্রথম আত্মঘাতী গোল। ১৮ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে গ্রিজম্যান শট নিলে তা রক্ষা করতে গিয়েই দলকে বিপদে ঠেলে দেন মানজুকিচ।
কিন’ ম্যাচে ফিরে আসতে বেশি সময় নেয়নি ক্রোয়েশিয়া। গোল হজমের ১০ মিনিট পর ডি-বক্সের ভেতর থেকে দুর্দান্ত শটে গোল করেন পেরেসিচ। তবে ৩৮ মিনিটে আবারো পিছিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। দলকে সমতায় ফেরানোর নায়ক পেরেসিচ মুহূর্তেই হয়ে যান খলনায়ক। ফ্রান্স কর্নার পেলে গ্রিজম্যানের শট হেড দিয়ে বিপদমুক্ত করতে গেলে তার হাতে লাগে। রেফারি ভিআর দেখে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন। আর এতে প্রথমার্ধের আগে ২-১ ব্যবধানে দলকে এগিয়ে দেন গ্রিজম্যান। এটি ছিল তার বিশ্বকাপে চতুর্থ গোল।
দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ফ্রান্সও আক্রমণ চালাতে থাকে ক্রোয়েশিয়ার দুর্গে। ৫২ মিনিটে এমবাপ্পেতো আরেকটু হলে গোল করেই দিয়েছিলেন যদি ক্রোয়াট গোলরক্ষক সুবাসিচ পা দিয়ে তা না আটকাতেন। কিন’ ৫৯ মিনিটে দলকে বাঁচাতে পারেনি তিনি। ডি-বক্সের বাইরে থাকা পগবা বল পেয়েছিলেন গ্রিজম্যান থেকে। প্রথম শটে ক্রোয়াট ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে বল ফিরে আসলে আবারো শট নেন তিনি। আর সুবাসিচ বুঝে ওঠার আগেই জালে জড়ায় বল। পগবা পান এবারের আসরে তার প্রথম গোল।
৩-১ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও মনোবল হারায়নি ক্রোয়েশিয়া। সমান তালে আক্রমণে ছক কষেই যাচ্ছিলো ফ্রান্সের জালে। কিন’ ভাগ্য হয়তো সহায় হচ্ছিলো না তাই যথার্থ ফিনিশিং দিতে পারেনি কেউ। ৬৫ মিনিটে ক্রোয়েশিয়া আরেকটি গোল খেয়ে বসলে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন মলীন হতে থাকে। ধীরে ধীরে গতি কমে যায় তাদের। এ গোলের নায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে গোল করে তিনি পেলের রেকর্ডের ভাগ বসান।
৬৯ মিনিটে ফ্রান্সের গোলরক্ষক নিজের দক্ষতা দেখাতে গেলে গোল হজম করতে হয় তার দলকে। ব্যাক পাস তিনি শট দিয়ে না পাঠিয়ে পায়ে রেখে দেন। আর সেই বলে হালকা ছোঁয়া লাগিয়ে গোল করেন মানজুকিচ। কিন’ এ গোল শুধু পরাজয়ের ব্যবধানটাই কমাতে পেরেছে। বাকি সময়গুলো কয়েকটি সুযোগ পেলেও ব্যর্থ হয় তারা। শেষ পর্যন্ত সোনালী শিরোপা জয়ের স্বপ্ন বাস্তবতার মুখে দেখেনি।
শিরোপা না জিতলো গতকাল লুঝনিকিতে ফ্রান্সের চেয়ে বেশি সমর্থক ছিলো ক্রোয়েশিয়ার। নতুন দল হিসেবে অনেকেই চেয়েছিল যেন তাদের হাতে শিরোপা উঠুক। কিন’ তা হতে দেয়নি ফ্রান্স। সর্বশেষ ১৯৯৮ সালে নতুন দল হিসেবে এই ব্লুজরাই শিরোপা জিতেছিল। সেবার ক্রোয়েশিয়া প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছিল। ২০ বছর পর সেই ফ্রান্স দ্বিতীয় শিরোপা নিলো ক্রোয়েশিয়াকে পরাজিত করে। শিরোপা হাতছাড়া হলেও বিশ্বকে নতুন বার্তা দিয়ে গেলো ক্রোয়াটরা। শরণার্থী শিবির থেকে বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলে মডরিচ-রাকিটিচরা জানিয়ে দিলো, ক্রোয়েশিয়া নামক দলটি এখন আর মাঝারি মানে নয়, তারাও ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-জার্মানির মতো সমর্থকদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে স’ান করে নিয়েছে।
হয়তো ২০২২ সাল অনেকেই প্রিয় দল হিসেবে ‘ক্রোয়েশিয়া ক্রোয়েশিয়া’ বলে সমর্থন যোগাবে।