চমেক হাসপাতাল

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মেলে না শুক্রবার

সিফায়াত উল্লাহ

শুক্রবার ভোর ৬টা। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ১০৪ ডিগ্রি জ্বরে কাঁপছিল সাত বছরের শিশু রবিউল। ছেলের ছটফটানি দেখে তার মা নাছিমা বেগম ওয়ার্ডের ডাক্তারদের রুমে ছুটে যান। কিন’ সেখানে কোনো ডাক্তার ছিলেন না। কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় দফা রুমে গিয়ে নাছিমা এক ডাক্তারের খোঁজ পান। এরপর ওই ডাক্তারকে ছেলের শারীরিক অবস’ার কথা জানালে নাছিমাকে তিনি নাপা খাওয়াতে বলেন।
নাছিমা বেগম বলেন, ‘জ্বরে ছেলেটা কাঁপছিল। অথচ ডাক্তারকে জানানোর পরেও তিনি আমার ছেলেকে দেখতে আসেননি। পরামর্শ দিয়েছেন নাপা খাওয়ানোর। কিন’ এতেও তার জ্বর কমেনি। দুপুর একটা পর্যন্ত জ্বর ছিল রবির। এরপর অবস’া কিছুটা ভালো হয়। কিন’ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এ সময়ের মধ্যে কোনো চিকিৎসক আমার ছেলেকে দেখতে আসেননি।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে নাছিমা বেগম বলেন, ছেলেটার ওপর কত ঝড়-তুফান গেল। অথচ একজন ডাক্তারও তাকে দেখতে আসলেন না। তাহলে এখানে আনলাম কেন?
এই সমস্যা শুধু রবিউলের না। চমেক হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসাধীন সব রোগী ছুটির দিনগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দেখা পান না। নিয়ম অনুযায়ী শুক্রবারেও চালু হাসপাতালের সেবা। কিন’ অলিখিত নিয়মে প্রায় চিকিৎসক শুক্রবার অফিস করেন না। ফলে থমকে যায় জটিল ও সংকটাপন্ন রোগীর চিকিৎসা সেবা।
গতকাল চমেক হাসপাতালের একাধিক ওয়ার্ড ঘুরে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুক্রবার ওয়ার্ডে রাউন্ডে আসেননি চিকিৎসকরা। জরুরি প্রয়োজনে সেবা দিচ্ছেন ডিউটি ডাক্তাররা। তাও সাধারণ দিনের তুলনায় কম ছিল ডাক্তারদের উপসি’তি।
শ্বাসকষ্টে ভোগা দুই বছরের শিশু সালমাকে নিয়ে মহেশখালী থেকে শুক্রবার দুপুর দুটার দিকে হাসপাতালে আসেন নাসরিন আকতার। শিশু ওয়ার্ডের ১৯ নম্বর শয্যায় সালমার চিকিৎসা চলছে।
নাসরিন আকতার সুপ্রভাতকে বলেন, ‘চার দিন ধরে অসুস’ আমার মেয়েটি। শুক্রবার সকালে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় স’ানীয় চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য এ হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। কিন’ এখানে এসে কোনো ডাক্তার দেখছি না। ভর্তির পর ওয়ার্ডের এক আয়া জানিয়েছেন, শনিবার সকালে বড় ডাক্তার আসবেন। এরপর ওষুধ দিবেন। কিন’ অসুখ কী আর শুক্রবার বুঝে?
এদিকে, শুক্রবার বহির্বিভাগেও চিকিৎসক না থাকায় সাধারণ অসুখে ভোগা রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। ফলে দ্বিগুণ হয়ে যায় রোগী। এতে ব্যাহত হয় জটিল রোগের চিকিৎসা।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, যে পেশার সঙ্গে মানুষের জীবন-মৃত্যু জড়িত, সেখানে ছুটির দিনে রোগীদের সেবা প্রদানের জন্য বিশেষ ব্যবস’া থাকা উচিত।
গাইনি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন মমতা বেগমের স্বজন রাসেল মাহমুদ সুপ্রভাতকে বলেন, ডাক্তাররাও মানুষ। তাদেরও পরিবার আছে। ফলে ছুটি লাগবে। কিন’ একসঙ্গে যদি সবাই ছুটিতে চলে যায়, তাহলে রোগীদের মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হয়। অনেক সময় রোগীর মৃত্যুও হয়। এজন্য ডাক্তারদের ভাগ হয়ে ছুটি পালন করা উচিত। যেমন সাধারণ দিনগুলোতে যদি চারজন দায়িত্ব পালন করেন, ছুটির দিনে সেখানে দুজন দায়িত্ব পালন করতে পারেন। পরে বাই রোটেশন পদ্ধতিতে পাওনা ছুটি অন্যদিন ভোগ করতে পারেন।
চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক চিকিৎসক সরকারি ছুটির দিনে নিজেদের এলাকায় গিয়ে সেবা দেন। আবার অনেকে পরিবারকে সময় দেন। তবে জরুরি প্রয়োজনে অনেক চিকিৎসক হাসপাতালে হাজির হন।
এব্যাপারে একাধিক চিকিৎসক সুপ্রভাতকে বলেন, রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিতে আমরা চেষ্টা করি। তাই যতটা সম্ভব সেবা দিয়ে থাকি। তবে আমাদেরও পরিবার-পরিজন আছে। তাদেরকেউ সময় দিতে হয়। এছাড়া কয়েকজন চিকিৎসক বিশেষ ব্যবস’ায় সীমিত আকারে ছুটির দিনে বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা চালু করা যেতে পারে বলে জানান।
অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, সরকারি হাসপাতাল প্রতিদিন চালু থাকবে। এটাই নিয়ম। নির্দিষ্ট দিনে একসঙ্গে সব চিকিৎসক ছুটিতে যাওয়া অনিয়ম।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রি. জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন সুপ্রভাতকে বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন চিকিৎসা সেবা চালু রাখতে হবে। তাই ছুটির জন্য নির্দিষ্ট দিন নেই হাসপাতালে।
তিনি বলেন, খোলার দিনগুলোতে চিকিৎসকেরা অনেক ব্যস্ত সময় কাটান। তাই সরকারি ছুটির দিনে একটু ছুটির আমেজে থাকেন। তাই অনেক চিকিৎসক ডিউটিতে আসেন না। তবে জরুরি প্রয়োজনে অনেক সময় হাসপাতালেও ছুৃটে আসেন চিকিৎসকরা।
পরিচালক বলেন, শুক্রবারের চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে, এমন অভিযোগ পাইনি। কেউ যদি আমাদের কাছে অভিযোগ করে, তাহলে বিকল্প ব্যবস’া গ্রহণ করা হবে।