বড়উঠান জমিদার বাড়ি

বিলুপ্তির পথে কালের সাক্ষী

সুমন শাহ্, আনোয়ারা
DSC_0017

কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাশে প্রায় ১৫ কিলিমিটার দূরে নবগঠিত কর্র্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান ইউনিয়নের মিয়ার হাট এলাকার জমিদার মনোহর আলী খানের মিয়া বাড়িটি কালের সাক্ষী হয়ে আছে। এ বাড়ির ইতিহাস প্রায় তিনশ বছরের। ঝোপ-জঙ্গলে ঘেরা ভবনটিকে ভুতুড়ে বাড়ি বলা হলে অতুক্তি হবে না।
স’ানীয় সূত্রে জানা যায়, মনোহর আলী খানের তিনশ আগের জমিদারের ১৬তম প্রজন্ম। ১৬৯৪ থেকে ১৬৯৬ সালের মধ্যে তাদের পূর্বপুরুষেরা এখানে আসেন। কেউ কেউ বলে থাকেন রাজা শ্যামরায় তাদের পূর্বপুরুষ। তারা মূলত মোগল সেনাপতি শায়েস্তা খানের বংশধর। শায়েস্তা খান তাঁর জমিদারির ২৫ শতাংশ দেওয়ান মনোহর আলী খানকে দান করেছিলেন। সেখান থেকেই তাদের জমিদারি শুরু। পাকিস্তান আমলে জমিদারি প্রথা লুপ্ত হয়ে যাওয়ার পর তাদের জমিদারিরও অবসান ঘটে।
বড়উঠান মিয়াবাড়ির প্রবেশমুখে বড় একটি পুকুর। পুকুরটিতে দুটি ঘাট রয়েছে। একটি ঘাট নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় সংস্কার করা হয়। পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে রয়েছে মসজিদ। মসজিদের পাশের ঘাটটি এখনো অক্ষত। সেই আমলে নির্মিত মসজিদটির কারুকাজ চোখে পড়ার মত। বিশেষ করে বিশাল বিশাল দেয়ালের ওপর নির্মিত দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ ও ঠান্ডা পরিবেশ মুসল্লিকে প্রশান্তি দেয়। মসজিদের পাশের কবরস’ানে যুগ-যুগ ধরে শুয়ে আছেন জমিদারের বংশধররা। মূল বাড়ির সামনে রয়েছে লম্বা মাটির কাছারি। সামনে বড় বারান্দা। বারান্দায় দেয়া হয়েছে মাটির পিলার। কাছারির মাঝে রয়েছে মূল বাড়িতে যাওয়ার পথ। মূল বাড়িটি ঝোপঝাড়ে প্রায় আড়াল হয়ে গেছে। বাড়িটির আশপাশে অনেক দিনের পুরনো লিচুগাছ, বেলগাছসহ বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছ রয়েছে।
জানা যায়, জমিদার বাড়ির সামনের কাছারিতে মেহমানরা এসে বসতেন। সেখানে খাজনাও আদায় করা হতো। বিচার-আচারও হতো সেখানে। মাটির তৈরি কাছারিটির বিভিন্ন অংশ ক্ষয়ে গেছে। বাড়ির একপাশে ছিল ধানের বিশাল গোলা, অপর পাশে বিনোদন স’ান। প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া দ্বিতল ভবনটিতে ওপরে ও নিচে মোট ছয়টি কক্ষসহ দুই ফ্লোরে দুটি বাথরুম ছিল। এ বাড়ির ভবনে যে ইট ব্যবহার করা হয়েছে তা চারকোণা আকৃতির। দেয়াঙ পাহাড়ের মাটি দিয়ে বিশেষভাবে ইটগুলি তৈরি করা হয়েছিল। এর সাথে চুন-সুরকির মিশেলে স’াপনাটি নির্মাণ করা হয়। জমিদারের বংশধররা ষাটের দশক থেকে ভবনটিতে বসবাস করা বন্ধ করে দেন। সে সময় বাড়ির পেছনে আরেকটি একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। সেটি এখনো বসবাসের উপযোগী। জমিদারের বংশধররা গ্রামের বাড়িতে গেলে সেখানে বসবাস করেন। পুরাতন ভবনটির কোনো সংস্কার না হওয়ায় তা এখন বিলুপ্তির পথে।
স’ানীয় বাসিন্দা আলাউদ্দিন মাঝি বলেন, আমাদের পূর্বপরুষ এই জমিদার বাড়ির ইতিহাস জানলেও এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা জানে না। তাই এই জমিদার বাড়িটি সংস্কার করা প্রয়োজন। যাতে করে নতুন প্রজন্ম জমিদার বাড়ির ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে।
বড়উঠান ইউপি সদস্য সাজ্জাদ খান সুমন বলেন, এটি অনেক পুরাতন জমিদার বাড়ি। আমাদের এলাকার জন্য গর্ব। ভবনটি তিনশ বছরের পুরাতন হওয়ায় তা সংস্কারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। তবে ভবনটি সংস্কার না হলেও মসজিদ ও পুকুর ঘাটসহ আশপাশের চলাচলের রাস্তা সংস্কার হয়েছে।