জাতিসংঘ মহাসচিবের বেদনাদায়ক উপলব্ধি

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে নিরাপত্তা পরিষদকেই সক্রিয় হতে হবে

সম্পাদকীয়

মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ভয়াবহ নিধনযজ্ঞ থেকে রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিমত দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস। জুলাই মাসের প্রথমে বাংলাদেশ সফরে জাতিসংঘ মহাসচিব রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনকালে শরণার্থী রোহিঙ্গা নর-নারীর মুখে তাদের ওপর মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নির্মম ও ভয়াবহ নির্যাতনের বিবরণ শুনেছেন- তাঁর সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি এক নিবন্ধ লিখেছেন ওয়াশিংটন পোস্টে। নিবন্ধে তিনি বলেছেন, মা-বাবার সামনে তাঁদের শিশু সন্তানদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। নারী ও কিশোরীরা গণ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের পরিবারের সদস্যদের নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছে, গ্রামের পর গ্রাম মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, সীমিত সম্পদ নিয়ে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত আর হৃদয় উন্মুক্ত করে দিয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বিশুদ্ধ পানির সংকট, স্বাস’্যঝুঁকি ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি তাদের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের সাহায্য প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন।
জাতিসংঘ মহাসচিব নিবন্ধে উল্লেখ করেন, মিয়ানমারকে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের পূর্ণ অধিকার নিয়ে ফিরে যাওয়া এবং নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে থাকতে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের নিবন্ধে শতাব্দীর একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর চরম দুর্দশার কথা উল্লিখিত হয়েছে। সেই সাথে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বদেশে ফিরে যাওয়ার আকুতির কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বাংলাদেশে এসে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করার পর রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানান। বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ৪৮ কোটি ডলারের সাহায্যের কথা ঘোষণা করেন।
রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে মিয়ানমারের ওপর অব্যাহত আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ কূটনৈতিক তাগিদ দিয়ে আসছে। পাশাপাশি মিয়ানমারের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরত নিতে উদ্যোগও অব্যাহত আছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিছুদিন আগে চীন সফর করেছেন, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে যেটি বিশেষ প্রয়োজন সেটি হলো মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে ও তাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সুস্পষ্ট প্রস্তাব গ্রহণ; এ লক্ষ্যে নিরাপত্তা পরিষদ, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান কমিশনের সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। রাশিয়া ও চীনের মিয়ানমারের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন প্রত্যাহার একটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে তাদের মানবিক ও নাগরিক অধিকার ফিরে পেতে সাহায্য করতে পারে।
আমরা মনে করি, জাতিসংঘ মহাসচিব রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ত্রাণ সহায়তা প্রদান ও তাদের স্বদেশে ফিরে যাবার পরিসি’তি তৈরি করতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি যে আহবান জানিয়েছেন, তার প্রতি বিশ্ববাসী সাড়া দেবে- বাংলাদেশ এটি প্রত্যাশা করে।