ইহরাম ও তালবিয়া : হজ্বের অপরিহার্য অনুষঙ্গ

হাফেজ মুহাম্মদ আনিসুজ্জমান

আল্লাহ তাআলাই সমস্ত প্রশংসার নিরঙ্কুশ মালিক, অতএব, তাঁরই প্রশংসা ও স’তি বর্ণনা করি। তাঁর পবিত্রতা জ্ঞাপন করি। যিনি হজ্বের মাধ্যমে তাঁর বান্দাদেরকে পাপের কালিমা হতে পবিত্র করেন। তাঁর কৃতজ্ঞতা জানাই, যিনি আধ্যাত্মিকতার অনুশীলনের জন্য সামর্থবানদের ওপর হজ্ব ফরয করেছেন।
তাঁর একত্ব স্বীকার করি, তিনি আল্লাহ্ এক, তাঁর কোন শরীক নেই। তাঁর প্রভুত্বে কারো সমকক্ষতা বা অংশীদারিত্ব নেই। গোটা সৃষ্টি জুড়ে মৌলিকভাবে তাঁরই আধিপত্য। তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত কারো নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই। আমাদের জন্য হেদায়তের নির্দেশক সায়্যিদুনা হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।
সামর্থবান ও সৌভাগ্যবান ভাই-বোনেরা আল্লাহ্র ঘরের উদ্দেশে রওয়ানা হবার জল্পনা-কল্পনা করছেন, কেউবা প্রস’তি নিচ্ছেন। কারণ, চলছে পবিত্র হজ্বের ভরা মওসুম। দিকে দিকে চলছে হজ্বের প্রশিক্ষণ, শোনা যাচ্ছে ‘লাব্বাইকা, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’র অনুশীলন, হজ্ব পালনেচ্ছু নর-নারীর সরব পদচারণায় ব্যস্ত জনপদ। উচ্চকিত হচ্ছে আল্লাহ্র বাণীর গুরুগম্ভীর ঘোষণা ‘হজ্বের রয়েছে ক’টি সুবিদিত মাস। অতএব, যে ব্যক্তি এতে হজ্বের নিয়ত করবে, তবে তার জন্য না আছে ‘রাফাস’ (নারীর সামনে যৌন-আলোচনা), আর না ‘ফুসূক’ (অশোভন কাজ) এবং না হজ্বের মধ্যে কলহ-বিবাদ’র অবকাশ। (২:১৯৭)
হজ্বের মধ্যে এগুলোসহ আরো কতিপয় বিষয় নিষিদ্ধ। যা হজ্বের নিয়তসহ তালবিয়া ঘোষণার মধ্যদিয়ে কার্যকর হয়। সুবিদিত মাসগুলো হচ্ছে, মাহে শওয়াল, যুল কা’দা ও যুল-হাজ্জাহ্র দশদিন। জাহেলী যুগ থেকে হজ্বের মাস হিসাবে এগুলোই গণ্য হয়ে আসছে। তাফসীরে মাযহারীতে আবু উমামা ও ইবনে ওমর (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) থেকে এটাই বর্ণিত আছে। উপরোক্ত আয়াতের মধ্যে ইহরাম’র কারণে নিষিদ্ধ তিনটি বিষয়ের উল্লেখ আছে। ইহরাম অবস’ায় এগুলো পরিহার করা ওয়াজিব। কারো দ্বারা এগুলো সংঘটিত হলে তার ওপর দম (বা দণ্ড) ওয়াজিব। কাজ তিনটি হল রাফাস, ফুসূক ও জ্বিদাল। এর মধ্যে ‘রাফাস’ ব্যাপক অর্থদ্যোতক। যাতে স্ত্রী সহবাস, বা আনুষঙ্গিক আচার-আচরণ, স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্টতা, এমন কি স্ত্রীলোকের সামনে খোলাখুলি সহবাস সংক্রান্ত আলোচনা ও এর অন্তর্ভুক্ত। ‘ফুসূক’ হলো সাধারণভাবে যাবতীয় পাপ কাজ। তবে ইবনে ওমর এর অর্থ করেছেন, যে সব কাজ ইহরাম অবস’ায় নিষিদ্ধ। এটি অধিকতর যুক্তিযুক্ত। কারণ, গুনাহ্ ইহরামের বাইরেও গুনাহ্। ইহরামের কারণেই নিষেধ, অথচ মৌলিকভাবে বৈধ, এমন কাজ ছয়টি। ১. স্ত্রীসম্ভোগ বা কামোদ্দীপক আচরণ, অথবা খোলাখুলি যৌন আলোচনা, ২. স’লভাগের প্রাণি শিকার বা শিকারিকে সহায়তা, ৩. নখ, চুল, দাঁড়ি কাটা, ৪. সুগন্ধি দ্রব্য ব্যবহার। এ চারটি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য নিষিদ্ধ। দু’টি শুধু পুরুষের জন্য নিষিদ্ধ। যথা-সেলাইকৃত কাপড় পরা ও ৬. মাথা ও মুখ আবৃত করা। আয়াতের আর একটি বিষয়ও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তা হল, জ্বিদাল বা ঝগড়া করা। ঝগড়া এমনিতেও অপছন্দের, তাও আবার পবিত্র স’ানে, পবিত্র সময়ে, ইহরাম পরিহিত ইবাদতে রত অবস’ায় এটা আরও গুরুতর পাপ।
আল্লাহ্ তাআলা তাঁর নিদর্শন সমূহ এবং সম্মানিত মাসগুলোকেও সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন সুরা মায়েদার ২য় আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা হালাল মনে করো না, আল্লাহর নিদর্শনাদি ও সম্মানিত মাসসমূহকে, আর হাদি বা কুরবানীর জন্য আনীত প্রাণীদেরকে, না যাদের গলায় কণ্ঠাবরণ রয়েছে, সে সব পশুদের, আর যারা হারাম শরীফ অভিমুখে নিজ পালনকর্তার অনুগ্রহ ও সন’ষ্টির লক্ষ্যে যাত্রা করেছে, তাদেরকে। আর যখন তোমরা ইহরামমুক্ত হয়ে যাবে, তখনই শিকার করতে পার। আর যারা তোমাদেরকে মসজিদে হারাম থেকে (হুদায়বিয়ার স’ানে) বাধা প্রদান করেছিল, সে সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে সীমা লঙ্ঘনে প্ররোচিত না করে। নেকী ও তাকওয়ার কাজে একে অন্যের সহযোগিতা কর, গুনাহ ও সীমা লংঘনে সহযোগিতা করো না। আল্লাহ্কে ভয় করো, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর’।
কুরবানী করা বলতে হারামের সীমায় কুরবানী করা বুঝায়। এ উদ্দেশ্যে হাজী সাহেবান যেসব পশু সঙ্গে নিয়ে যান, সেগুলোকে ‘হাদি’ বলা হয়। আবার গলায় পাট্টা পরিয়ে হাদি হিসাবে চিহ্নিত পশুগুলোকেও অবমাননা করা যায় না। আর ওই সকল লোকদেরও অবমাননা নিষিদ্ধ। যাঁরা পবিত্র হজ্ব বা ওমরা করার জন্য হারাম শরীফ অভিমুখে ঘর থেকে বেরিয়েছেন তাদের বাধা দেয়া বা কোন রূপ কষ্ট দেয়া হারাম। যারা আল্লাহ্র ঘরের তাওয়াফের উদ্দেশে সফর করে আসেন, তাঁরা একটা সীমা থেকে ইহরাম ছাড়া অভ্যন্তরে প্রবেশ করা বারণ। সেই সীমায়িত এলাকাকে মীকাত বলা হয়। ইহরাম গ্রহণকারী নারী পুরুষকে ‘মুহরিম’ বলা হয়। ইহরাম শব্দের অর্থ হারাম বা নিষিদ্ধ করে দেয়া। হজ্ব বা ওমরা পালনের জন্য যাত্রা করার নিয়ত করার মাধ্যমে অনেক হালাল কাজ হারাম করা হয় বলে এর নাম ইহরাম। ইহরাম নিয়তের দ্বারা সাব্যস্ত হয়। শুধু কাপড় পরে নিলেই ইহরাম সাব্যস্ত হয় না। নিয়ত করার পরই তা কার্যকর হবে। মাসআলা হল, শুধু হজ্বের নিয়ত অন্তরে করে নিলে ইহরাম শুদ্ধ হয় না, বরং তালবিয়া বা অনুরূপ কোন যিকর তদস’লে পড়া জরুরি। তেমনি, নিয়ত ছাড়া স্রেফ তালবিয়া পড়ে নিলেও ইহরাম হয়ে যায় না। বরং নিয়ত সহকারে তালবিয়া হওয়া চাই। তালবিয়া নিদেনপক্ষে একবার পড়া ওয়াজিব। (মুআল্লিমুল হুজ্জাজ) ইহরাম সাব্যস্ত হলে এর সকল আহকাম মুহ্রিম (ইহরামকারী)’র জন্য প্রযোজ্য হবে।
বহিরাগত হাজীগণকে মীকাত অতিক্রম করার আগেই ইহরাম নিতে হবে। ইহরাম ছাড়া মীকাত অতিক্রম করলে পুনরায় মীকাতের বাইরে ফিরে আসতে হবে এবং সেখান থেকে ইহ্রাম নিতে হবে। নচেৎ গুনাহ্গার হবে। যদি মীকাতের আগে ফিরে না গিয়ে অগ্রসর হয়ে অভ্যন্তরে কোথাও ইহরাম নেয় তবে দম ওয়াজিব হবে। (প্রাগুক্ত) ইহ্্রাম শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত হলো-১. ব্যক্তির মুসলমান হওয়া, ২. ইহ্্রাম’র নিয়্যত এবং তালবিয়া বা তদানুরূপ কোন যিকর পাঠ করা শর্ত।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে, যখন হযরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) কে হজ্ব ফরয হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ হয়, তখন তিনি আরয করলেন, জনহীন এ মরু প্রান্তরে আমার এ আহবান কার কাছে পৌঁছবে? তখন আল্লাহ্ তাআলা বললেন, তোমার দায়িত্ব শুধু ঘোষণা দেওয়া, পৌঁছানোর দায়িত্ব আমার। এ আওয়াজ আল্লাহ্ তাআলা বিশ্বের আনাচে কানাচে পৌঁছে দেন। শুধু জীবিত মানুষই নয়, কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী প্রতিটি মানুষের কানে পৌঁছে যায় এ আওয়াজ। যাঁদের ভাগ্যে আল্লাহ্ তাআলা হজ্ব লিখে দিয়েছেন তাদের প্রত্যেকেই এ আওয়াজের জবাবে বলেছে, ‘লাব্বাইকা, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…..’ ইবনে আব্বাস‘র মতে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)’র ঘোষণার জবাবই হজ্বের তালবিয়া’র মূল ভিত্তি। (কুরতুবী, মযহারী) বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে তালবিয়ার পূর্ণরূপ হল, ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা-শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়ালা মুলকা লা-শারীকা লাক’। হাল্লাদ বিন সায়েব (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ্র রাসূল ইরশাদ করেন, ‘জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) এসে আমাকে বলেছেন, আমি যেন আমার সাহাবীগণকে তালবিয়ার আওয়াজ উচ্চকিত করার নির্দেশ দেই’। এ হাদীস ইমাম মালেক, তিরমিযী, আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মা-জাহ্, দারেমী বর্ণনা করেছেন)।