হালিশহরের মানুষ সুস্থ স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে চায়

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী
Manjurul Alam

‘হালিশহর ও আগ্রাবাদ এলাকায় জন্ডিসের প্রাদুর্ভাবের কারণ অনুসন্ধানে চট্টগ্রাম শহরে ওয়াসার পানিতে হেপাটাইটিস-ই আছে কি না, তা পরীক্ষা করে ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে স্বাস’্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এছাড়াও পানি পরীক্ষার এক মাসের মধ্যে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে’{সূত্র: সুপ্রভাত, ৯ জুলাই’১৮}। জনস্বার্থে করা এক এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে এই আদেশ দেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। এদিকে চসিক মেয়র জানিয়েছেন, ওয়াসার পানিতে জীবাণু নেই। ‘ওয়াসার পানিতে নয়, মানুষের বাসাবাড়ির পানিতেই জীবাণু রয়েছে। হালিশহর ও আগ্রাবাদ এলাকার বসবাসকারীদের পানির রিজার্ভ ট্যাংক, পানির ট্যাপ, ওয়াসার পাইপলাইন, ওয়াসার দুটি রিজার্ভারের পানি পরীক্ষা করে এ তথ্য পেয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের নেতৃত্বে গঠিত সমন্বিত তদন্ত কমিটি’ {সূত্রঃ সুপ্রভাত, ৬জুলাই’১৮}।
আমরা যদি একটু পেছন ফিরে তাকাই তবে বুঝবো চট্টগ্রামের হালিশহর,আগ্রাবাদ ও সংলগ্ন এলাকায় বিগত তিন মাস থেকে।
গত এপ্রিল’১৮ থেকে অত্র এলাকার মানুষ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে যার মধ্যে ভয়াবহ মারত্মক বিপর্যয় নিয়ে এসেছে জন্ডিস। গত ২ জুন’১৮ পর্যন্ত ৮৪৮ জন জন্ডিসে আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গেছেন ৩ জন। এই বিভ্রান্তি দূর করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) তত্ত্বাবধানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই তদন্তের ফলাফল গত ৬ জুলাই চসিক মেয়র ঘোষণা করেন এবং ওয়াসার পানি জীবাণুমুক্ত বলে জানান। চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমানের বরাত দিয়ে গত ৪ জুলাইয়ের দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ জানিয়েছে, আরো ৩৭ জন রোগী শনাক্ত হয়ে মোট জন্ডিসে আক্রান্তের সংখ্যা এখন ৮৮৫ জনে এসে দাঁড়িয়েছে।
খুব উদ্বেগ আর আশংকার ব্যাপার হচ্ছে, চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের জন্ডিস এখন আগ্রাবাদ ছাড়িয়ে শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। স্টিলমিল বাজার এবং কদমতলী থেকেও রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছে বলে খবরে প্রকাশ। তাছাড়া ঘরে ঘরে অনেক মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছে বলেও জানা যায়। এর মধ্যে গত ২ জুলাই’১৮ সোমবার নতুন করে বেপাড়িপাড়া, আবিদরপাড়ায় আরও ৯৯ জন জন্ডিস রোগীর (হেপাটাইটিস-ই) সন্ধান মিলেছে”{সূত্র: প্র/ আলো, ৩ জুলাই’১৮}।
চিকিৎসকদের মতে জন্ডিসের মূল চিকিৎসা হল বিশ্রাম। এবং দু’তিন সপ্তাহের পরিপূর্ণ বিশ্রামে জন্ডিস রোগীরা সাধারণত রোগ থেকে সেরে উঠে। আবার জন্ডিস আক্রান্ত রোগী মুখে কিছু খেতে না পারলে তাদের শিরায় স্যালাইন দিতে হয় বলে চিকিৎসকরা জানান। তাছাড়া জন্ডিসের পাশাপাশি টাইফয়ডে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে বলে প্রথম আলোর ৩ জুলাইয়ের এক খবর থেকে জানা যায়।
দীর্ঘ তিন মাসেরও অধিক সময় অতিবাহিত হওয়ার পর জানা গেল ওয়াসার পানিতে জীবাণু নেই। এদিকে মানুষের ব্যবহার্য পানিতে জীবাণু থাকায় তা নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মেয়র। রিজার্ভার জীবাণুমুক্তকরণের জন্য একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করে পানি জীবাণুমুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। এতোদিন পানিবাহিত রোগ জন্ডিসের বিস্তার রোধ করার জন্য প্রশাসন শুধু পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ এবং প্রচার প্রচারণার মধ্যেই তাঁদের সেবা কার্যক্রম সীমিত রেখেছে। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় হালিশহর এলাকায় এপর্যন্ত তিন লাখ পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি ও এক লাখ খাবার স্যালাইন বিতরণ করেছে বলে জানা যায়।
বর্তমান সভ্য এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির এই সময়ে মানুষ স্বাস’্যহানি, স্বাস’্যঝুঁকি এবং মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন আতংক আর উদ্বেগের মধ্যে বসবাস করতে পারে না যা হালিশহর, আগ্রাবাদ ও সংলগ্ন এলাকাবাসীরা কয়েক মাস থেকে পার করে আসছে। সুস’ সুন্দর স্বাভাবিক পরিবেশে বেঁচে থাকা মানুষের নাগরিক, রাজনৈতিক, সাংবিধানিক এবং আইনানুগ অধিকার। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার অতি দ্রুত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে চট্টগ্রামের হালিশহর ও আগ্রাবাদ সহ পুরো চট্টগ্রাম নগরীর মানুষকে ভয়, উদ্বেগ আর আতংক মুক্ত করতে যথাযথ ও কার্যকর উদ্যোগ এবং কার্যক্রম গ্রহণ করবেন। অনেক দীর্ঘ সময় অযত্নে, অবহেলায় এবং ব্যর্থতার মধ্যে পার হয়ে গেছে। মানুষের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। আমরা সরকারি সংস’াগুলোর মধ্যে বাদানুবাদ নয়, সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান চাই।
দীর্ঘ সময়ের জলাবদ্ধতা, বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তলিয়ে যাওয়া ভয়াবহ পরিবেশ দূষণে বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ বাড়ে। আমাদের অসচেতনতা, পরিবেশবিরোধী নানা কর্মকাণ্ড, বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস’াগুলির সময়ের কাজ সময়ে না করার ফলে নগরবাসীর স্বাস’্যঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
একটি পরিচ্ছন্ন, স্বস্তিকর ও স্বাস’্যকর জীবন নগরবাসীর প্রত্যাশা। কেননা তাদের শ্রমে মেধায়, কাজে নগরীর অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবন সচল থাকছে। এটি প্রশাসনের বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়।