নিরাপদ পানির সংকট

মোহাম্মদ অংকন
Angkon

বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হয়। এদশের জনগণের পানির সহজ প্রাপ্তির উৎসগুলো হল নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা ইত্যাদি। গ্রাম ও পল্লী অঞ্চলের জনবল গভীর নলকূপের মাধ্যমে সুপেয় পানি নিশ্চিত করে থাকে। কিন’ পানির এত সব উৎস থাকতেও বর্তমানে দেশের প্রায় সাড়ে ৯ কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে পারছে না। বলা চলে, দেশ এখন নিরাপদ পানির সংকটে রয়েছে। বিশ্ব স্বাস’্য সংস’া বলছে, বাংলাদেশের মানুষ পানি সংকট নিয়ে চরম ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। কারণ প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এ দেশে প্রায় ৯৭ ভাগ মানুষের পানি প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হলেও বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে না পারার কারণে জনস্বাস’্য সুরক্ষা চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, মৌসুমভেদে পানির তীব্র সংকটের কারণে জনস্বাস’্যসহ শিল্পোন্নয়ন ও কৃষি কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশে এ বছর গ্রীষ্মকাল ছিল মানুষের প্রতিকূলে। বর্তমানে নদী-নালায় অনিয়ন্ত্রিত বাঁধ দেওয়ার কারণে এবং বৈশ্বিক জলবায়ুর প্রভাবে সর্বত্র পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত হচ্ছে না। আমি উত্তরাঞ্চলের মানুষ। আমি এ অঞ্চলের মানুষের চাষাবাদ স্বচক্ষে দেখেছি। ইরি-বোরো মৌসুমে কৃষকেরা জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ডিপ মেশিন (গভীর নলকূপ) দিয়েও পর্যাপ্ত পানি উত্তোলন করতে পারে না। অপরদিকে নদী-নালা, খাল-বিলেও পানি নেই। তাই নিরুপায় হয়ে কৃষকেরা মাটি খুঁড়ে গভীর গর্ত করে সেখানে ডিপ মেশিন বসিয়ে পানি তুলে চাষাবাদ করে।অনেক সময় পানির অভাবে মাঠের পর মাঠ ধান রোদে পুড়ে যায়। কৃষকের কান্নার অন্ত থাকে না।
আমাদের দেশের প্রবহমান নদীগুলোর আজ বেহাল দশা হয়েছে। উদাহরণস্বরুপ বলা যেতে পারে- পদ্মা, মহানন্দা, আত্রাই ইত্যাদি নদীর কথা। যেমন, এবার গ্রীষ্মের প্রকোপ শুরু হতে না হতেই পদ্মা, আত্রাই ও মহানন্দা নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে কমে গিয়েছিল। এসব নদীর ৬০ শতাংশ জুড়ে চর জেগে উঠেছিল। বর্ষাকাল এলেও এখনও পর্যাপ্ত পানি নাই।গ্রীষ্মকালের দিকে খবরে পড়েছিলাম, আত্রাই নদীতে খণ্ড খণ্ড বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছে সবাই। ফলে নদীতে সামান্য যে পানি ছিল সে প্রবাহও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অনেকেই পানি সংকটে পড়ে গিয়েছিল। এবারের গ্রীষ্মে সর্বত্র পানির এমন সংকট এক নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বটে। আর এভাবেই বাংলাদেশ বিশ্ব জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে সবচেয়ে সংকটময় অবস’ায় রয়েছে। এরসঙ্গে পানির উৎসের অপ্রতুলতা ও বিশুদ্ধ পানির অভাব দেশের পরিবেশ ও প্রকৃতিকে ভারসাম্যহীন করে তুলেছে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা ও সুষ্ঠু ব্যবহারের অভাবে প্রকৃতি তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। প্রকৃতি ও পানির অবিবেচক ব্যবহারের ফলে পানির গুণাগুণ ও পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। নিরাপদ পানির অভাবে মানুষের স্বাস’্য ও সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ইতোমধ্যে। এ সমস্যা নিরসনে দরকার প্রকৃতিনির্ভর পানি ব্যবস’াপনা, পানির সুষ্ঠু বণ্টন ও নদী-নালাগুলো অবমুক্তকরণ। কিন’ সে দিকে আমাদের নজরদারি আদৌ আছে কী?
আমরা জানি, বিশ্বে বর্তমানে ২.১ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদ সুপেয় পানি সেবা থেকে বঞ্চিত। ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্ব জনসংখ্যা ২ বিলিয়ন বৃদ্ধি পাবে এবং বিশ্বব্যাপী ব্যবহারযোগ্য পানির চাহিদা ৩০শতাংশ বেড়ে যাবে। তখন বাংলাদেশের মত জনবহুল মধ্যম আয়ের দেশে নিরাপদ পানি সংকট কতটা প্রকট হবে তা কি আমরা এখনই ভেবে রাখতে পারি না? কিন’ ভাবার সময় কোথায়! তাই যদি হতো, তাহলে অতিমাত্রায় নগরায়ণ ও অসচেতনতার ফলে পানির অপচয় বাড়তো না। আজকাল গৃহস’ালি কাজে, শহরে, কল-কারখানায় অগণিতহারে পানির অপচয় বাড়ছে। এর পাশাপাশি এসব কাজে ব্যবহৃত পানি দূষিত হচ্ছে। সেই দূষিত পানি আমাদের কৃষিজমিতে যাচ্ছে। ফসল উৎপাদন অনেকাংশে ব্যাহত হচ্ছে। নদী-নালা, খাল-বিলে যাচ্ছে। মাছসহ জলজ প্রাণির বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃত্রিম উপায়ে মাছ চাষ করতে হচ্ছে। পানির এই অপচয় ও বর্জ্যযুক্ত পানি নদীতে যাওয়া সরকারকে কঠোর ঠেকাতে হবে।
যখন আমি ছোট ছিলাম, তখন বই-পুস্তকে পড়তাম- ‘পানির অপর নাম জীবন।’ বর্তমান দূষিত পানির দিকে তাকিয়ে বলতে হয়, পানির অপর নাম জীবন কিভাবে হয়! এর সংজ্ঞা পাল্টানো দরকার। তাই তো সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এখন বলা হচ্ছে- ‘নিরাপদ পানির অপর নাম জীবন।’আমরা প্রকৃতিগত নিরাপদ পানি নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এ দুশ্চিন্তা নিরসনের লক্ষ্যে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বোতলজাত করে বর্তমানে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করছে। কিন’ তারপরও চিন্তামুক্ত হতে পারি না। কেননা, এসব পানির গুণগতমান নিয়ে রয়েছে নানান প্রশ্ন। পত্রপত্রিকায় প্রায়ই উঠে আসে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি। এছাড়া শুধুমাত্র জানার অভাবে প্রতিনিয়ত আমরা নানাভাবে দূষিত পানি পান করে চলেছি। প্রচলিত পানির উৎসগুলো আর্সেনিক, আয়রন, ব্যাকটেরিয়াসহ নানান ধরনের দূষণের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত, তা আমরা খোঁজ-খবর রাখার চেষ্টা করছি না।ফলে পানি দূষণজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে এবং পানির গুণগতমান নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকৃতি ও পরিবেশকে সংরক্ষণ করে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন খুবই জরুরি একটি বিষয়। তবে উন্নয়নের নামে পুকুর-খাল-বিল, নদী-নালা দখল করে ভরাটকরণ বন্ধ করাও সময়ের দাবি। আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট করে নির্মাণকাজ বা বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব থেকে সরকারকে যতদূর সম্ভব বিরত রাখতে হবে। আর যদি বিশেষ প্রয়োজনে এসব করা হয় তাহলে বিকল্প জলাধার সৃষ্টি করতে হবে। সরকার হাউজিং সোসাইটি করার, শিল্প-কলকারখানা করার বা শপিংমল করার, যা-ই করার অনুমোদন দেয় না কেন, দেখা যায় সেখানে খাল-বিল ছিল। এমনভাবে ভরাট করা হয় যে সেখানে আর পানিরই অস্তিত্ব থাকে না। এমনকি আগুন লাগলে পানিও পাওয়া যায় না। অথচ গড়ে উঠেছে সব পানির ওপর। পরিশেষে বলতে চাই, দেশের নিরাপদ পানি সংকট দূরীকরণে সরকারের হাত প্রসারিত হোক। আমরা সকল সংকটমুক্ত সুন্দর একটি দেশ চাই।