মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিক শ্রদ্ধার্ঘ্য

জ্ঞানতাপস

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্ম ১০ই জুলাই ১৮৮৫ এবং মৃত্যু ১৩ই জুলাই ১৯৬৯। তাঁর জন্ম-মৃত্যু দিন উপলক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেছেন মোহাম্মদ আজম, মাহবুব বোরহান ও আবু সাঈদ

মাহবুব বোরহান
Shidhllah 02

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন যাঁরা জীবনের ইহলৌকিক চেতনা ও পারলৌকিক চেতনার মধ্যে এক ধরনের স্বনির্ধারিত সমন্বয়ের সন্ধান করেছিলেন সমকালীন জ্ঞানবিজ্ঞান ও ললিতকলার অগ্রসর প্রবাহ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে না নিয়েও। কোনো মানুষই বলতে গেলে চূড়ান্ত অর্থে হয়তো স্ববিরোধিতামুক্ত নয়। সেই অর্থে হয়তো ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ও জীবনচেতনার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে সম্পূর্ণ স্ববিরোধিতামুক্ত ছিলেন এমন দাবি অসংগত। সে কারণেই অনেকেই জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর নানামাত্রিক কর্ম এবং কোনো কোনো বক্তব্য নিয়ে প্রগতিশীল এবং রক্ষণশীলতার তকমা আঁটতে গিয়ে তাঁকে রক্ষণশীল দুর্গে ফেলার অপপ্রয়াস চালিয়েছেন। আবার অন্যদিকে নিষ্ঠাবান ধার্মিক মুসলমান শহীদুল্লাহ্কে তাঁর উদার দৃষ্টিভঙ্গির জন্য বিশেষভাবে বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর কুণ্ঠাহীন অসাম্প্রদায়িক যৌক্তিক মতামতের জন্য খ্যাতনামা মুসলিম সাহিত্যিকের নিকট থেকেও সইতে হয়েছে তিরস্কারের গঞ্জনা। একথা সত্য বিংশ শতাব্দীর বিস্ফারিত দ্বান্দ্বিক বস’বাদের দুর্গম আঙিনা এড়িয়ে তিনি জীবনের সার্থকতা অন্বেষণ করেছিলেন ইসলামের অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী বিশ্বাসকে আশ্রয় করে।
নিবিড়নিষ্ঠায় নিজের ধর্মকে পালন করলেও পরধর্ম বা পরমতের প্রতি হিংস্রতাকে কখনো প্রশ্রয় দেননি। এমন কি নিজের চিন্তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিন্তাকেও তিনি কখনো কখনো মেনে নিয়েছেন গভীর মনোকষ্টকে সংবরণ করে। কিন’ নিজের চিন্তাকে কারো উপর এমনকী একান্ত অধীন আপনজন সন্তানের উপরও চাপিয়ে দেননি। নিজ পুত্রকে নিজের অভিমতের বাইরে তার অভিমত অনুসারেই চিত্রশিল্পে পড়াশোনা করার অনুমতি প্রদান এবং সার্বিক সহযোগিতা করা ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র অনুকরণীয় বিরল উদারতারই প্রমাণ। শুধু ব্যক্তি বা পারিবারিক জীবনেই নয়, বৃহত্তর জাতীয় জীবনের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পটভূমিতেও তাঁর এই অনবদ্য উদারতা ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি তিনি অক্ষুন্ন রেখেছেন। বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে তাঁর অকুতোভয় সাহসী এবং যৌক্তিক অভিমত আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অশেষ অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র ডাকনাম ছিল সদানন্দ। তিনি ভারতের চব্বিশ পরগণা জেলার বশির হাট মহকুমার অন্তর্গত পেয়ারা গ্রামে ১৮৮৫ সালের ১০ই জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। দিনটি ছিল শুক্রবার। বাংলা দিনপঞ্জি অনুসারে ২৭শে আষাঢ় ১২৯২ এবং হিজরি ২৬শে রমজান ১৩০৫। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র পিতার নাম মফিজউদ্দিন আহমদ এবং মাতার নাম হুরুন্নেসা। হুরুন্নেসা ছিলেন বারাসাতের দেগঙ্গা এলাকার ভাসলিয়া গ্রামের কাজী আবদুল লতিফের কনিষ্ঠা কন্যা। শিক্ষার ক্ষেত্রে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্দের পরিবার একটি মহিমান্বিত ঐতিহ্যের অধিকারী ছিল। শহীদুল্লাহ্ ছিলেন তাঁর পিতামাতার ষষ্ঠ সন্তান। তাঁরা ছিলেন সাত ভাইবোন।
তিন বোন এবং চারভাই। শহীদুল্লাহ্র অন্য তিন ভাইয়ের নাম আবদুল্লাহ, এবাদুল্লাহ এবং খলিলুল্লাহ। শিক্ষাদীক্ষায় অগ্রসর ঐতিহ্যের অধিকারী পরিবারে জন্ম নেওয়া শহীদুল্লাহ্র শৈশব-শিক্ষার শুরু হয়েছিল নিজ গৃহেই। পারিবারিক রেওয়াজ হিসেবে তিনি গৃহ থেকেই কোরআন পাঠ, নামাজ শিক্ষা ও দুরুদ পাঠসহ সাধারণ ধর্মীয় অনুশাসন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। আজীবন পালিত ধর্মীয় সংস্কার শহীদুল্লাহ্ পরিবার থেকেই লাভ করেছিলেন। আকীকার সময় তাঁর নাম রাখা হয়েছিল মুহম্মদ ইব্রাহীম, কিন’ পরে মায়ের স্বপ্নে-প্রাপ্ত নাম ‘মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’ই প্রকৃত নামে পরিণত হয়। নিজ গৃহে প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠ গ্রহণ করলেও তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হাতে খড়ি হয় ভাসলিয়া গ্রামের সাওলাতিয়া মক্তবে। এ পর্যায়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত বর্ণ পরিচয় প্রথম ভাগ, বর্ণ পরিচয় দ্বিতীয় ভাগ, কথামালা ও বোধোদয় তাঁর পাঠ্যগ্রনে’র অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই গ্রন’গুলো বাংলার বহু মনীষীর মতো শহীদুল্লাহ্র শিশুমনকেও গভীরভাবে উজ্জীবিত করেছিল। সাওলাতিয়া মক্তবের পর পিতার কর্মস’ল হাওড়ার বেলিলিয়াস মিডল ইংলিশ স্কুল ও পঞ্চাননতলা এম.ই. স্কুলে তিনি পড়াশোনা করেন। হাওড়া জেলা স্কুল থেকে ১৯০৪ সালে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এন্ট্রান্স পাশ করেন। এন্ট্রান্স পাশ করার পর তিনি কলকাতা মাদ্রাসায় এফ. এ ক্লাসে ভর্তি হন। কলকাতা মাদ্রাসা তখন প্রেসিডেন্সি কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ‘তখল মুসলমান ছাত্ররা ইচ্ছা করলে কলকাতা মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে প্রেসিডেন্সী কলেজে পড়তে পারত। হিন্দু স্কুল থেকে যারা (হিন্দু ছাত্ররা) পাশ করত তাদেরও এই সুবিধা দেওয়া হত।’ এই সুবাদেই কলকাতা মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েও শহীদুল্লাহ্ প্রেসিডেন্সী কলেজে এফ. এ পড়তে যান এবং ১৯০৬ সালে সেখান থেকেই এফ.এ পাশ করেন। শিক্ষাজীবনের এই পর্যায়ে তিনি সতীর্থ ছাত্র হিসেবে এমন অনেককে পেয়েছিলেন যাঁরা পরবর্তীকালে জাতীয় জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এসময় তিনি অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিকে তাঁর শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন, যাঁরা তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এফ. এ পাশ করার পর হুগলি মহসিন কলেজে সংস্কৃতে অনার্সসহ বি.এ ক্লাসে ভর্তি হন। কিন’ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় তাঁর লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটে।এরপর তিনি যশোর জেলা স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকুরিতে যোগ দেন। এখানে থাকা অবস’ায় তিনি প্রাইভেট পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে বি.এ পাশ করতে ব্যর্থ হয়ে চাকুরি ছেড়ে দিয়ে আবার সংস্কৃতে অনার্স নিয়ে কলকাতা সিটি কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজ থেকে ১৯১০ সালে তিনি সংস্কৃতে অনার্সসহ বি.এ পাশ করেন। ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃতের প্রতি শহীদুল্লাহ্র গভীর অনুরাগ ছিল। স্কুলে থাকা অবস’ায়ই তিনি মৌলভী সাহেবের বেত্রাঘাতের ভয়ে আরবি-ফারসি না নিয়ে সংস্কৃত নিয়েছিলেন। কলেজ পর্যায়েও দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে নিয়েছিলেন সংস্কৃত। তাই সংস্কৃতেই এম. এ পড়ার জন্য মনসি’র করেছিলেন। সে জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত বিভাগে এম.এ ভর্তি হন। কিন’ সংস্কৃত বিভাগের বেদের অধ্যাপক সত্যব্রত সামশ্রমী শহীদুল্লাহ্র মতো অহিন্দু ছাত্রকে বেদ পড়াতে রাজি না হওয়ায় তিনি নিরুপায় হয়ে উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পরামর্শে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রতিষ্ঠিত তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হন। এই বিভাগে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ই ছিলেন প্রথম ছাত্র। ১৯১২ সালে তিনি তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এম.এ পাশ করেন। ১৯১৪ সালে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বি.এল পাশ করেন।
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ যশোর জেলা স্কুলের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবনের শুরু করেন। এরপর সীতাকুণ্ড হাইস্কুলে কিছুদিন প্রধান শিক্ষকের (১৯১৪-১৯১৫) দায়িত্ব পালন করে তিনি বশিরহাটে আইন ব্যবসায়ে নিযুক্ত হন। ১৯১৫-১৯১৯ সাল পর্যন্ত বশিরহাটে আইন ব্যবসায় নিযুক্ত থাকার সময় এখানে পৌরসভার ভাইস-চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওকালতি পেশার ‘নৈতিক অবক্ষয়’কে মেনে নিতে না পেরে তিনি আইন ব্যবসা ছেড়ে দেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের তত্ত্বাবধানে শরৎচন্দ্র লাহিড়ী গবেষণা-সহকারী হিসেবে ১৯১৯-১৯২১ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।১৯২১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। ১৯২৮ সালে তিনি চর্যাপদ নিয়ে গবেষণা করে প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম ভারতীয় মুসলমান হিসেবে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগ ভেঙে দুটি আলাদা বিভাগ গঠিত হলে ১৯৩৭ সালে তিনি বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ১৯৪৪ সালে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
এরপর তিনি বিভিন্ন সময়ে বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক, বিভাগীয় প্রধান, কলা অনুষদের ডিন, আইন বিভাগ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের খণ্ডকালীন অধ্যাপক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস নিযুক্ত হন। নিবেদিত প্রাণ গবেষক হিসেবে তাঁর অবদান বিশেষভাবে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগ সম্পর্কে তাঁর অসাধারণ আবিষ্কার শুধু বাঙালির নয় বৈশ্বিক জ্ঞানসাধনারও অনন্য উত্তরাধিকার। অধ্যাপনার বাইরেও তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, গবেষণা-প্রকল্প ও কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির উন্নয়নে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজসহ প্রায় সকল সাহিত্য সংগঠনের সঙ্গেই তাঁর আন্তরিক ও গভীর সম্পৃক্ততা ছিল। ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার কথা জাতি চিরদিন কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ রাখবে।
তবে এ প্রসঙ্গে একটি তথ্যের অবতারণা বোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না , সেটি হলো অনেকেই মনে করেন ভাষা-আন্দোলন সম্পর্কিত প্রথম প্রবন্ধটির রচয়িতা ছিলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তথ্যটি সঠিক নয়। এ সম্পর্কিত প্রথম প্রবন্ধের রচয়িতা ছিলেন আবদুল হক।(আবদুল হক : জীবন ও সাহিত্য, বাংলা একাডেমী, ২০০৮ : ১৫) পত্রপত্রিকা সম্পাদনায়ও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তাঁর কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর সম্পাদনায়ই ১৯২০ সালে প্রকাশিত হয় বাংলার প্রথম শিশুপত্রিকা ‘আঙুর’। ১৮টি ভাষায় পারদর্শী ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে দেশ ও বিদেশ থেকে বিভিন্ন সম্মানজনক উপাধি অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই ঢাকায় এই মহৎ মানুষটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সারা দুনিয়াব্যাপী ধর্মের নানামাত্রিক রাজনৈতিক ও সুবিধাবাদী অপপ্রয়োগের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অসহিষ্ণু সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদ যেভাবে তার ভয়াল থাবা বিস্তারিত করে চলছে তাতে আজকের এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র মতো একজন জ্ঞানতাপস বড়ো বেশি প্রাসঙ্গিক; যিনি ধর্মের পথ ধরেও মানবতার রথেই তাঁর জ্ঞানের তপস্যা অনির্বাণ রেখেছিলেন। জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আপনার প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম।