তাঁর ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’ গ্রনে’র ঐতিহাসিক তাৎপর্য

মোহাম্মদ আজম

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাঙ্গালা ব্যাকরণ প্রকাশ করেন ১৯৩৫ সালে। ভূমিকায় তিনি রবীন্দ্রনাথসহ বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদের সঙ্গে যুক্ত অন্য বৈয়াকরণদের স্মরণ করেছেন। বলেছেন, ‘ইহাতে খাঁটি বাঙ্গালা ভাষার ব্যাকরণ আছে, তেমনই সাধু বাঙ্গালা ভাষার সংস্কৃত উপাদানেরও ব্যাকরণ আছে’। সংস্কৃত উপাদানের ক্ষেত্রেও তিনি খানিকটা ভিন্নতা আনার চেষ্টা করেছেন। ইৎ-সহ প্রত্যয় নির্দেশের যে রেওয়াজ পূর্ববর্তী ব্যাকরণগুলোতে দেখা যায়, তিনি তা বাদ দিয়ে ‘ইৎ-শেষে যে প্রত্যয় থাকে’ কেবল তা-ই উল্লেখ করেছেন। ফলে তাঁর ব্যাকরণে খল্, খ, ঘঞ্, অল্, অচ্, অট্ ইত্যাদি সমস্ত প্রত্যয়ই ‘অ’ প্রত্যয় হিসাবে নির্দেশিত হয়েছে। তাঁর সিদ্ধান্তও এর অনুকূল: ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ শিক্ষাদানকালে সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রত্যয়ের সংজ্ঞা পরিত্যাগ করা উচিত’। উল্লেখ্য, বাংলা প্রত্যয়গুলোর ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ তিনি নিয়েছেন প্রধানত রবীন্দ্রনাথের ‘বাংলা কৃৎ ও তদ্ধিত’ প্রবন্ধ থেকে। বস্তুত, ‘বাংলা ব্যাকরণ যে একটি পৃথক ব্যাকরণ এই বোধের পরিচয় গ্রন’টির প্রায় সর্বত্র প্রত্যক্ষ করা যায়’।
তাঁর এ ব্যাকরণের প্রশংসা করেছেন অনেকে। যেমন মুহম্মদ আবদুল হাই লিখেছেন: ‘বর্ণনাত্মক ভাষাতত্ত্বে শহীদুল্লাহ্ সাহেবের বড় কাজ হচ্ছে তাঁর ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’। … [এর] প্রতিটি বিভাগেই বাংলা ভাষার বর্ণনা ব্যাপারে তাঁর একটি সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় বিধৃত’। কিন’ বলতেই হবে, এই ব্যাকরণে নতুন বাংলা ব্যাকরণ প্রণয়নের বিশেষ সাফল্য দেখা যায় না। যেমন, হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, তিনি ‘সংস্কৃত ব্যাকরণকে এবং তাঁর পূর্ববর্তী প্রথাগত বাঙলা ব্যাকরণপ্রণেতাদেরই অনুসরণ করেছেন’। এ প্রেক্ষাপটে ব্যাকরণ রচনায় শহীদুল্লাহ্র কৃতিত্ব বুঝতে চাইলে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিচার করেই বুঝতে হবে।
উনিশ শতকে বাংলা ব্যাকরণচর্চার মূল লক্ষণ ছিল সংস্কৃতের ছাঁচে বাংলা ব্যাকরণকে যথাসম্ভব ঢেলে সাজানো। প্রকল্পটা শুরু হয়েছিল হ্যালহেডের ব্যাকরণ (১৭৭৮) থেকে। উইলিয়াম কেরির ব্যাকরণের দ্বিতীয় সংস্করণ (১৮০৫) থেকে ছাঁচটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। পুরো প্রকল্পটির পেছনে মূল যে তত্ত্ব কাজ করে গেছে তা হল, বাংলা সংস্কৃতের দুহিতা, ফলে সংস্কৃতের ঐশ্বর্য অকৃপণভাবে গ্রহণের অধিকার বাংলার আছে। শুধু অধিকার নয়; প্রয়োজনীয়ও বটে – যে মিশ্রণ আর ‘অশুদ্ধি’ বাংলা ভাষাকে দূষিত করেছে, কেবল সংস্কৃতের রীতি-পদ্ধতি মেনেই তার নিরাকরণ সম্ভব। তত্ত্বীয়ভাবে না হলেও বাস্তবত বাংলা ব্যাকরণ আজতক এই মূলনীতিই মেনে চলছে। মাঝে শ্যামাচরণ গঙ্গোপাধ্যায়, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী এবং বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বাধীন ও স্বতন্ত্র বাংলা ব্যাকরণের স্বপ্ন ও বাস্তবতা তৈরি করেছিলেন। সে আন্দোলনের প্রভাবেই সম্ভবত সুনীতিকুমারের মহাগ্রন’ ঞযব ঙৎরমরহ ধহফ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়ভ ইবহমধষর খধহমঁধমব (১৯২৬) উৎস ও বিকাশের বর্ণনাকে অতিক্রম করে হয়ে ওঠে ‘বাংলা ভাষার বর্তমান অবস’া-বর্ণনার’ এক আকর গ্রন’। কিন’ তিরিশের দশকে পরিবর্তিত পরিসি’তিতে বাংলা ব্যাকরণ আবার ফিরে যায় তার আগের ধারায়। অপেক্ষাকৃত নিপুণ ভঙ্গিতে অনুসরণ করতে থাকে সংস্কৃতের বর্ণনারীতি। ওই সুনীতিকুমারেরই ১৯৩৯ সালের ব্যাকরণ তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
ভাষা-প্রকাশ বাংলা ব্যাকরণ কাজ করেছে প্রধানত বাংলার ‘তৎসম’ উপাদান নিয়ে; অধ্যায়গুলোতে পরিশিষ্টের মতো করে ‘বাংলা’ উপাদানের আলোচনা যোগ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ধ্বনি, সন্ধি, প্রত্যয় ইত্যাদির আলোচনা পাঠ করা যায়। দেখা যাবে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংস্কৃত উপাদান ও নিয়মকে মূল ধরে বাংলা উপাদানগুলোকে দেখানো হয়েছে বিচ্যুতি হিসাবে। তাই বাংলায় কখনো ব্যবহৃত হয়নি, এমন বর্ণ বা ধ্বনির আলোচনা তাতে পাওয়া যায়। সন্ধি-অংশে পাওয়া যায় এমন বহু শব্দ যেগুলো কোনো অর্থেই বাংলা শব্দ নয়। প্রত্যয় হিসাবে উল্লেখিত হয়েছে খাঁটি সংস্কৃত রূপ, যার সঙ্গে বাংলা উচ্চারণভঙ্গি ও শব্দরূপনির্মিতির কোনো সম্পর্ক কখনোই ছিল না। রবীন্দ্রনাথ ধ্বন্যাত্মক শব্দ, শব্দদ্বৈত, ইঙ্গিতমূলক শব্দ, বহুবচন ও লিঙ্গের চিহ্ন সম্পর্কে যেসব প্রস্তাব করেছিলেন, তার প্রায় কিছুই এ ব্যাকরণে গৃহীত হয়নি। সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুকরণে অধ্যায়-বিভাজনের যে রীতি বাংলা ব্যাকরণে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, সুনীতিকুমার প্রায় হুবহু তার অনুসরণ করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, ‘এই ব্যাকরণে সাধু ভাষার সহিত চলিত ভাষাও স’ান পাইয়াছে বটে, কিন’ সাধুর আসনই মুখ্য। ব্যাকরণটি যে ভাষায় লিখিত হইয়াছে তাহার রূপও সাধু। বস্তুত তাঁহার নিজের পক্ষপাত সাধুর দিকেই’। অথচ আগের বছর, ১৯৩৮ সালেই বেরিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের বাংলাভাষা-পরিচয়, যা চলিতরীতির ভিত্তিতে রচিত। তাই ‘বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির অনুসরণ’, শৃঙ্খলা ও ব্যাপকতা সত্ত্বেও সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের এ ব্যাকরণ বাংলা ভাষাচর্চায় কোনো নতুন পথ তৈরি করেনি। আদতে এ ব্যাকরণ সংস্কৃতরীতিতে বাংলা ব্যাকরণ লেখার দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে চরম প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল; কারণ, ‘বাজারের ব্যাকরণগুলিতে স্বভাবতই সুনীতিবাবুর অনুসরণ দেখা যায়’।
বাংলা ব্যাকরণচর্চায় সংস্কৃত ব্যাকরণের প্রতিষ্ঠা যে কত প্রবল আর কার্যকর, তা বোঝার জন্য অনেক পরে প্রকাশিত আরেকটি ব্যাকরণগ্রনে’র পর্যালোচনা করা যাক।
জ্যোতিভূষণ চাকীর বাংলা ভাষার ব্যাকরণ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে। সরস কথ্যভঙ্গিতে রচিত ব্যাকরণটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন’ এর যে কোনো অংশ পড়লেই বোঝা যায়, এটি বর্ণনামূলক নয়, বরং সম্পূর্ণরূপে আনুশাসনিক। সে অনুশাসন সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুশাসন। বাংলা শব্দভাণ্ডারের প্রচলিত বিভাজন তিনি মেনে নিয়েছেন; তবে তাতে সংস্কৃত শব্দের পরিসর আগের চেয়ে বাড়িয়ে দিয়েছেন। তৎসম শব্দের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘‘সংস্কৃতের মতো’ বলতে বুঝতে হবে উচ্চারণে তফাত হলেও আকৃতিতে অর্থাৎ বানানে যা অপরিবর্তিত থাকছে তা’। এ সংজ্ঞার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষায় সংস্কৃত শব্দের পরিচয় সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ও অন্য অনেকের উত্থাপিত মূল প্রশ্ন-বাংলায় আগত সংস্কৃত শব্দগুলো আসলে কেবল দেখায় অর্থাৎ বানানে তৎসম, বলায় বা উচ্চারণে নয়-তিনি এড়িয়ে গেছেন। অন্যদিকে পুরো বইতে ব্যবহার করেছেন বিপুল সংস্কৃত শব্দ, যেগুলো বাংলায় ব্যবহৃত হয় না। ‘প্রতিশব্দ’ অনুচ্ছেদে অগ্নি ও অগ্নিবাচক শব্দের উদাহরণ হিসাবে উল্লেখিত হয়েছে তনূনপাৎ, চিত্রভানু, বিভাবসু, কৃপীটযোনি, বায়ুসখ, হুতভুক্, হুতাশন, হব্যবাহন, বীতিহোত্র, বহ্নি, পাবক ইত্যাদি। বাংলা স্বরবর্ণের সংখ্যা, তাঁর মতে, ১৪টি। ‘ধ্বনি বর্ণ উচ্চারণ’ শিরোনামের অধ্যায়টিতে বাংলা ভাষার এ বৈয়াকরণ সংস্কৃত উচ্চারণকে নির্দেশ করেছেন মূল-উচ্চারণ হিসাবে; আর বাংলা উচ্চারণ দিয়েছেন তার বিকৃতি হিসাবে।
ষত্ব ও ণত্ব বিধান, সন্ধি, প্রত্যয় ও উপসর্গসহ প্রায় সকল অধ্যায়ে সংযোজিত হয়েছে এমন নিয়ম, যার অনুকূলে বাংলা ভাষা থেকে কোনো উদাহরণই দেওয়া যায়নি। এর মধ্যে প্রত্যয়ের আলোচনা সবচেয়ে সুলিখিত; কারণ এ অধ্যায়ের সূত্রগুলো প্রত্যয়ের রূপসহ হুবহু সংস্কৃত থেকে নেওয়া হয়েছে। অব্যয় কিংবা উপসর্গের মতো অধ্যায়ের আলোচনায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ভালো ধরা পড়ে। এই পরিভাষাগুলো বাংলায় হুবহু সংস্কৃতের মতো নয়। জ্যোতিভূষণ এসব ক্ষেত্রে সংস্কৃত সংজ্ঞা-অনুযায়ী আলোচনা করে পরে বাংলার ব্যতিক্রম নির্দেশ করেছেন। এ ব্যাকরণও ‘প্রকৃত অর্থে বাংলা ভাষার ব্যাকরণ হয়ে উঠতে পারেনি’।
এই মানচিত্র মনে রাখলে শহীদুল্লাহ্র ব্যাকরণ-প্রকল্পের তাৎপর্য বোঝা যাবে। তিনি অনুসরণ করতে চেয়েছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী প্রমুখের প্রস্তাব। প্রস্তাবের বাস্তবায়নে তিনি সফল হননি। হুমায়ুন আজাদ (১৯৯৮) মূলত তাঁর এই ব্যর্থতারই পরিচয় দিয়েছেন। কিন’ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট মনে রাখলে বোঝা যায়, তাঁর এই ব্যর্থ প্রকল্প আসলে প্রচলিত ব্যাকরণধারায় তাঁর অস্বস্তিরই প্রকাশ। নতুনত্বটা এসেছে এই অস্বস্তি থেকে। পরবর্তীকালে যাঁরা নতুন ব্যাকরণ রচনা করতে চেয়েছেন তাঁদের কাছে শহীদুল্লাহ্র উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণই মনে হয়েছে। যেমন, বাংলা একাডেমির নতুন ব্যাকরণের সম্পাদকদ্বয় তাঁদের ভূমিকায় শহীদুল্লাহ্র ব্যাকরণের ঋণ স্বীকার করেছেন।