খালগুলো পাহাড়কাটা মাটিতে নাব্যতা হারাচ্ছে

রফিক উদ্দিন বাবুল, উখিয়া

রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয় শিবির নির্মাণ ও তাদের মানবিকসেবায় নিয়োজিত দেড় শতাধিক এনজিও নির্বিচারে পাহাড়-টিলা কেটে সমতল করলেও মাটি ধরে রাখার কোনো কার্যকর ব্যবস’া নেয়নি। ফলে চলতি বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টিপাতের সাথে পাহাড়কাটা মাটিতে ভরাট হয়ে নাব্যতা সংকটে পড়েছে অধিকাংশ খাল, ছড়া ও জলাশয়। এমনকি পলিজমে চাষাবাদ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে প্রায় ৫ শতাধিক হেক্টর চাষাবাদযোগ্য জমি। বৃষ্টির পানি ও পাহাড়ি ঢলে অধিকাংশ নিচু এলাকা জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে জনদুর্ভোগ বেড়েছে বলে দাবি করছেন কৃষক ও ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসী।
কৃষিবিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করা হলে তারা জানান, সরকার রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে এনজিওরা তাদের আখের গোছানোর জন্য উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী, সফিউল্লাহ কাটা, তাজনিমারখোলা, মনিরঘোনা, বালুখালী, জামতলী, তেলখোলা, মোছারখোলা, রাজাপালং ইউনিয়নের লম্বাশিয়া, মধুরছড়া, মাছকারিয়া এলাকায় প্রায় শতাধিক কেটে সমতল করেছে। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে এনজিও সংস’ার বিভিন্ন আবাসন ও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবির।
পালংখালী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ও কৃষক মোজাফফর সাওদাগর জানান, রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের নামে যত্রতত্র পাহাড়কাটা হলেও পাহাড়ের মাটি সংরক্ষণের ব্যবস’া নেওয়া হয়নি। যে কারণে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের সাথে মাটি গিয়ে থাইংখালী ও পালংখালী খাল ভরাট হয়ে নাব্যতা হারিয়েছে। এসব এলাকায় চাষাবাদ উপযোগী ৫ শতাধিক হেক্টর জমিতে বালিমিশ্রিত মাটির পলি জমে আমন চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। পানি চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় অধিকাংশ নিচু এলাকায় জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে জনদুর্ভোগ বেড়েছে। থাইংখালীর চিংড়িচাষি আলতাজ আহম্মদ জানান, তার প্রায় ৫ একর জমিতে পাহাড়ের মাটি ও বালি জমেছে। ওই জমি চাষাবাদ উপযোগী করতে তাকে শ্রমিক দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে মাটি সরাতে হচ্ছে।
সরজমিন থাইংখালী খাল ঘুরে স’ানীয় বেশ কয়েকজন কৃষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, পাহাড়কাটা মাটিতে পুরো খালটি ভরাট হয়ে গেছে। এ খাল অবিলম্বে খননের আওতায় আনা না হলে পুরো পালংখালী ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হওয়ার আশংকা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সমন্বয়ে এনজিওদের সাথে বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠকে এনজিওরা ৬টি খাল খনন করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা এখনো পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে ৯ হাজার ৪শ ২০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, পাহাড়কাটা মাটি বিভিন্ন কৃষিজমিতে গিয়ে পলিজমে ওঠার কারণে প্রায় ১শ হেক্টর জমিতে আমনচাষ করা সম্ভব হবে না। কৃষিজমি খালের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে বেশ কয়েকটি গ্রাম। কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাইফুল আশরাফ বলেন, সরকার মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন’ এনজিওগুলো যেভাবে পাহাড় কেটেছে তাতে পরিবেশের মারাত্নক বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। পাহাড়কাটা মাটি যাচ্ছে জমিতে। তিনি বলেন, বিষয়টি আমি সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পরিবেশ অধিদপ্তরের সাথে সমন্বয় রেখে কাজ করার জন্য নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। তারা যদি না মানে আমার করার কিছু নেই। দক্ষিণ বন বিভাগীয় কর্মকর্তা আলী কবির জানান, পাহাড়কাটার ব্যপারে বেশ কয়েকবার পদক্ষেপ নিয়েও কোনো কাজ হয়নি। তাই এ ব্যাপারে আমার করার কিছু নেই। যেহেতু সরকার মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, তাদের নিরাপদ বসবাসের নামে এনজিওরা নির্বিচারে পাহাড় কাটছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান বলেন, এনজিও সংস’া আইএমও বালুখালী খালকে খনন করেছে। কিন্তু পালংখালী খাল খননের ব্যাপারে স’ানীয় চেয়ারম্যান অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি তিনি সরজমিন পরিদর্শন করার জন্য সংশ্লিষ্ট এনজিও সংস’ার উপসি’তি নিশ্চিত করেছেন।