বিএমএ’র পাঁচ প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন

সালাহ উদ্দিন সায়েম গ্ধ

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রাম জেলা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের সময় হাসপাতালে সাংবাদিকদের প্রবেশ বন্ধের সুপারিশ করেছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালের অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র যাতে জনসম্মুখে প্রকাশ ও প্রচার না হয় সেটিই তারা চাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বিএমএ’র এই প্রস্তাবকে অযৌক্তিক আখ্যায়িত করে এর পেছনে তাদের ‘দুরভিসন্ধি রয়েছে’ বলে মনে করছেন প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়নে বিএমএ সোমবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পাঁচ দফা সুপারিশ তুলে ধরে। এরমধ্যে চার নম্বর দফায় সংগঠনটি প্রস্তাব করে, হাসপাতালে অভিযানের সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাথে কোনো সাংবাদিক ঢুকতে পারবে না। অভিযানের পর ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করবেন।
প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, হাসপাতালের এসব অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র যাতে
সাধারণ মানুষ জানতে না পারে সেজন্য বিএমএ সাংবাদিকদের প্রবেশ বন্ধ করার প্রস্তাব করেছে। সাংবাদিকদের প্রবেশ বন্ধ করার পেছনে তাদের আরেকটি উদ্দেশ্য রয়েছে। সাংবাদিকদের অনুপসি’তিতে মোবাইল কোর্টের অভিযানকে তারা প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ পাবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম গতকাল সুপ্রভাতকে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, তাদের এটা কোন ধরনের প্রস্তাব ? ’
‘অভিযানের সময় মিডিয়া কেন থাকবে না’-এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন- ‘অপারেশন থিয়েটারে ৮ বছর আগের ওষুধপত্র পাওয়া গেলে সেটা মানুষ জেনে যাবে-এ কারণে তারা সাংবাদিকদের প্রবেশ বন্ধ করতে চায়? সাংবাদিকদের অনুপসি’তিতে মোবাইল কোর্ট কোনো কিছু না পেয়ে জরিমানা করে গেছে-এটা বলার জন্য ?’
সারোয়ার আলম বলেন, ‘মিডিয়া হলো সাক্ষীর মতো। তারা ঘটনাস’লে উপসি’ত থেকে আমরা কি উদ্ধার করলাম, আমরা প্রভাবিত হয়ে গেলাম কিনা তা দেখতে পায়।’
গেল রোববার নগরীর মেহেদীবাগ এলাকার বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে স্বাস’্য অধিদপ্তর ও র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের যৌথ অভিযানের সময় সেখানে প্রবেশ করেছিলেন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদকর্মীরা। অভিযানে প্রতিষ্ঠানটির টেস্ট রিপোর্ট নিয়ে অভিনব জালিয়াতির চিত্র ধরা পড়ে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তায় ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদ কর্মীরা হাসপাতালের এমন জালিয়াতির কাণ্ড সরাসরি প্রচার করে জনসম্মুখে তুলে ধরেন। হাসপাতালটির এমন জালিয়াতির দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষ বিস্মিত হয়।
বিএমএ হাসপাতালের ফার্মেসিগুলো স্টোর হিসেবে গণ্য করার ‘অযৌক্তিক’ একটা প্রস্তাবও করেছে। চট্টগ্রাম ওষুধ প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের এই প্রস্তাবকে ভিত্তিহীন ও হাস্যকর বলছেন। একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ করে প্রশ্ন রাখেন, ‘তাদের এ কেমন আবদার?’
চট্টগ্রাম ওষুধ প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়ক গুলশান জাহানের প্রশ্ন- ‘বিএমএ কোন্ সুবিধার জন্য ফার্মেসিকে স্টোর হিসেবে চান? তারা কি স্টোরে লাইসেন্স ছাড়া ওষুধ বিক্রি করতে চান? তাহলে ওখান থেকে ওষুধ খেয়ে কোনো রোগী মারা গেলে তার দায় দায়িত্ব কে নেবে ?’
তিনি বলেন, ‘ওষুধ বিক্রি কিংবা বিক্রয়ের জন্য মজুদ রাখলে অব্যশই ড্রাগ লাইসেন্স লাগবে। সেটা স্টোরে থাকুক কিংবা ফার্মেসিতে থাকুক। আর ড্রাগ লাইসেন্স থাকলে তো বিধি বিধান মেনে চলতে হবে।’
ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানকে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, বাস্তব ও বিজ্ঞানসম্মত করতে একজন প্যাথলজিস্ট, একজন সার্জন, একজন বিএমএ’র প্রতিনিধি, একজন বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও একজন ক্যাবের প্রতিনিধি রাখার প্রস্তাব করা হয়।
র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘মোবাইল কোর্টে কে থাকবে না থাকবে সেটা নির্ধারণ করবেন যিনি অভিযান পরিচালনা করবেন তিনি। কারণ এটা কোর্টের এখতিয়ার। ’
বেসরকারি হাসপাতাল নিয়ন্ত্রণ আইনে জরিমানা যৌক্তিক ও সহনীয় পর্যায়ে করার প্রস্তাব করে বিএমএ।
এ প্রসঙ্গে র্যাবের ভ্রাম্যমান আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম বলেন, ‘কোন্ আইনে বিচার করবে সেটা কোর্টের এখতিয়ার। কোর্টের রায়ে যদি সংক্ষুব্ধ হয় তাহলে ভুক্তভোগীর জন্য আপিলের দরজা খোলা আছে। সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত আপিল করা যাবে।’
প্রসঙ্গক্রমে সারোয়ার আলম বলেন, ‘ম্যাক্স হাসপাতালে টেস্ট রিপোর্ট নিয়ে জালিয়াতি ও অন্যান্য যেসব অনিয়ম পাওয়া গেছে সেটার জন্য তাদের জরিমানা করা হয়নি। তাদের কেবল ফার্মেসিতে অনিয়মের কারণে ওষুধ আইনে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তাদের সবগুলো অনিয়ম আমলে নিয়ে বিচার করলে জরিমানা হতো ৫০ লাখ টাকা। কিন’ আমরা তাদের মানবিক কারণে এতো বেশি জরিমানা করিনি। তাদের সংশোধনের সুযোগ দিয়েছি।’

এসব প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএমএ চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি ডা. মুজিবুল হক খান সুপ্রভাতকে বলেন, ‘এসব নিয়ে প্রশ্ন করার কোনো দরকার আছে? আপনারা আসলে আমাদেরকে প্রতিপক্ষ করে ফেলতেছেন। শুনেন, এগুলো করে দেশে ইস্যু সৃষ্টি হবে দেখবেন, আমি বললাম।’